চসিক নির্বাচনে কালো টাকার ছড়াছড়ি


শরীফুল রুকন : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে ‘নির্বাচনী ব্যয়’ বাবদ সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন মেয়র প্রার্থীরা। কিন্তু আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, তিনি মাত্র ২০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন নির্বাচনে। যদিও একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০ লাখ টাকার বেশি শুধু মাইকিং করতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে রেজাউল করিমের। অন্যদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেন নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, মাইকিং বাবদ মাত্র ১৫ হাজার টাকা খরচ করবেন তিনি। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু মাইকিং করতেই চার লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে শাহাদাতের। এর বাইরে পোস্টার-লিফলেট, ব্যানার, নির্বাচনী ক্যাম্প, যাতায়াত, ঘরোয়া সভা, পথসভা, প্রতীক তৈরি ও আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হচ্ছে এ দুই মেয়র প্রার্থীর। ফলে নির্বাচনে ব্যয় সীমা একটি হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো প্রার্থীই এটি মানছেন না। যদিও কাগজে-কলমে প্রার্থীরা সীমার মধ্যেই ব্যয় দেখাতে বাধ্য হচ্ছেন, ঘোষণা দেয়া এই টাকাটা ‘সাদা টাকা’। বাকি যে টাকা ব্যয় হচ্ছে তার সবই ‘কালো টাকা’।

মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর প্রচারণার জন্য মাইক ভাড়া দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, নগরের আইচ ফ্যাক্টরি রোডে অবস্থিত রণি মাইক সার্ভিস। এ প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের কাছ থেকে অন্তত ৩৯টি মাইক ভাড়া নেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর প্রচারণার জন্য। এর মধ্যে ৩০টি মাইক ব্যবহার করা হচ্ছে, একই সংখ্যক সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে মাইকিংয়ের জন্য। দুটি পিকআপে ব্যবহার করা হচ্ছে চারটি মাইক। এছাড়া রেজাউলের বাসায় ব্যবহারের জন্য ভাড়া নেয়া হয়েছে আরও পাঁচটি মাইক। যদিও অভিযোগ আছে, শুধু রণি মাইক সার্ভিস থেকে মাইক ভাড়া নিয়ে রেজাউল করিমের পক্ষে ৪০টির বেশি অটোরিকশায় করে নগরজুড়ে মাইকিং করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে রণি মাইক সার্ভিসের মালিক গৌতম মজুমদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৯টি মাইক ভাড়া নেয়া হয়েছে মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমের প্রচারণার জন্য। এর বাইরে আর কারও কাছ থেকে মাইক ভাড়া নেয়া হয়েছে কিনা আমি জানি না।’ মাইক ভাড়া বাবদ রেজাউল করিমকে কত টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে, এই তথ্য তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি তিনি। তবে প্রতিটি মাইকের জন্য দৈনিক ৪০০ টাকা করে ভাড়া নেয়া হচ্ছে বলেও জানান গৌতম। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রতিটি মাইকের জন্য দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা ভাড়া নিচ্ছে, সেখানে ৪০০ টাকা ভাড়া নেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গৌতম মজুমদার বলেন, ‘আমি সবসময় আওয়ামী লীগের কাজ করি, সে হিসেবে কম রাখছি। গতবার মেয়র নির্বাচনের সময় প্রতিটি মাইকের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা দিয়েছিল। মহিউদ্দিন ভাইয়ের সাবেক এপিএস শমসের (নগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাসান মাহমুদ শমসের) ভাই এবার ১০০ টাকা কমিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলেছেন রেজাউল ভাই মেয়র নির্বাচিত হলে করপোরেশনের সব কাজ আমি পাবো। এজন্য তিনি জোর করে প্রতি গাড়ি ১০০ টাকা কমিয়ে দিলেন।’

এদিকে গত বছরের ৯ মার্চ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত ১৩ দিন ও চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ দিন প্রচারণার সুযোগ দেয়া হয়েছে সব প্রার্থীকে। সে হিসেবে দুই দফায় ৩০ দিন প্রচারণা চালানোর সুযোগ পেয়েছেন প্রার্থীরা। এই ৩০ দিনে মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম মাইকের পেছনে ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রণি মাইক সার্ভিসের মালিকের হিসেবে, প্রতিটি মাইকের জন্য তারা নেয় ৪০০ টাকা; দুপুর ২টা থেকে ৮টা পর্যন্ত মাইকিংয়ের জন্য সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া নেয়া হয় ১২শ’ টাকা। সে হিসেবে রেজাউল করিমের পক্ষে মাইকিংয়ের জন্য ৩০টি অটোরিকশা ও ৩০টি মাইকের ভাড়া বাবদ দৈনিক খরচ হচ্ছে ৪৮ হাজার টাকা। এভাবে ৩০ দিন অটোরিকশা ও মাইক ভাড়া বাবদ ব্যয় হওয়ার কথা, ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। মাইকিংয়ের জন্য প্রতিটি অটোরিকশায় একজন ব্যক্তির উপস্থিতি চোখে পড়ে। একজনের পারিশ্রমিক নেয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। সে হিসেবে একজনের পারিশ্রমিক বাবদ ৫০০ টাকা করে ধরলে ৩০টি অটোরিকশার ৩০ দিনের খরচ বাবদ আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা।

এর বাইরে দুটি পিকআপে চারটি মাইক বেঁধে রেজাউল করিমের প্রচারণা চলছে বলে জানিয়েছেন রণি মাইক সার্ভিসের মালিক গৌতম মজুমদার। প্রতিটি পিকআপের দৈনিক ভাড়া আড়াই হাজার টাকা ও মাইক ভাড়া বাবদ ৮০০ টাকা হিসেব করলে পুরো নির্বাচনে আরও ১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা। এছাড়া রেজাউল করিমের বাসায়ও ৫টি মাইক ব্যবহার হচ্ছে; এগুলোর ভাড়া হিসেব করলে আরও ৬০ হাজার টাকা আসার কথা। সবগুলো খরচ যোগ করলে দাঁড়ায় ২১ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

এর বাইরে আরও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাইক ভাড়া নেয়া হয়েছে রেজাউল করিমের প্রচারণার জন্য। রণি মাইক সার্ভিসের ম্যানেজার মো. ইসমাইল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বহদ্দারহাটের জসিম মাইক সার্ভিস থেকেও মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমের জন্য মাইক ভাড়া নেয়া হয়েছে। রাইফেলস ক্লাবের সামনে থেকেও ১৫টির মতো মাইক নেয়া হয়েছে রেজাউল করিমের প্রচারণার জন্য।’ যদিও বহদ্দারহাটে গিয়ে জসিম মাইক সার্ভিস নামে কোন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি; সেখানে মাহিন মাইক ও সাউন্ড সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মাহিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমের প্রচারণার জন্য তার আত্মীয়-স্বজনরা সাত-আটদিন ৫-৬টি গাড়ির জন্য মাইক ভাড়া নিয়েছে। প্রতিটি গাড়িতে একটি করে মাইক ছিল। প্রতিদিনের মাইক ভাড়া ৫০০ টাকা।’ রণি মাইক সার্ভিসের বাইরে উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও মাইক ভাড়া নেয়া বাবদ আরও কয়েক লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা।

অথচ আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন; মাইকিং বাবদ তিনি মাত্র ২ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে মাইকিংয়ে ব্যবহার করা গাড়ির ভাড়া বাবদ পরিশোধ করবেন দেড় লাখ টাকা। বাকি ৫০ হাজার টাকার মধ্যে মাইকিংয়ের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির পারিশ্রমিক বাবদ ২০ হাজার টাকা ও মাইকের ভাড়া বাবদ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন বলে জানান রেজাউল করিম। বাস্তবে মাইকিংয়ের খরচে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা গেছে।

অন্যদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেন নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, মাইকিং বাবদ মাত্র ১৫ হাজার টাকা খরচ করবেন তিনি। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা মাইকিংয়ের কাজে ব্যবহার করা গাড়ির ভাড়া হিসেবে ব্যয় করবেন। মাইকিংয়ের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির পারিশ্রমিক বাবদ ২ হাজার টাকা ও মাইকের ভাড়া বাবদ ৩ হাজার টাকা খরচ করবেন বলে জানিয়েছেন শাহাদাত হোসেন। অথচ শুধু মাইক ভাড়া হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানকে শাহাদাতের পরিশোধ করতে হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি মাইকের দৈনিক ভাড়া ধরেছে ৪০০ টাকা করে। সে হিসেবে একটি মাইক ২০০ বার ভাড়া দেয়া হয়েছে। প্রতিটি মাইকের সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া ১২শ’ টাকা করে ধরলে গাড়ি ভাড়া আসে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। শুধু গাড়ি ভাড়া ও মাইক ভাড়া ধরলেও শাহাদাতের খরচ হচ্ছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর বাইরে মাইকিংয়ের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির পারিশ্রমিক বাবদ আরও প্রায় লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা।

শাহাদাতের প্রচারণার জন্য মাইক ভাড়া দিয়ে আসা নগরের আইচ ফ্যাক্টরি রোডে অবস্থিত বন্ধু মাইক ও সাউন্ড সার্ভিসের মালিক মোহাম্মদ আজাদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রচারণা শুরুর পর প্রথমদিকে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে মাইকিংয়ের জন্য প্রতিদিন ২১টি সিএনজি অটোরিকশা বের হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় মাইকিংয়ের সময় ভাঙচুর করা হলে গাড়ি কমিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০টি করে মাইকিংয়ের গাড়ি বের করেছে বিএনপি। গাড়ি ভাঙচুর করা না হলে আমাদের ব্যবসা আরও ভালো হতো।’

আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম যে রণি মাইক সার্ভিস থেকে মাইক ভাড়া নিচ্ছেন তার পাশেই বন্ধু মাইক ও সাউন্ড সার্ভিসের দোকান। বন্ধু মাইকের মালিক আজাদ ২২ জানুয়ারি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রণি মাইকের ব্যবসা অনেক ভালো হচ্ছে। সেখান থেকে মাইক নিয়ে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি গাড়ি বের হচ্ছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রচারের জন্য। ২১ জানুয়ারি মাইকিংয়ের জন্য ৪০টি গাড়ি বের করেছে। তাদের গাড়িতে কোনো আক্রমণ হয় না, সেজন্য বেশি গাড়ি বের করতে পারে। তারা গ্রাম সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে মাইকিং করছে, এতে কম টাকায় ভালো সার্ভিস পাচ্ছে। পুলিশ গাড়িগুলো ধরছে না। এ ধরনের গাড়ি দিয়ে বিএনপির জন্য আমরা মাইকিং করলে সব আটকে ফেলবে।’

মোহাম্মদ আজাদ আরও বলেন, ‘বিএনপির একটি চালক সমিতি আছে, তারাই মাইকিংয়ের কাজে যাচ্ছে। প্রতিটি অটোরিকশার ভাড়া বাবদ ১২শ’ টাকা ও মাইক ভাড়া বাবদ ৪০০ টাকা খরচ হচ্ছে বিএনপির।’ শাহাদাত হোসেনের প্রচারণার জন্য মাইক ভাড়া দিয়ে ৭০-৮০ হাজার টাকা আয় হবে বলেও জানান তিনি।

এ তো শুধু গেলো আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুই প্রার্থীর মাইকিংয়ের খরচের কথা। মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ও শাহাদাত হোসেনের আরও বড় খরচ আছে পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, নির্বাচনী ক্যাম্প, যাতায়াত, ঘরোয়া সভা, পথসভা, প্রতীক তৈরি ও আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতে। রেজাউল করিম চৌধুরী নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, ৪১টি ওয়ার্ডে ২০ হাজার পোস্টার বাবদ মাত্র ৫০ হাজার টাকা খরচ করবেন তিনি। সে হিসেবে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে গড়ে ৪৮৭টি করে পোস্টার পড়ার কথা। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন; আন্দরকিল্লার মতো ছোট একটি মোড়ে গেলেও দেখা যাচ্ছে হাজার খানেক পোস্টার। আর নগরজুড়ে অলি-গলিতে পর্যন্ত ছেয়ে গেছে নৌকার পোস্টারে; সে হিসেবে নগরজুড়ে পোস্টারের সংখ্যা ২০ হাজারের অনেক বেশি হবে। অন্যদিকে ২০ হাজার পোস্টার ছাপানো ও টাঙানো বাবদ মোট ৫০ হাজার টাকা খরচ করবেন বলে জানিয়েছেন রেজাউল করিম; অথচ ২০ হাজার পোস্টার ছাপাতেই ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার কথা। আর ২০ হাজার পোস্টার টাঙাতে অন্তত ৩০ হাজার টাকা খরচ লাগে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে শাহাদাত হোসেন নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, ৪১ হাজার পোস্টার ছাপানো ও টাঙানো বাবদ ১ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করবেন তিনি। অথচ এই টাকা শুধু ৪১ হাজার পোস্টার ছাপাতেই খরচ হয়ে যাবে বলে প্রিন্টিংয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরা একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন।

রেজাউল করিম নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, ১৫টি নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপনে মাত্র ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন; সেখানে কর্মীদের সম্ভাব্য খরচ বাবদ ব্যয় করবেন আরও ৭৫ হাজার টাকা। অথচ নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে রেজাউল করিমের এক বা একাধিক নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। মাত্র দুই হাজার টাকায় একটি নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করা রেজাউল করিমের প্রধান প্রতিদ্বন্ধি বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেন আবার এক কাঠি সরেস। তিনি ৪১টি নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন বাবদ মাত্র ৪১ হাজার টাকা খরচ করবেন বলে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন। এদিকে শাহাদাত হোসেন যাতায়াত খরচ বাবদ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় করবেন বলে জানিয়েছেন; অন্যদিকে দামি গাড়ি নিয়ে গণসংযোগ করা রেজাউল করিম জানিয়েছেন, তার যাতায়াত বাবদ খরচ হবে মাত্র ১৫ হাজার টাকা।

সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানোর সুযোগের পরও ২০ লাখ টাকা ব্যয় করার ঘোষণা দেয়া প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার এত টাকা খরচ হচ্ছে না। সব জায়গায় এমনিতেই ভালো সাড়া পাচ্ছি। ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ হবে না। নির্বাচনী ব্যয় ২০ লাখের নিচেই থাকবে।’ মাইকিং ও নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপনে অতিরিক্ত টাকা খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে না। প্রতিটি ওয়ার্ডে রোস্টার করে মাইকিং করা হচ্ছে।’ মাইকিংয়ে খরচের বিষয়টি তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম।

অতিরিক্ত নির্বাচনী ব্যয়ের বিষয়ে জানতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তার মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব ইদ্রিস আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মাত্র এক হাজার টাকায় বিএনপি প্রার্থীর একটি নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন ও মাইকিংয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়; তবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি ইদ্রিস আলী।

শুধু মেয়র প্রার্থীরা নয়, কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরাও ঘোষণার বাইরে বিপুল টাকা খরচ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ৩০ হাজারের কম ভোটার থাকায় নগরের ১নং পাহাড়তলী ওয়ার্ড, ২০নং দেওয়ানহাট, ২২নং এনায়েতবাজার, ২৩নং উত্তর পাঠানটুলি, ৩১নং আলকরণ, ৩২নং আন্দরকিল্লা, ৩৩নং ফিরিঙ্গীবাজার, ৩৪নং পাথরঘাটা ও ৩৫নং বক্সিরহাটসহ মোট নয়টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা আইন অনুযায়ী ২ লাখ টাকার বেশি নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন না। অথচ এসব ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকেই ইতিমধ্যে কোটি টাকার বেশি খরচ করে ফেলেছেন বলে অভিযোগ আছে।
এদিকে ভোটার সংখ্যা ৫০ হাজারের ভেতরে থাকায় ৬নং পূর্ব ষোলশহর, ১০নং উত্তর কাট্টলি, ১৪নং লালখান বাজার, ১৫নং বাগমনিরাম, ১৬নং চকবাজার, ১৮নং পূর্ব বাকলিয়া, ১৯নং দক্ষিণ বাকলিয়া, ২১নং জামালখান, ২৫নং রামপুরা, ২৬নং উত্তর হালিশহর, ২৭নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ, ২৮নং পাঠানটুলী, ২৯নং পশ্চিম মাদারবাড়ি, ৩০নং পূর্ব মাদারবাড়ি, ৩৬নং গোসাইডাঙ্গা, ৩৭নং উত্তর মধ্যম হালিশহর ও ৪১নং পতেঙ্গাসহ মোট ১৭টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন। বাকি ১৫টি ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি হওয়ায় কাউন্সিলর প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন। কিন্তু প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলি-গলিতে যে হারে পোস্টার দেখা যাচ্ছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে শুধু পোস্টার-লিফলেটের পেছনেই ৬ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করে ফেলেছেন এসব ওয়ার্ডের প্রার্থীদের অনেকেই।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যেসব ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের এক বা একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন, সেখানেই কালো টাকার ছড়াছড়ি বেশি হচ্ছে। ভোটের দিন সেখানে সহিংসতার আশংকাও করা হচ্ছে। এসব বিবেচনায় অন্তত ২৬টি ওয়ার্ডকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী, ২নং জালালাবাদ, ৩নং পাঁচলাইশ, ৪নং চান্দগাঁও, ৫নং মোহরা, ৭নং পশ্চিম ষোলশহর, ৮নং শুলকবহর, ৯নং উত্তর পাহাড়তলী, ১০নং উত্তর কাট্টলী, ১১নং দক্ষিণ কাট্টলী, ১২নং সরাইপাড়া, ১৩ নং পাহাড়তলী, ১৪ নং লালখানবাজার, ১৬নং চকবাজার, ১৭নং পশ্চিম বাকলিয়া, ২০নং দেওয়ানবাজার, ২৪নং উত্তর আগ্রাবাদ, ২৫নং রামপুরা, ২৬নং উত্তর হালিশহর, ২৭নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ, ২৯নং পশ্চিম মাদারবাড়ি, ৩৩নং ফিরিঙ্গিবাজার, ৩৪নং পাথরঘাটা, ৩৬নং গোসাইলডাঙ্গা, ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ও ৪১ নং দক্ষিণ পতেঙ্গা।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকাশনার তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম নগরে ছোট-বড় ১ হাজার ৮১৪টি বস্তি রয়েছে। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস করেন, যাদের অনেকেই নগরের ভোটার। তাদের মধ্যে ‘রাজনৈতিক সচেতনতা’ কম থাকায় সেখানে ভোট কেনাবেচা চলে বলে অভিযোগ আছে। বাকলিয়া থানা এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিম্ন আয়ের লোকজনের বসবাস বেশি। তাদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে বসবাস করছেন। সেখানে ৫০০-৭০০ টাকায় ভোট কেনাবেচার কাজ হয়, যা অতীতে দেখা গেছে। ওই এলাকার ভোট সংগ্রহের চেষ্টার অংশ হিসেবে নির্বাচনের আগের রাতে টাকা বিলানো হয় বলে অভিযোগ আছে। তবে বস্তির লোকদের দিয়েই বস্তিতে টাকা বিলির কাজ চলে বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। এছাড়া ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে অনলাইনে প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রার্থীরা প্রচুর টাকা খরচ করছেন, যার কোনো হিসাব রাখা হয় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার প্রধান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চসিক নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে। লোকজন ব্যাংক থেকে বড় অংকের টাকা তুলে নিচ্ছেন, কেউ এফডিআর ভাঙছেন। তবে গ্রাহক টাকা তুলে নিয়ে কোথায় খরচ করছেন তা জানার সুযোগ নেই।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে ব্যবহৃত নগদ টাকার অধিকাংশই কালো টাকা অর্থাৎ দেশের প্রচলিত অর্থনৈতিক সংজ্ঞায় অসৎ ও অবৈধপথে উপার্জিত টাকা। এই কালো টাকার দৌরাত্ম্য নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত করে। নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারলে সৎ ও যোগ্যপ্রার্থী আসবে না। এতে সুশাসন ব্যাহত হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রার্থীরা হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে জয়ী হলেও পদ থেকে অপসারণ করার বিধান আছে। নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করার জন্য বা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত এগুলোর পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ আবশ্যক। এজন্য অডিটর নিয়োগ করে ইসিকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মাহমুদ হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনে কালো টাকা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব প্রধানত নির্বাচন কমিশনের। এ ধরনের অভিযোগ থাকলে সেটা আগে নির্বাচন কমিশনের কাছে করা উচিত। কোন উৎস থেকে নির্বাচনী ব্যয় করা হচ্ছে, সেটা তারা খতিয়ে দেখবেন। পরবর্তীতে প্রয়োজনে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে প্রত্যেক দিনে প্রার্থী যে টাকা ব্যয় করেছেন, তার সকল বিল ও রশিদ সংরক্ষণ করতে হবে। নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীর নামে গেজেট প্রকাশিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এসব হিসাব বিবরণী নির্বাচন কমিশনে দাখিল করতে হবে প্রার্থীকে। কাগজপত্রগুলো জমা হওয়ার পর আমরা খতিয়ে দেখবো, ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো অসঙ্গতি আছে কিনা। অসঙ্গতি পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।’ প্রার্থীদের দাখিল করা নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন ১০০ টাকার বিনিময়ে এক বছর সময় পর্যন্ত অফিস চলাকালীন সময়ে যে কোন ব্যক্তি দেখতে পারবেন বলেও জানান তিনি।