একুশে প্রতিবেদক : থানা ভবনের কম্পাউন্ডে পড়ে আছে ধুলায় ধূসরিত অসংখ্য মোটর সাইকেল গাড়ি। সবগুলোতে দেওয়া আছে মামলার নম্বর। থানা ভবনের বাইরে পড়ে আছে বেশ কিছু কার, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা, এমনকি কোটি টাকা দামের মার্সিডিজ গাড়িও। কোনোটার আসন নেই। দরজা আছে তো চাকা, গ্লাস নেই। কোনোটার কেবল চাকা আছে আর কিছু নেই। আলামতের গাড়িগুলো পরিণত হয়েছে ইদুর, বিড়াল কিম্বা কুকুরের আবাসস্থল।
ভাঙাচোরা এসব গাড়ি দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে থেকে পরিণত হয়েছে ধ্বংস্তুপে। নগরের কোতোয়ালী থানায় গিয়ে দেখা গেছে এ দৃশ্য।
একই চিত্র চান্দগাঁও, খুলশী, বাকলিয়াসহ নগরের অধিকাংশ থানার। জব্দ করা এসব আলামত নিয়ে ভোগান্তিতে আছে পুলিশও। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এগুলোর কোনো ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না বলে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
দুর্ঘটনা কবলিত, কাগজপত্রহীন, অননুমোদিত, ফিটনেসবিহীন, মাদকবাহী গাড়িসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত এসব যানবাহন আটক করে থাকে পুলিশ।
চট্টগ্রামের খুলশি থানার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অযত্নে পড়ে থাকা এসব গাড়ি বিভিন্ন মামলার জব্দকৃত আলামত। প্রতিটি গাড়িতে মামলার নম্বর দেওয়া আছে। মামলার অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে এসব আলামত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এগুলো এভাবেই থাকবে।’
সিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো কোনো থানায় জব্দ করা গাড়ি পড়ে আছে ৬-৭ বছরের বেশি সময় ধরে। কাগজ ঠিক না থাকায় অনেকেই আবার জব্দ করা গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে থানায় আসেন না। অপরদিকে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় গাড়িগুলো মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেক ভাঙাচোরা গাড়ির মালিকদের খোঁজ মিলছে না।’
পাচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভুইয়া বলেন, ‘বিচারাধীন বিভিন্ন মামলার আলামত হিসাবে জব্দ করা গাড়ি পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় থানা চত্বরে রাখা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এসব আলামত ধ্বংস বা কোনো গতি করা যাচ্ছে না।’
খুলশি থানার ওসি (তদন্ত) আফতাব আহমেদ বলেন, ‘যানবাহনের কোনো অপরাধ নেই। অপরাধ হয় চালক, মালিক কিংবা ব্যক্তির। এগুলোর কোনোটিতে মাদক পাওয়া গেছে কিংবা দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে অথবা বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা আছে, ফলে এগুলোর কেউ মালিকানা দাবি করে না। এজন্য দীর্ঘদিন ধরেই পড়ে আছে।’
নগরের পাচলাইশ চান্দগাঁও থানায় গিয়ে দেখা যায়, খালি জায়গায় স্তুপাকার ও ধুলায় ডুবে থাকা যানবাহনগুলো চেনার উপায় নেই। শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশও। অযত্ন-অবহেলায়, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে আলামত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় যানগুলোর ভেতরের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি খোয়া গেছে। মালখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া নম্বরও মুছে গেছে অনেক আলামত থেকে।
নগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখা সুত্র জানিয়েছে, ১৬ থানায় এখন চার শতাধিক বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহন পড়ে আছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই কোতোয়ালী থানায়।
সিএমপির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ছোট ছোট আলামত থানার মালখানায় জমা রাখা যায়। কিন্তু যানবাহনসহ বড় আলামত থানার মালখানায় রাখা সম্ভব নয়। এজন্য খোলা আকাশের নিচে রাখা হয় আলামত। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এগুলোর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তাণভীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, “১৬ থানায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ মামলার আলামতের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা কিছুই করতে পারি না। আদালত যে আদেশ দেবেন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে আলামতগুলো মামলা নিষ্পত্তি হলেও দীর্ঘদিন রেখে দিতে হয়।”
কোতোয়ালী থানায় গিয়ে দেখা গেছে, কম্পাউন্ডের বাইরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে ১০-১২ টি গাড়ি। কিছু গাড়ির চাকা গেঁথে গেছে মাটির নিচে। আগাছায় পরিপূর্ণ কিছু গাড়িকে গাড়ি হিসেবে চিনতেও কষ্ট হয়।
এ ব্যাপারে কোতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘আলামত হিসাবে পড়ে থাকা কোটি টাকা দামের মার্সিডিজ গাড়িটি ২০১১ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় জব্দ করা হয়েছিল। আদালতের কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় ওই গাড়ির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া কোতোয়ালী থানার জন্য আলাদা একটি ডাম্পিং স্টেশনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।
একুশে/এমআর/এটি
