একুশের আড্ডায় ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার গল্প শোনালেন ডা. বিদ্যুৎ

চট্টগ্রাম : অমর একুশে উপলক্ষে একুশে পত্রিকার আড্ডায় অংশ নিয়ে করোনা ক্রান্তিকালে দেশের প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার গল্প শুনিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া।

তিনি বলেন, মানুষ যখন সামান্য জ্বর-সর্দির চিকিৎসাও পাচ্ছিলেন না, করোনা আতঙ্কে সবার মাঝে পলায়নপর অবস্থা-তখন আমি একটা চেম্বার নিয়ে চিকিৎসা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজাদ ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় সেই চিন্তা থেকে ফিরে এসে ফিল্ড হাসপাতাল করতে উদ্যোগী হলাম। আজাদ ভাই (একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার) আর রানু আপাকে (এডভোকেট রেহানা বেগম রানু) সাথে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ফিল্ড হাসপাতালই করে ফেললাম।

রোববার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে জামালখান একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একুশে আড্ডায় তিনি এই গল্প শোনান।

ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, আমি ভালো রান্না করতে জানি। তো লকডাউনের সময় একদিন সন্ধ্যায় (২৬ মার্চ ২০২০) আমি হালিম রান্না করে আজাদ ভাই আর রানু আপাকে দাওয়াত করি। হালিম খেতে খেতে আমি চেম্বার করার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করি তাদের। আজাদ ভাই বললেন ফিল্ড হাসপাতাল করেন, আমরা থাকব আপনার সাথে। যেই কথা সেই কাজ-আজাদ ভাইয়ের কথামত একটা স্ট্যাটাসও করে ফেললাম ফেইসবুকে। তারা দুজন ছিলেন সেই স্ট্যাটাসের প্রথম মন্তব্যকারী। এরপর প্রচুর রেসপন্স আসতে লাগলো। জায়গা কোথায় পাওয়া যেতে পারে চিন্তা করতে করতে রানু আপা মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং পরে মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে ফোন দিলেন। কোনো কারণে তখন তারা জায়গার সংস্থান হয়তো করতে পারেননি। কয়েকদিন পরই নাভানা থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করল। আমরা জায়গা দেখতে গেলাম, পছন্দ হলো। এরপর কী হলো আপনারা সবই জানেন।

তিনি বলেন, আমি এমনই। কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আর বসে থাকতে পারি না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রকেট গতিতে চলতে পছন্দ করি। ওই সময়টাতে খাওয়া-নিদ্রা কিছুই ভালো লাগে না। ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত গল্প নিয়ে শিগগির একটা প্রকাশনা বের হতে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন ডা. বিদ্যুৎ।

একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদারের ভূঁয়সী প্রশংসা করে ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, আজাদ তালুকদারের সাথে আমার পরিচয় অনেক বছরের। তবে উনাকে আমি প্রথম দেখি টেলিভিশনে। সরাসরি না দেখেও তার প্রতি আমার ভালোলাগা কাজ করে, কারণ আজাদ ভাইয়ের রিপোর্টিং আমাকে আকৃষ্ট করতো। বিশেষ করে তার শব্দচয়ন, উচ্চারণ খুবই চমৎকার। দেশে এসে আজাদ ভাইয়ের সাথে আমি দেখা করি। সেই থেকেই আজাদ ভাইয়ের সাথে একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠে। এখন তার সাথে সাংবাদিকতা নিয়ে আমার আলোচনা হয়। এমনও হয়েছে আমরা দুজন একসাথে নিউজ খুঁজেছি। আমি ছবি তুলেছি, আজাদ ভাই নিউজ করেছেন।

সবসময় মানুষকে নিয়ে চলতে এবং মেধাবীদের সাথে আড্ডায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জানিয়ে ডা. বিদ্যুৎ বলেন, আমি যখন ডেনমার্কে ছিলাম তখন আমার বাসাটা ছিল মিনি বাংলাদেশ, একখণ্ড চট্টগ্রাম। উচ্চশিক্ষার জন্যে ১০ বছর ডেনমার্ক অবস্থান করেও আমি এক মুহূর্তও বাংলাদেশ থেকে দূরে ছিলাম না। সেখানে নানা কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমার ছেলেরাও অনেক মানবিক। তারা মানুষ দেখলে খুশি হয়। আমার বাসায় কেউ যদি ব্যাগ ছাড়া আসে, আমার ছেলেরা অখুশি হয়, তাদের ধারণা ব্যাগ যেহেতু আনেনি, তাহলে তারা রাতে থাকবে না। এটা ভেবে তারা মন খারাপ করে।

স্কুলের ফার্স্টবয় থেকেও সহপাঠীদের কথা ভেবে এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেননি জানিয়ে বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, আমার সহপাঠীদের অনেকের নির্বাচনী পরীক্ষার প্রস্তুতি দুর্বল ছিল। পরীক্ষায় ফেল করার সম্ভাবনা অনেকের। তাদের কথা ভেবে বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে জ্বরের ভান করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকি। বাবা জিজ্ঞেস করলে এমন ভাব করি যে, জ্বরে আমি কাতর। পরীক্ষা না দিয়েও ক্লাশের ফার্স্টবয় বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে এলাও করতে বাধ্য হয় পরে। সেই সাথে এলাও করে নেয় পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া কিংবা অকৃতকার্য আমাদের অন্য সহপাঠীদেরও। এভাবেই সব সময় সুখে-দুখে মানুষের থাকি, থাকার চেষ্টা করি। -বলেন ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া।

‘আমি শুধু সকাল-বিকাল রোগী দেখব, তারপর বাসায় খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ব, আবার রোগী দেখা-এমন গৎবাঁধা জীবনের পক্ষে নই। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি পড়াশোনা, গবেষণা, সৃজনশীল আড্ডা, মানবকল্যাণ ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করার ব্যাপারগুলো আমাকে খুব বেশি টানে, আকৃষ্ট করে। – যোগ করেন ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া।

একুশে আড্ডায় জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বাদল সৈয়দ, একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার, চসিকের প্রাক্তন কমিশনার ও মানবাধিকারকর্মী এডভোকেট রেহানা বেগম রানু,  চট্টগ্রামের অতিথি খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার খাদিজা রহমান, প্রাচীন জিনিসের সৌখিন সংগ্রাহক ও শিল্পোদ্যোক্তা তারেক জুয়েল, বাতিঘরের সত্ত্বাধিকারী দীপংকর দাশ, সৃজনশীল ব্যবসায়ী সানিয়াত লুৎফী, চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রেসিডেন্ট টিপু সুলতান সিকদার, চট্টগ্রাম আইটি ফেয়ারের সত্ত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম, ডেইলি স্টারের চট্টগ্রাম করসপনডেন্ট মোস্তফা ইউসুফ, লেখক-সাংবাদিক ফয়সাল করিম, জাতীয় বিতার্কিক ইশরাত জাহান ইমা প্রমুখ।

আড্ডায় বাঁশির সুরে সবাইকে মোহাবিষ্ট করেন বিকাশ দেবনাথ।