বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭

চট্টগ্রামের মেয়র পদ ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’, দাবি সাবেক মেয়রের

মেয়রের কর্তৃত্ব না থাকলে ব্যয়বহুল, জটিল নির্বাচনের দরকার কী?

প্রকাশিতঃ সোমবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২১, ১:৪৪ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : জনদুর্ভোগ লাঘবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তথা মেয়রের কর্তৃত্ব না থাকলে এই ব্যয়বহুল, জটিল নির্বাচনের দরকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী।

সোমবার (২৫ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এ মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী।

তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারায় স্থানীয় সরকার আইন গণমুখী ও জোরালো করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও গণতান্ত্রিক আবরণে স্থানীয় সরকারের টুটি চেপে ধরা হয়েছে। এই মুহূর্তে যদি জনদুর্ভোগ লাগবে মেয়র বা সিটি করপোরেশনের কর্তৃত্ব না থাকে, তাহলে এত ব্যয়বহুল এবং জটিল নির্বাচনের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। – যোগ করেন মাহমুদুল ইসলাম।

বিশ্বের নানা শহরের মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি ও মেয়রদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি বোঝাতে গিয়ে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কলকাতা শহরের মেয়র নির্বাচিত কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। লর্ড মেয়র অব লন্ডন ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর উপরে অবস্থান। নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নিউইয়র্কের পুলিশ কমিশনারসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগ প্রদান করেন এবং তিনি প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।

মেয়র হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম শহরে আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ২৩টি ওয়ার্ড ছিল। আমার হাত ধরে ৪১ ওয়ার্ডের নির্বাচিত কমিশনারদেরকে ক্ষমতা প্রদান করে করপোরেশন গঠনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করি। ১৯৮৮ সালে আমি এই করপোরেশনের প্রশাসক নিযুক্ত হই। করপোরেশনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগুতে থাকি। ১৯৮৯ সালে করপোরেশনের নির্বাচিত কমিশনারদের সঙ্গে সমন্বয় করে আইন মোতাবেক চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ কার্যকর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

তাঁর আমলে চট্টগ্রামের সেবাসংস্থার প্রধানদের সিটি করপোরেশনের মাসিক সভায় আইন অনুযায়ী অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল জানিয়ে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমার হাতে প্রথম নির্বাচিত করপোরেশন গঠিত হয়। সেখানে তিন প্রকারের কমিশনার বা কাউন্সিলর ছিল- ওয়ার্ড কমিশনার, মহিলা কমিশনার এবং অফিসিয়াল কমিশনার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, গণস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ছিলেন অফিসিয়াল কমিশনার, যাঁরা প্রত্যেকে করপোরেশনের মাসিক সভায় উপস্থিত থাকতে বাধ্য ছিলেন।

দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আয় ১২শ’ শতাংশ বৃদ্ধি করে করপোরেশনকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন জানিয়ে সাবেক এই মেয়র ও সংসদ সদস্য বলেন, ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে ওয়ার্ড কমিশনার ও মহিলা কমিশনারদের উপসচিব পদমর্যাদা প্রদান করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এসে ১৯৯৩ সালের দিকে তৎকালীন জাতীয় সংসদে অফিসিয়াল কমিশনার পদসমূহ বিলুপ্ত করে আইন প্রণয়ন করে। মূলত সেই থেকেই মেয়রের আইনগত কর্তৃত্ব নগর সমন্বয় করা তথা নগর সরকার বা সিটি গভর্নমেন্টের বিলুপ্তি সাধন হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশন আইন সংশোধন হলেও অফিসিয়াল কমিশনার পদ সৃষ্টি হয়নি এবং মেয়রের পদ ‘ঠুটো জগন্নাথে’ পরিণত হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে কার্যকর কিংবা মেয়রের কর্তৃত্ব বাড়াতে সিটি করপোরেশন আইন সংশোধনের দাবি জানান মাহমুদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন যদি শক্তিশালী না হয় তাহলে জনগণ গণতান্ত্রিক স্বাদ পাওয়ার জন্য কোথায় ধর্না দেবে। বাংলাদেশের ১০টি সিটি করপোরেশন থেকে চট্টগ্রামের সমস্যা ও গুরুত্ব অধিক গুরুত্ববহ। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে। সিটি করপোরেশন আইন সংশোধন করা না গেলে নিদেনপক্ষে স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন অথবা চট্টগ্রাম নগর বা বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের অধীনে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করার দাবি জানান মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে তাঁর আমলে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাবিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট সেলিম ও অ্যাডভোকেট লিটন গুহ উপস্থিত ছিলেন।