রেজাউলের নির্বাচনী পরীক্ষা: চট্টগ্রামের নেতাদের খাতা মূল্যায়ন!


হোসাইন সাজ্জাদ : নির্বাচনটা ছিল রেজাউল করিমের। কিন্তু পরীক্ষাটি দিতে হয়েছে এই অঞ্চলের নেতাকর্মীদের। কারণ রেজাউল করিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে কারো কারো ক্ষোভ-কষ্ট থাকলেও সেই কষ্টকে পাথরচাপা দিয়ে রেজাউলকে যে কোনো মূল্যে জেতানোর পথেই হাঁটতে হয়েছে আপাত বঞ্চিত-মূল্যায়িত সব নেতাকে।

আর এই পথে সবচেয়ে বেশি কারা হেঁটেছেন, কারা দিনরাত একাকার করেছেন নৌকার প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিতে, তা নগরবাসী শুধু নয়, দৃশ্যমাণ হয়েছে দলীয় নীতি-নির্ধারণী ফোরাম তথা খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার চোখেও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ছিলেন সিটি নির্বাচনে সার্বিক বিবেচনায় প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক প্রার্থী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কোন এক অভিমানকে তাতিয়ে দিয়ে চট্টগ্রামের বেশিরভাগ শীর্ষ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা মনোনয়ন ইস্যুতে আ জ ম নাছিরকে মাইনাস করতে সেই যাত্রায় সক্ষম হন। আর রাতারাতি পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে।

নগর রাজনীতি ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এরপর সেই আপাত শক্তিশালী গ্রপটি হয়ত চেয়েছিলেন আ জ ম নাছিরের এই ‘কোণঠাসা’ অবস্থা নানা কৌশলে টেনে নিয়ে গিয়ে রাজনীতিতে তাকে ধীরে ধীরে দুর্বল কিংবা নিষ্ক্রিয় করা যায় কিনা।
কিন্তু সেই সুযোগ দেননি আ জ ম নাছির। রানিং মেয়র থেকে ছিটকে পড়েও সেই মায়াবি পদে রাজনৈতিক ভ্রাতা, সতীর্থকে (রেজাউল) বসাতে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে শিরোধার্য ঘোষণা দিয়ে আঁটঘাট বেঁধে নামেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেজাউল করিমের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব নিয়ে আ জ ম নাছির ভোটের মাঠ চষে বেড়িয়েছেন নির্বাচনের দিন পর্যন্ত। নিজের পকেটের টাকা দুহাতে বিলিয়েছেন। পোস্টার-প্রচারণা, মাইকিং, গণসংযোগ, অফিস খরচ, গণমাধ্যমে প্রচার-ব্যয়, সেন্টার খরচ, আইনশৃংখলাবাহিনী, স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের আপ্যায়ন-এমন কোনও খাত নেই যেখানে আ জ ম নাছির আর্থিক জোগান দেননি।

একটা সময় ছিল কেউ মনোনয়ন-বঞ্চিত হলে তিনি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিদ্রোহ-বিদ্রুপ-বিরোধিতা করতেন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে। অথবা প্রকাশ্যে সহযোগিতার ভান করে তলে তলে দলের প্রার্থীর ভরাডুবিতে আত্মঘাতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন।

অতীতে নগর রাজনীতিতে এমনও দেখা গেছে, মনোনয়ন না পেয়ে দলের প্রার্থীর পক্ষে আপাত সহযোগিতার সুর তুলে কোনও কোনও নেতাকে প্রকারান্তরে প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীর সাথে হাত মেলাতে।

সকালে দলের প্রার্থীর পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে বিকেলে সেনাবাহিনী ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না এমন দাবি তোলার জন্য প্রতিপক্ষ প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটিকে পরামর্শ দিতেও দেখা গেছে আত্মঘাতি নেতাদের।

দিনভর দলীয় প্রার্থীর পক্ষে জিকির তুলে নির্বাচনের আগের রাতে ‘শেখ হাসিনা ডাকাত একটাকে কেন মনোনয়ন দিল, কাল তো সেই ডাকাত মেয়র হয়ে যাবে, চাটগাঁবাসীর কপালে না জানি কত দুঃখ আছে। Ñএমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেও দেখা গেছে দলের প্রভাবশালী কোনো কোনো নেতাকে।

কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। শেখ হাসিনার প্রার্থী রেজাউল করিমকে জেতাতে খুব বেশি নোংরামির আশ্রয় না নিয়ে দলের সমস্ত নেতাকর্মী একাট্টা হয়েছেন কেউ আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদ থেকে কেউ বা রেজাউল করিম মেয়র হলে কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করার মানসে।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি একনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন; সর্বশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রেজাউল করিমকে জিতিয়ে এনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা ও দলের প্রতি তার আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা। -এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের অন্যান্য নেতারা রেজাউল করিমের পক্ষে ভূমিকা রাখলেও কয়েক নেতা বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন তাদের মনোনীত বা পছন্দের কাউন্সিলর প্রার্থীদের জেতানোর ম্যাকানিজমে। তবে এক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে রেজাউল করিমকে জেতানোর জন্য প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।

নির্বাচনের ৫ দিন আগে থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা ফেলে চট্টগ্রাম এসে অবস্থান নেন তিনি। নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতায় প্রত্যক্ষভাবে গণসংযোগে অংশ নিতে না পারলেও দলের শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্র থেকে আসা নেতাদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে ঘরোয়া বৈঠক করে নেতাকর্মীদের করণীয় ও কৌশল নির্ধারণ করে দেন। এমনকি নিজের পকেটের অর্থ জোগান দিতেও কুণ্ঠা করেননি একটি স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়নিশান নিশ্চিতের লক্ষ্যে।

এ প্রসঙ্গে এক নির্বাচনী বৈঠকে ড. হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাথীৃর বিজয় সুনিশ্চিত করতে। আর সেটাই হোক আমাদের সবার মূল লক্ষ্য।