‘কষ্টের নহর বইয়ে গেছে’- মান্নানকে লেখা কবি মোহন রায়হানের চিঠিতে


একুশে প্রতিবেদক : দেশে যোগ্য-বলিষ্ঠ সচিব কম নেই। কিন্তু সুসাহিত্যিক, শক্তিমান কথাকার মো. আবদুল মান্নানের মত সচিব নেই। কর্মে, লেখায়, চিন্তায়, আদর্শের নিনাদে তৈরি আবদুল মান্নানরা জাতির সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে শেষ ভরসা, অন্ধকারে আলোকবর্তিকা।

সেই মানুষের ঘরে, মনে যখন দানবের হামলা হয়, তখন অসংখ্য লোকসংখ্যার ভিড়ে প্রকৃতই মানুষ হয়ে ওঠা মনুষ্যমহলে নিন্দার ঝড় বইবে, অন্তরে কষ্টের বেহাগ বেজে ওঠবে তাই-ই স্বতঃসিদ্ধ, স্বাভাবিক।

তেমনই একজন স্বাধীনতাত্তোরকালে বাংলাদেশের কবিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন; শক্তিমান-মুক্তিযোদ্ধা কবি মোহন রায়হান। যিনি সচিব-কথাকার আবদুল মান্নানের ঘরে বলদর্পী, মনুষ্যরূপীদের আঘাত মেনে নিতে পারেননি। ছাইভস্ম কষ্টের স্তূপে দাঁড়িয়ে আবদুল মান্নানের জন্য তিনি একটি চিঠি লিখেছেন, যে চিঠির প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠেছে নিদারুণ কষ্টের প্রতিচ্ছবি।

‘কষ্টের নহর বইয়ে গেছে’ শিরোনামে সে চিঠিখানা হুবহু তুলে ধরা হল একুশে পত্রিকার পাঠকদের জন্য।

মান্নান প্রিয়

তোমার গ্রামের বাড়িতে অনভিপ্রেত হামলা আমাকে এতটাই হতবিহ্বল আর মর্মাহত করেছে যে, কী বলে তোমাকে সহমর্মিতা জানাব এখনও সে ভাষা খুঁজে পাইনি।

গত কয়েকদিনে শুধু মনে হয়েছে, কেনো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, কেনো যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছিলাম সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পন্ন একটি সুখি সুন্দর সমৃদ্ধশালী সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে? কেনো নিকলাই অস্ত্রভস্কির মতন বলতে পারি না, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আমি ব্যয় করেছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ মানুষের মুক্তি সংগ্রামে?” কেনো নিজের শরীর-মন ক্ষতবিক্ষত করার সুযোগ দিয়েছিলাম, ফ্রাঙ্কেন্টাইন রাষ্ট্রদানবকে?

কী চেয়েছিলাম? আর কী পেলাম? যে দেশে যে সমাজে কোনো মহৎ কর্মও করা যায় না, অসুয়া জর্জরিত ক্ষমতা আর প্রতাপশালীদের দম্ভ, অহংকার আর দৌরাত্ম্যে! আইন প্রবর্তকেরা যখন আইন লংঘন করে! আইনের শাসন মানে না! প্রজাতন্ত্রের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবেও তোমারই যখন এই অবস্থা তখন সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? কী করবার আছে তাদের? এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এই নষ্ট পচা-গলা সমাজে নিরুপায় অসহায় কায়েমী স্বার্থবাদীদের কাছে। তার ভুড়ি ভুড়ি প্রমাণ সমাজে বিদ্যমান। এমনকি আমার ব্যক্তি জীবনেও তার প্রমাণ আছে।

তাই তুমি, আমি, আমরা পারিনি। কিন্তু যাই বলো, বিদ্যমান রাষ্ট্র আর সমাজ ব্যবস্থা বদলের কোনো বিকল্প নাই।  করোনা বিশ্ব পুঁজিবাদের অন্তঃসারশূন্যতার স্বরূপ যেভাবে উন্মোচিত করেছে আর সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের তথাকথিত মানবতার মুখোশও উদাম হয়ে পড়েছে যা এখন মাস্কে ঢেকে রাখতে হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন হতেই হবে সে যে স্বরূপেই হোক।

মনে রেখ, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয়ের সচিব তুমি। অর্থাৎ সমসময়ের সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ সচিব তুমি। যেন একটা ধারালো তলোয়ারের উপর দাঁড়িয়ে আছো। একটু এদিক সেদিক হলেই জাতি নিপতিত হবে মহাকালের গভীর মহাখাদে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি পারবে। কারণ তোমার বুকের গহীন ভিতরে লুকিয়ে আছে দেশ ও জনগণের প্রতি এক মহান ভালোবাসা বা দেশপ্রেম। জীবনের শুরুতেই তুমি দীক্ষা নিয়েছিলে দুনিয়ায় এক মহান আদর্শে। বদলে দিতে চেয়েছিলে, এই নীতি নৈতিকতা মানবিক মূল্যবোধহীন সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা। কালের যাত্রায় যদিও তুমি সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থারই মর্মমূলে বসে আছো কিন্তু তোমার “প্রথম প্রেম” থেকে তুমি বিচ্যুত নও, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যেখানে যেভাবে থাকো মানব কল্যাণে তুমি নিবেদিত থাকবে সে প্রত্যয় আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখা তোমার কর্মতৎপরতা, বিশ্বাসের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, অকৃত্রিমতাই তৈরি করেছে।

আমলাদের যে জনবিচ্ছিন্নতা, নির্মানবিকতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা রাষ্ট্র তৈরি করে দেয় এবং ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানা অশুভ, অপকর্মের সঙ্গে তারা কালক্রমে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যায় আমি যতদূর জানি সেগুলো তোমাকে স্পর্শ করেনি। বরং তুমি সবসময় জনবান্ধব থাকার চেষ্টা করেছ, মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছ। আশা করি আজীবন তুমি আমাদের প্রিয় মান্নানই থাকবে। আমরা গর্ববোধ করবো তোমার জন্য।

তোমার প্রিয়তমা স্ত্রী, বিশেষত তোমার সন্তানদের “মা”র অভাবনীয়, অকল্পনীয়, অসহনীয়, হৃদয়বিদারক অকাল প্রয়াণ কিছুতেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়। তুমি সম্রাট শাহজাহান নও। কিন্তু মানব কল্যাণের মাধ্যমে প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর স্মৃতিকে চির স্মরণীয় রাখতে তোমার যে মহৎ উদ্যোগ, যত বাধা আসুক, যত ঝড়ই উঠুক সেটা তোমাকে বাস্তবায়ন করতেই হবে।

তুমি ছাত্রজীবনে রাজপথের লড়াকু সৈনিক। বুলেটের সামনে নিঃশঙ্ক চিত্তে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো যোদ্ধা। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সিভিল সার্ভেন্ট, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞিত দক্ষ প্রশাসক। হেরে গেলে চলবে না। জিততে তোমাকে হবেই। গোর্কি বলেছিলেন, তারাই জিতবে যাদের আত্মবিশ্বাস আছে।” তোমাকে বিজয়ী দেখতে চাই। অকৃত্রিম অনিঃশেষ ভালোবাসা।

মোহন রায়হান