শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেতে ঘুষ!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২১, ২০২১, ৬:৫২ অপরাহ্ণ


কক্সবাজার প্রতিনিধি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় হতদরিদ্র গৃহহীন ৫০ পরিবারকে আগামী শনিবার (২৩ জানুয়ারি) একটি করে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় তৈরি করা এসব ঘর বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে এক মৎস্যজীবী নেতা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুবিধাভোগীরা জানান, উপজেলা প্রশাসন থেকে ঘরগুলো দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যক্তি; যিনি নিজেকে ‘বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির’ কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা মৌলভীবাজার ২ নং ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন।

উপকারভোগীদের অভিযোগ, ঘর বরাদ্দের জন্য তাদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া প্রত্যেকের কাছ থেকে ঘর নির্মাণের মালামাল বহন খরচ হিসেবে নিয়েছেন আরও ১০ থেকে ১৪ হাজার টাকা।

জালাল উদ্দিন নামের একজন সুবিধাভোগী একুশে পত্রিকাকে বলেন, টমটম চালিয়ে সীমান্তের বেড়িবাঁধে ঝুপড়ি ঘরে কষ্টের জীবনযাপন করতাম। সীমান্ত সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হলে সেখানে থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ভূমিহীন ও গৃহহীন হয়ে পড়ি। পরে সীমান্ত সড়কের পাশে আমাদের তিন শতক জমিসহ সেমিপাকা একটি করে ঘর বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে এই ঘর বরাদ্দের জন্য জাহাঙ্গীর আলম ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এছাড়া ঘর নির্মাণের মালামাল বহন খরচের জন্য ১১ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এরপরও ঘরগুলোর টয়লেট নির্মাণ করেনি। তবুও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই একটি করে নতুন ঘর দেওয়ার জন্য।

আরেকজন সুবিধাভোগী নুর বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমাকে হুমকি দিয়ে ১৫ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়েছে। কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে, কেউ শেষ সম্বল একমাত্র ফসলের জমি বন্ধক রেখে, কেউ স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে আবার কেউ ঋণ নিয়ে জাহাঙ্গীরকে টাকা দিয়েছেন। বিষয়টি সাংবাদিকদের অবহিত করায় জাহাঙ্গীরের লোকজন আমাদের হুমকি ধমকি দিচ্ছে।

টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় মারধরের হুমকি দিয়েছিল অভিযোগ করে সুবিধাভোগী হাবিব উল্লাহ বলেন, ওপর মহলে টাকা দিতে হবে, না হলে ঘর পাওয়া যাবে না- শুরুতে এমন হুমকি পেয়েছি জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে। পরে কোনও উপায় না পেয়ে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি।

তিনি আরও বলেন, ঘরের জন্য ৩৮ হাজার টাকা নিয়েছে জাহাঙ্গীর। এর মধ্যে ঘর বরাদ্দের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং বাকি টাকা মালামাল খরচ বহনের জন্য নিয়েছে।

দশ হাজার টাকা দিতে না পারায় ঘরের বরাদ্দ পাননি অভিযোগ করে জাহেদা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যক্তি ঘর বরাদ্দের জন্য ১০ হাজার টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় ঘর পাইনি। বিনা টাকার ঘর, টাকা দিয়ে নিতে হবে—এটা কেমন বিচার? যারা টাকা দিয়েছে তারা ঘর পাচ্ছে। জাহাঙ্গীর অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে বলে জানান তিনি।

অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম ‘বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির’ কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা মৌলভীবাজার ২ নং ওয়ার্ডের সভাপতি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে কারো কাছ থেকে কোনও টাকা নেইনি। তবে মালামাল বহন খরচের জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৪ হাজার ২০০ টাকা করে নিয়েছি। আমি প্রকৃত খরচের টাকাগুলো নিয়েছি। কারণ ঘর নির্মাণের মালামাল বহনের খরচ কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি দেয়নি।

তিনি বলেন, আমিও নিজে একটি ঘর বরাদ্দ পেয়েছি। তাছাড়া এসব ঘর নির্মাণের কাজ দেখাশোনা করতে উপজেলা প্রশাসন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। আর কোথায় কী ব্যয় করেছি তার হিসেব কর্তৃপক্ষকে দিয়েছি।

টেকনাফ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মুজিববর্ষে ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারসহ মোট ২২৯টি পরিবারের জন্য ঘর বরাদ্দ এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। তবে প্রথম পর্যায়ে ৫০টি পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এসব ঘরের সব কাজ শেষ হয়েছে। আগামী শনিবার সুবিধাভোগীদের ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভী বাজার থেকে পূর্ব দিকে দেড় কিলোমিটার ভেতরে সীমান্ত সড়কের কাছাকাছি সরকারি উদ্যোগে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ‘মুজিব শতবর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন’ অর্থাৎ ‘ক’ শ্রেণির দুর্যোগ সহনীয় ২৮টি টিনশেড পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে আশেপাশে অস্থায়ী পলিথিন ছাউনিতে বসতি করছে ‘ভূমিহীন ও গৃহহীন’ সুবিধাভোগীরা।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, উপকারভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তাছাড়া জাহাঙ্গীর নামে কাউকে ঘরগুলো নির্মাণের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সিফাত বিন রহমান বলেন, জাহাঙ্গীর আলমকে ঘর নির্মাণের কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সেখানকার মাঝির দায়িত্ব আছেন জাহাঙ্গীর, ফলে তাকে দেখাশোনা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোনও উপকারভোগীদের কাছ থেকে ঘর এবং মালামাল বহনের কোনও টাকা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল না। সেরকম কোনও নিয়মও নেই। টাকা নেওয়ার বিষয়ে অফিসিয়ালি কেউ আমাদের অবহিত করেনি।’

তিনি আরও বলেন, জাহেদা বেগমের জায়গা নিয়ে সমস্যা ছিল। তাছাড়া তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জায়গা চিহ্নিত করে দিলে ঘর পাবেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মামুনুর রশিদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, গৃহহীন মানুষগুলো প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য একটি করে ঘর পাচ্ছেন, এটাই হবে মুজিববর্ষের সেরা উপহার। প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে এখান থেকে কেউ টাকা নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।