- শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস চট্টগ্রাম কলেজে। ছবি : প্রথম আলোর সৌজন্যে
মোহাম্মদ রফিক : দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় গতবছর ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কওমি মাদ্রাসা বাদে অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গত বছর জুলাই থেকে অনলাইন, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সরকার বিকল্প শিক্ষাদানের উদ্যোগ নিলেও তা খুব একটা সাফল্য পায়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ক্লাস বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেমে নেই সভা, সমাবেশ ও উৎসব। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে (সিআইইউতে) শুরু হয়েছে ২০২১ স্প্রিং সেমিস্টারের শিক্ষার্থীদের ক্লাস কার্যক্রম। করোনা ঝুঁকির বিষয়টি তোয়াক্কা না করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে স্বশরীরের ভর্তি কার্যক্রম।
করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ওরিয়েন্টেশন ক্লাস হয়ে হল চট্টগ্রামের ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের পৃথক তিনটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী।
ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠাান হয়ে গেল সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। করোনার ঝুঁকি বাধা হতে পারছে না বিভিন্ন উৎসব উদযাপনেও। ক্লাস বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে বিভিন্ন অনুষদের পরীক্ষা। এছাড়াও সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পালিত হয়েছে সনাতন ধর্মাম্বলম্বীদের স্বরস্বতী পূজা।
এদিন চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষার্থীরা মেতেছে বাঁধভাঙা উল্লাসে। উৎসব পালন করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই ছিল না। করোনার সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে এভাবে উৎসব পালনের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক আলোচনা চলছে।
চট্টগ্রাম কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক শাহেদ আকবর চৌধরী প্রশ্ন রেখে বলেন, “প্রায় এক বছর স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। শিক্ষার্থীদের ক্লাস চালু হলে করেনার ঝুঁকি আর উৎসব করলে কি করোনা ধরবে না?
প্রায় এক বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঝুঁকিতে ফেলেছে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও।
বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আহসান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপিই বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত সিহামের প্রশ্ন-ক্লাস না চললেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম, বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে ঘিরে সভা, সমাবেশ তো চলছেই। শুধু ক্লাস করলেই করোনা আক্রমণ করবে?
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিনিয়র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্ষণিকের আনন্দ যেন পরিবারে বা বন্ধুমহলে বড় কোনো দুঃখ বয়ে না আনে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় আসার পরও স্বাস্থ্যবিধি আমাদের মেনে চলতে হবে।’
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ’র অন্যতম পরামর্শ হলো- ‘উৎসব, অনুষ্ঠান, বিশেষ দিবস পালনে অংশ নেয়ার সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। মুখে মাস্ক পরতেই হবে। ভিড় না করে ছোট ছোট দলে বা গ্রুপে উৎসব উদযাপন করুন, বড় জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। শিশুদের সঙ্গে না নেয়াই উচিত। বদ্ধ জায়গার চেয়ে খোলামেলা স্থান বেছে নিন।’
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে উৎসব পালনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার বিষয়টি সহানুভূতির সাথে দেখার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুজিবুল হক চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ন্যূনতম যতটুকু উৎসব করা যায় ততটুকু করতে বলেছিলাম। করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা চারটা বুথ করে দিয়েছিলাম। এবার আমরা কোন আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সমাবেশের আয়োজন করিনি। এরপরও পূজার্থীরা আসে নাই যে তা না। আমি নিজের চোখে দেখেছি প্রচুর পূজার্থী এসেছে। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ বড় এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উৎসব পালন হলেও চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষার্থীরা ঢুঁ মারতে গিয়ে সমাগমটা একটু বেশি হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎসব পালন করতে আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। মাস্ক পরিধান করার জন্য সারাক্ষণ মাইকে ঘোষণা দিয়েছি। মাস্ক পড়ার জন্য, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য শিক্ষকেরাও সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি একুশে পত্রিকাকে বলেন, “আমরা শুধু বলতে পারি যে, সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। বাকি কাজ তো প্রশাসনের। মানুষের সচেতনেতারও একটা বিষয় আছে। নিজেদের সচেতন হতে হবে। শিক্ষকরা হচ্ছেন আমাদের বিবেক। মানুষদের মধ্যে একটা ভাব চলে আসছে যে, কিছুই হবে না। আসলে কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে মানুষও হাঁপিয়ে উঠেছে। সবাই মিলে স্বাস্থ্যবিধি চলার চেষ্টা করতে হবে। এখন রিকশাওয়ালাও জানেন যে, মাস্ক পড়তে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো নিজের থেকে সচেতন না হলে লাঠি দিয়েও কিছু হবে না।’

