ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষার প্রতি দরদ বাড়ে জেলা প্রশাসনের!

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : সারা বছরই দর্শকের ভূমিকা পালন করলেও ফেব্রুয়ারি মাস এলেই যেন বাংলা ভাষার প্রতি ভক্তি-দরদ বেড়ে যায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের। ভাষা দিবসকে সামনে রেখে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে রীতিমতো চলে ফটোসেশনের মহড়া।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করতে সতর্কতামূলক এসব অভিযান শুধু কয়েকদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বিষয়টিকে বাংলা ভাষার প্রতি প্রতারণা ও অমর্যাদাকর বলেও মনে করেছেন সমাজের সুধীমহল।

গতকাল শনিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) নগরের জিইসি, কাজীর দেউড়ি, জামালখান ও চকবাজার এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিপণী বিতান এবং দোকানের ইংরেজি সাইনবোর্ড সরিয়ে বাংলায় লিখতে ৩ দিনের সময় বেধে দেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ভাষার সাইনবোর্ড না সরালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, মিজানুর রহমান এবং রেজওয়ানা আফরিন নেতৃত্বে পরিচালিত এসব অভিযানে।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অন্যান্য সকল অভিযানের মতই এই অভিযানেও বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষার সাইনবোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও একুশে পত্রিকাকে তারা জানিয়েছেন ভিন্ন কথা।

অভিযান পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যেও রয়েছে একাধিক ব্যাখ্যা। কেউ মোবাইল কোর্ট আইনের সীমাবদ্ধতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় জরিমানার পরিবর্তে এসব সতর্কতামূলক অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

কারো ভাষ্যমতে, বছরের অন্যান্য সময় এই বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করলেও তা অন্য সকল অভিযানের আড়ালে থেকে যাওয়ায় তেমনটা ফোকাস হচ্ছে না। আবার কেউ বলছেন, জেলা প্রশাসন সারা বছরই এধরনের অভিযান পরিচালনা করলেও সংবাদ মাধ্যমের স্বল্প প্রচারের কারণে তা জনসম্মুখে আসছে না।

বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ৩ ধারায় সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এছাড়া, ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সব ধরনের সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, সরকারি দফতরের নামফলক ও গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারকে আদেশ দেন।

আইনে বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও নগরের বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিপণী বিতানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, গাড়ির নম্বর প্লেট, ব্যানার, দফতরে ইংরেজি অক্ষরে লেখা হচ্ছে।

শুধু কি তাই, প্রায় সকল দোকান, অভিজাত শপিংমল, বিশ্ববিদ্যালয়, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড, এমনকি মূল ফটকে বহুদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে ইংরেজি ভাষা।

বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ও হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে সনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও বিপণী বিতানে বছরের পর বছর বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হয়ে আসলেও জেলা প্রশাসন পরিচালিত এসব অভিযানে জরিমানা না করে শুধুমাত্র সতর্কবার্তা কিংবা দু-তিন দিনের সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস চলে গেলে সবকিছু হয়ে যায় স্বাভাবিক।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (সাধারণ শাখা) মিজানুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আগের তুলনায় চট্টগ্রামে অনেক বেশি বাংলা ভাষার সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো না কোনোভাবে জনগণকে সচেতন করা হয়েছে বলেই এই পরিবর্তনটা এসেছে। তবে গতকালের অভিযানে আমরা বলেছি, অন্যান্য ভাষার ব্যবহার করলেও বাংলা ভাষাকে তাদের ফোকাস করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন সবসময়ই কোনো না কোনো অভিযান পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু আমাদের কিছু কাজ হয়তো ফোকাস পায় কিছু ফোকাস হয় না। যেমন বাজারে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ে অনিয়ম হলে আমাদের নজর সেদিকে থাকে, তেমনি করেই আমরা আমাদের অন্যান্য কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করে থাকি।’

বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষা ব্যবহাররের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইন না থাকাকে দায়ী করছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (স্টাফ অফিসার টু ডিসি এবং ট্রেজারী শাখা) মো. উমর ফারুক।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘মোবাইল কোর্টের নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় সতর্কতা জানানো ছাড়া আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। তবে পরবর্তীতে তারা যদি এই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন না করে তখন তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মামলা হতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা গতকাল বেশ কিছু দোকান, প্রতিষ্ঠান ও বিপণী বিতানকে এই বিষয়ে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করছি অতি শিগগির এই বিষয়ে আপনারা পরিবর্তন দেখতে পাবেন।’

জানতে চাইলে নবাগত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষার সাইনবোর্ড ব্যবহারের বিষয়ে হাইকোর্টের যে নির্দেশনা আছে তার অনুসরণ করেই আমাদের এই অভিযানগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। গতকালও এই নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, আগামীকালও আমাদের পক্ষ থেকে একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। এই ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন দিন সময় বেধে দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু বাংলা ভাষার পাশাপাশি পর্যটকদের সুবিধার্থে অন্যান্য ভাষার ব্যবহার করা হয় তাই পর্যটকদের সংশ্লিষ্টতা আছে এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু সফটলি দেখার কথা আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বলেছি। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বা দোকান এই নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের অন্য ভাষা সম্বলিত সাইনবোর্ডগুলো আমরা উচ্ছেদ করবো।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের এইধরনের অভিযান এখন থেকে নিয়মিত চলবে, চট্টগ্রামবাসীকে এই বিষয়টি আমি নিশ্চিত করতে চাই। আমরা প্রতিমাসে অন্তত একবার এই অভিযান পরিচালনা করার চেষ্টা করবো।’