শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

চট্টগ্রামে নেশার জগতে কাশির সিরাপের কদর!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪, ২০২১, ১:৫৮ অপরাহ্ণ


মোহাাম্মদ রফিক : মদ, ফেনসিডিল নিষিদ্ধ। তবে নেশা কি থেমে থাকবে? বিকল্প হিসেবে বাজারেই মিলছে বিভিন্ন কাশির সিরাপ। চাহিদাও বিপুল। চট্টগ্রামে পাইকারী ও খুচরা বাজারে ওষুধের খোলসে বিক্রি হচ্ছে এসব সিরাপ। বিভিন্ন বয়সী তরুণ-যুবকেরা সিরাপগুলো সেবন করছে নেশা হিসেবে।

সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তা বদরুন্নেছা জানান, বাংলাদেশে ফেনসিডিল ও স্কাফ নামে দুটি কাশির সিরাপ নিষিদ্ধ। কারণ এ দুটি সিরাপে আছে মাদকের ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। আর সেই উপাদানের নাম হলো-কোডিন ফসফেট। আর কোডিন ফসফেট হলো এমন একটা উপাদান যা শরীরে প্রবেশ করলে মানুষ কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যায়!

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, ওষুধের খোলসে এমন কিছু কাশির সিরাপ বাজারে বিক্রি হচ্ছে যেসবে ক্ষতিকর কোডিন ফসফেট ছাড়াও আছে গুয়াইফেনেসিন, লারাজিপাম, সিউডোএফেড্রিন, ডেক্সট্রর মিথোমরফনি, ট্রাই মিথোপ্রলিপ্রিন সিওডো এফিড্রিন, মিডাজুলাম, ডায়াজিপাম নামের নেশার উপাদান।

যেসব সিরাপে মাদকের বিষ আছে সেগুলো হলো- উইনসিডিল, ওরোকফ সিডি কিংবা ফেনিড্রিন। হাত বাড়ালেই এসব সিরাপ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে, সিরাপগুলো বিক্রি নিষিদ্ধ নয়। নেশার টানে অতিমাত্রায় ব্যবহার করছে বিপদগ্রস্ত তরুণ-যুবসমাজ। কফ সিরাপকে হাতিয়ার করে নেশা করার প্রবণতা বাড়ছে সব বয়সী মানুষের মধ্যে।

চট্টগ্রাম সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবের সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক বদরুন্নেছা তার কার্যালয়ে বসে একুশে পত্রিকাকে জানান, দেশে ফেনসিডিল ও স্কাফ নামে দুটি সিরাপ বিক্রি নিষিদ্ধ। এ দুটি সিরাপে কোডিন ফসফেট ও ক্লোরো ফেনিরামিন মেলিয়েট নামে মাদকের উপাদান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা মাদকদ্রব্যের ওই দুটি ছাড়া অন্য কোনও সিরাপ সিআইডির ল্যাবে আসে না।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সাবেক সহকারী পরিচালক হোসাইন মো. ইমরান জানান, মাদকের উপাদান আছে এমন কিছু কফ সিরাপ বাজারে আছে। যেগুলো ওভারডোজ হিসেবে সেবন করছে অনেকেই। মাদকের উপাদান থাকায় নিষিদ্ধ মাদক ফেনসিডিলের বিকল্প ভাবছে তারা। এগুলো নিয়ে স্টাডি চলছে। সরকার সুনির্দিষ্টভাবে যে কফ সিরাপ বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ করবে, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের।’

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, মাদকের উপাদান আছে এমন অনেক কফ সিরাপ চট্টগ্রামের ওষুধের পাইকারী ও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। র‌্যাব, পুলিশের অভিযানে অন্যসব মাদক জব্দ হলেও তাদের আটকের তালিকায় নেই কিছু কফ সিরাপ যেগুলোতে আছে মাদকের বিষাক্ত উপাদান। তবে বিক্রি নিষিদ্ধ না হওয়ায় সেগুলো জব্দও করা যাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা ফার্মেসির পাশাপাশি মাদকের উপাদান সমৃদ্ধ বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি করা কফ সিরাপ পাওয়া যাচ্ছে পাইকারি বাজার হাজারীলেনের দোকানেও।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ওভারডোজ গ্রহণ করলে শুধু কাশির সিরাপ নয়, যে কোনও ওষুধই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। নেশাজাতীয় কফ সিরাপ বিক্রি হচ্ছে কিনা দেখার দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসনের।’

সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে জানান, বাজারে এখন অনেক ধরনের কাশির সিরাপ পাওয়া যায়। এসব সিরাপে আছে এসিটাইল মেথাডল, ফেন্টানাইল, এসিটাইল-আলফা-মিথাইল ফেন্টানাইল, আলফা-মিথাইল ফেন্টানাইল, আলফেন্টানাইল, বেটা-হাইড্রোক্সি ফেন্টানাইল, বেটা-হাইড্রোক্সি, মিথাইল ফেন্টানাইল, লোফেন্টানাইল, মথাইল ফেন্টানাইল, সুফেন্টানল, আলফামিথাইল থায়োফেন্টানাইল, মিথাইল থায়োফেন্টানাইল, রেমিফেন্টানাইল, সুফেন্টানাইল, থায়োফেন্টানাইলসহ অন্তত দেড়শ প্রকার নেশার রাসায়নিক উপাদান। এসব দিয়ে বিভিন্ন প্রকার মাদক তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, ‘কাশির সিরাপে হাইড্রোকার্বন থাকে। মূলত বুকব্যথা ও কাশি দমনে এটা ব্যবহৃত হয়। হাইড্রোকার্বন এক ধরনের নারকোটিকস, যা ক্ষতিকর।’ তবে এক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন এ চিকিৎসক।

দোকানদারদেরও সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। একাধিক চিকিৎসক জানান, কোডিন ফসফেট বা অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান সমৃদ্ধ কফ সিরাপ অতিমাত্রায় সেবনের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, ঝিমুনি আসে, ঘুম ঘুম ভাব হয়। হাঁপানি, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, কাঁপুনি, খিচুনি, মাথা ধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, দেশে এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে। আর এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি ডি জেসিক ইনজেকশন), কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইনজেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেশা করা এক যুবক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইয়াবা ও মদ পানের খরচ বেশি। সেখানে অল্প দামে কফ সিরাপ কিনে কাজ সেরে ফেলা যায়। প্রকাশ্যে সিরাপ খেলেও সাধারণত কেউ সন্দেহ করেন না। সিরাপ শরীরে যাওয়ার পরে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। মনে হয় যেন একটা আলাদা জগতে চলে গিয়েছি। কেউ শুধু সিরাপ খেয়ে নেশা করে।’

জানা গেছে, শরীরে কাশির সিরাপের বিপজ্জনক প্রভাবের কথা জেনেও স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা এমন নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। ওষুধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারির অভাবেই কফ সিরাপ নেশার কাজে লাগানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাব ৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল আজ সোমবার সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদকের উপাদান সমৃদ্ধ যেসব কাশির সিরাপ বিক্রি নিষিদ্ধ নয়, সেগুলো আমরা জব্দ করতে পারি না। যে কোনও ওষুধই মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। ভেজাল, নিম্নমান ও আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। তাছাড়া কোনও দোকানদার প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

একাধিক মাদকসেবী একুশে পত্রিকাকে জানান, নিষিদ্ধ মাদক সেবনে পুলিশের হাতে আটক বা হাজতবাসের ঝুঁকি আছে। ফলে বিকল্প মাদকের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। একসময় একটি ইয়াবা ট্যাবলেট ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। এখন দাম ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। এক পুরিয়া গাঁজার দাম অভিযানের আগে ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।

ফেনসিডিল এক হাজার থেকে ১২’শ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের কারণে এসব মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় করতে নিরাপদ মনে করছে না মাদকসেবী ও বিক্রেতারা। তাই অধিকাংশ মাদকসেবী বিকল্প নেশার দিকে ঝুঁঁকছেন। এ সুযোগে এক শ্রেণীর ফার্মেসির মালিক মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কফ সিরাপ ছাড়াও বিভিন্ন ওষুধের দোকানে টাপেন্টা, পেন্টাডল, মাইলাম, লাইজন, সেডিল, এক্সিউনিল, ক্লোসান, মিলাম ও ডর্মিকামের মতো উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। অতি মুনাফার আশায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে।