সুন্দরের বুকেই বুলডোজার চালিয়েছে বলদর্পী মনুষ্যরূপীরা

আবু মুসা চৌধুরী : একটি সাহিত্য সাময়িকীতে মহান লেখক অদ্বৈত মল্ল বর্হ্মণের সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়ে এবং লেখক পরিচিতিতে পদবী জেনে অভিভূত ও বিস্মিত হয়েছিলাম। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিয়েছিলো- আর একজন সরকারি উচ্চপদস্থ ক্ষমতাবান লেখকের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

বাংলা উপন্যাসের জনক সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সরকারি গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলা উপন্যাসের সূচনা করে দিয়েছিলেন তিনি- যা আমরা সকলেই অবগত।

সুসাহিত্যিক অন্নদা শঙ্কর রায়ও ছিলেন আমাদের চট্টগ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ পদে। তিনি কালজয়ী সাহিত্যসৃষ্টির সমান্তরালে মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যেও অক্ষয় ও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

মনীষী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদকে অন্নদাশঙ্কর রায় স্বযাচিত হয়ে স্বীয় উদ্যোগে চট্টগ্রাম আদালতে চাকরিতে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন আবুল ফজল, লোকসাহিত্য সংগ্রাহক আশুতোষ চৌধুরীসহ আরো অনেক মনস্বীজন।

আর সুসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব পালন করে গেছেন মাত্র ক’দশক আগেই। তাঁর কৃতিত্বের ফসল আজকের শিল্পকলা একাডেমি- তা চট্টগ্রামবাসীর স্মরণে রয়েছে।

এতো এতো পশ্চাৎ কাহিনী টেনে আনার উপলক্ষ্য যে কারণে, তা হলো আমার মত এমন একজন উচকপালে পাঠককে মুগ্ধ করা তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের রচয়িতা অদ্বৈত মল্ল বর্হ্মণকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধকারের পদবি পরিচিতি; তিনিও একজন সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা- নাম তার আবদুল মান্নান।

আমাদের চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন বছর দেড়ে আগেও। এর আগে তিনি অত্র জনপদের জেলা প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করেছেন সুনিপুণভাবে। পরবর্তী তার অন্যান্য সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধার পরিধি বেড়ে যায় আরো। করোনাকালেও তিনি সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন- তাঁর ব্যক্তিগত জনহিতৈষণায় এবং পারিবারিক ট্র্যাজেডির কারণে।

তো, দূর থেকে এই গুণীজন, সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় প্রণত হয়েছি। কিন্তু গত সপ্তাহে একটি খবর পড়ে চমকে উঠলাম। তার ওপর বলদর্পী মনুষ্যরূপী অপশক্তির নিপীড়ন শুনে আহত হলাম মনে-প্রাণে।

প্রথমেই আমার তাড়িত মনের প্রশ্ন ছিলো-একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যিনি সৃজনকর্মে বিজড়িত- তিনি তো কখনও জনগণমনবিরোধী বা জনকল্যাণের বিপক্ষে কোনো অবস্থান কোনোমতেই নিতে পারেন না। যেহেতু তার আরাধ্য সুন্দরের নন্দীপাঠ এবং মঙ্গলব্রতই তার জীবন ও সৃষ্টির নিয়ামক। কিন্তু জগতের সবকিছুই সঠিক নিয়মে পরিচালিত হয় না। কথায় আছে- বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।

লেখক আবদুল মান্নানের ওপর নিপীড়নকারী ওই ব্যক্তিপ্রবর হলেন প্রাক্তন উদিধারী, এখন তিনি সংসদ সদস্য। ঘটনার গহীনে গিয়ে জানতে পারলাম সুসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সম্প্রতি প্রাণঘাতি করোনা মহামারিতে হারানো তার স্ত্রীর স্মৃতিরক্ষার্থে নিজ গ্রাম কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়াসী হন। এতেই গাত্রদাহ শুরু হয় সাংসদ নুর মোহাম্মদের। তার অমূলক ধারণা- আবদুল মান্নান পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের সুপ্ত মনোবাসনা থেকেই এই মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন। উল্লেখ, সাংসদ নুর মোহাম্মদ এবং স্বাস্থ্যসচিব আবদুল মান্নানের বাড়ি একই গ্রামে।

আফসোস! কী কূট সন্দেহ! কমিউনিটি ক্লিনিক হলে তো তার সুফল ভোগ করবে গ্রামের চিকিৎসাবঞ্চিত অসহায় দরিদ্র মানুষ। যেখানে সাংসদ নুর মোহাম্মদের এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানো উচিত, সেক্ষেত্রে তিনি নিজের পোষ্য ক্যাডার বাহিনী দিয়ে পেশীশক্তির মাধ্যমে সুন্দরের বুকে বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছেন।

আবু মুসা চৌধুরী কবি-সাহিত্যিক, চট্টগ্রাম