মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও কঠিন শাস্তি দীপান্তর, তাই খাদিজার দেশে ফেরা

একুশে প্রতিবেদক :  ‘সক্রেটিসকে পছন্দ করতে বলা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড না দীপান্তর। তিনি বেছে নিয়েছিলেন মৃত্যুদণ্ড। একটা সময়ে দীপান্তরও ছিল একটা গুরু শাস্তি। আমার মনে হয় দীপান্তরটা মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কঠিন, ভয়ঙ্কর। প্রবাসে থাকা মানে একরকম দীপান্তরের শাস্তি অনুভব করা। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিজের কাজ ও পরিবারের সাথে থাকার জন্যও আমার দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন। ১৯৯৪ সালে বিয়ে এরপর এতগুলো দিন একসাথে কাটানো। স্বামী ও পরিবার থেকে দূরে বাংলাদেশে চলে আসা এবং নিজের কাজের জন্য পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া, আমি বলব একজন নারীর জন্য বেশ কঠিন। তবে আমার মনে হয় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। কাজের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসা দরকার। সে কারণেই দেশে ফেরার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ’একুশে আড্ডায়’  যোগ দিয়ে ব্যক্তিগত জীবন, প্রণয়-সংসার ও গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে নিজের ক্যারিয়ারসহ নানা বিষয়ে কথা বলছিলেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার খাদিজা রহমান।

আড্ডায় অন্যান্যের মধ্যে চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা ও একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার, চসিকের প্রাক্তন কমিশনার ও মানবাধিকারকর্মী  অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু, চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের প্রধান উদ্যোক্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া, সৌখিন এন্টিক সংগ্রাহক, শিল্পোদ্যোক্তা তারেকুল ইসলাম জুয়েল, সাহিত্যিক আবু মুসা চৌধুরী, বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা দীপংকর দাশ, সৃজনশীল ব্যবসায়ী সানিয়াত লুৎফী, চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রেসিডেন্ট টিপু সুলতান সিকদার, চট্টগ্রাম আইটি ফেয়ারের সত্ত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম, ডেইলি স্টারের চট্টগ্রাম করসপনডেন্ট মোস্তফা ইউসুফ, লেখক-সাংবাদিক ফায়সাল করিম, জাতীয় বিতার্কিক ইশরাত জাহান ইমা, হিডেন হার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সুনেহরা জহুরা ইসলাম প্রমুখ।

খাদিজা বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় পাইলট হতে চেয়েছিলাম। সেজন্য এগিয়েছিলাম কিছুদূর। পরে আগ্রহ অন্যদিকে চলে যায়। আর্কিটেকচার বিষয়ে পড়তে ভর্তি হয়েছিলাম বুয়েটে। একবছর পড়েছি কিন্তু তারমধ্যেই প্রেম। তো, বিয়ে করে চলে যাই লন্ডনে। লন্ডনে যাওয়ার পর মনে হয়েছে আমার সম্ভাবনাকে আমি নষ্ট করতে চাই না। আমি কেউ একজন হতে চাই।’

‘সেখানে আমি কোন বিষয়ে পড়ব এমন ভাবতে ভাবতে আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করলাম একবছর। সেটা আমার খুব ভালো লাগেনি। তারপরে ফাইন্যান্সেও গিয়েছিলাম; সেখানেও আমার ভালো লাগেনি। তারপর এসে পড়লাম ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে।’- যোগ করেন তিনি।

ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার হাতেখড়ি কীভাবে তা জানাতে গিয়ে খাদিজা বলেন, ‘ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম যুক্তরাজ্যের সেন্ট্রাল সেন্ট মার্টিন স্ট্যানো নামে একটি কলেযে। পড়া শেষ করেই যোগ দিই জুনিয়র ম্যাটলিন নামে একজন ডিজাইনারের সাথে। পরবর্তীতে ওই কাজটিই আমাকে সাহায্য করেছে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকতে।’

খাদিজা রহমান বলেন, ‘২০০১ সালে কাইলির একটি পোশাকে আমি ক্রিয়েটিভ কাজ করি। সেটি ডিজাইন করেছিলেন জুনিয়র ম্যাটলিন। আমি নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলাম ওখান থেকেই। তখইন আমি প্রথম শোবিজ সম্পর্কে ধারণা পাই। শোবিজ কেমন হয়, ফ্যাশনের গ্ল্যামারটা কেমন হয় সম্যক ধারণা পেয়েছিলাম সেদিনই। তবে সেদিনের দেখাটাই পুরো সত্য নয়। পুরো বাস্তবতা বুঝতে আরও সময় গড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ফ্যাশনের অন্য একটি সাইড ইন্ডাস্ট্রিতে যখন ঢুকেছি তখন আমি বাস্তবতাকে আরও বুঝে নিয়েছি। যেদিন আমি উৎপাদন সম্পর্কে বুঝতে পেরেছি তখন আমার মনে হয়েছিল-গ্ল্যামারের চেয়ে বেশি বাস্তবতাকে বুঝেছি এবং আরও পরিবেশবাদি হয়েছি। এখন ওটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

১৯৯৯-২০০১ সাল। তখন পরিবেশ রক্ষা বড় কোনও ইস্যু ছিল না বা খুব গুরুত্বপূর্ণও ছিল না। পরিবেশ আন্দোলনের বিষয়টা বাংলাদেশে নির্দেশনা আকারে আসেনি। আমি তখন প্রথম হাই স্ট্রিটে কাজ করি সেটা হলো এইচআরএমের। তখন এইচআরএম বাংলাদেশে আসেনি। এইচআরএমের আরেকটা ব্র্যান্ড মাত্র শুরু হয়েছে সেটা হচ্ছে মাইলকি। আমি ‘মাইলকি’তে যোগ দিই।’

‘অ্যা জার্নালিস্ট বি ক্যান ভেরি স্ট্রং’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এগুলোও ফ্যাশনের অন্য একটি দিক। সংবাদে আসে কারখানায় ওরা কীভাবে পণ্য তৈরি করে। সেগুলো কত সস্তা বা কত দামি হতে পারে। সেগুলোকে বিক্রি করা হচ্ছে কীভাবে। তখন আমি উপলব্ধি করি ফ্যাশনের আরও একটি সাইড আছে।’

খাদিজা বলেন, ‘একসময় আমার সন্তান হয়। আমার ছেলেটি অটিস্টিক। তখন অটিস্টিকের মানে কী আমরা নিজেরাই জানি না। সে সময় আমার মনে হয়েছিল বাচ্চাকে সময় দেওয়া উচিত। তারপর আমি একটা কলেজে লেকচারার হিসেবে জয়েন করি। কাজ করি তিন বছর পর্যন্ত। সেখান থেকে আমি ফ্যাশন হাউজ ‘জারা’তে জয়েন করি। জারা গ্রুপের বাৎসিকা নামে একটা ব্র্যান্ড আছে সেই ব্রান্ডেই আমি ডিজাইনার হিসেবে জয়েন করি। তারপর চলে যাই আরটিটিআর গ্রুপে। ওই গ্রুপে জয়েন করার পর ২০১৫ সালে আমার স্যার অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, কখনও কোন দেশপ্রেমিক মানুষ দেশ থেকে দূরে থাকতে পারে না। আমি ভালোবাসি যারে সে কী খুব আমাকে ভুলে থাকতে পারে।

তিনি বলেছিলেন সক্রেটিসকে যখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, কর্তৃপক্ষ তাকে দীপান্তরের অপশনও দিয়েছিল। তিনি চাইলে মৃত্যুর বদলে দীপান্তর হতে পারতেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডই নিয়েছিলেন। আসলে আমরা যারা বিদেশে থেকেছি আমরা আসলে দীপান্তর। সেটি আমাকে খুব ভাবিয়েছিল। একসময় দেশে ফেরার কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিলাম। পরিবার থেকে দূরে চলে আসার সিদ্ধান্তটা একজন নারীর জন্য বেশ কঠিন। -বলেন আড়ংয়ের তাগা ব্যান্ডের হেড খাদিজা রহমান।