শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮

চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি উধাও: যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে তদন্ত কমিটি

প্রকাশিতঃ রবিবার, মার্চ ৭, ২০২১, ৮:০৪ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বন্দি নিখোঁজের ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কারা অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন।

কারা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটিতে প্রধান করা হয়েছে খুলনা বিভাগীয় উপ-কারাপরিদর্শক ছগির মিয়াকে। একই কমিটিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার ইকবাল হোসেন এবং বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার ফোরকান ওয়াহিদকে সদস্য করা হয়েছে।

আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার (৮ মার্চ) থেকে কমিটি তদন্ত কাজ শুরু করবে। সোমবার বিকেলে তদন্ত কমিটির তিন সদস্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আসছেন।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন- সে সম্পর্কে একুশে পত্রিকাকে ধারণা দিয়েছেন কমিটির প্রধান ও খুলনা বিভাগীয় উপ-কারাপরিদর্শক ছগির মিয়া।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা প্রথমে দেখব- নিখোঁজ হওয়া বন্দির সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল। এর আগে কখন সে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছে। পালিয়ে গিয়ে থাকলে কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে সে কীভাবে, কার বা কাদের সহযোগিতায় পালাতে সক্ষম হয়েছে। দায়িত্ব পালনে মূলত কার গাফিলতি ছিল- এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি (প্রিজন) ছগির মিয়া বলেন, ‘ঘটনার পরপর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ উচিত ছিল, বন্দি নিখোঁজের ঘটনার বিষয়টি বিস্তারিত গণমাধ্যমকে জানানো।’

এদিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দায়িত্ব পালন করা সাবেক একজন ডেপুটি জেলার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুইদিন ধরে নিখোঁজ থাকা বন্দি রুবেল এর আগেও একবার কারাবন্দি ছিলেন। এসময় তিনি পাঁচতলা ভবনের ছাদে উঠে গিয়েছিলেন। রোলকল করার সময় তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ওই ভবনের ছাদে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।’

চট্টগ্রাম কারাগারের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কারাগার থেকে যদি রুবেল পালাতে সক্ষম হন, তাহলে তার একটি পথ হল কারাগারের মূল ফটক, অন্যটি ছাদ বেয়ে। আর যদি মূল ফটক দিয়ে পালায়, তাহলে কারাগারের অভ্যন্তরে দৈনন্দিন খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ, পণ্য বা মালামাল পরিবহনে নিয়জিত ছোট কোন যানবাহনের মাধ্যমে যে কোনো কৌশলে রুবেল পালিয়েছে। তা না হলে কারা অভ্যন্তরে তাকে হত্যা করে লাশ সেপটিক ট্যাংক বা অন্য কোথাও গুম করে ফেলেছে।’

এদিকে ঘটনাস্থল সরেজমিন দেখতে আজ রোববার বিকাল চারটার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. শহিদুজ্জামান। বিকাল তিনি কারাগারে এসে পৌঁছান।
এসময় তাকে অভ্যর্থনা জানান চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান। বন্দি নিখোঁজের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে জেলার ও একজন ডেপুটি জেলারকে প্রত্যাহার ও দুজন কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুমনি আক্তারকে আহ্বায়ক এবং এডিসি (ট্রাফিক-উত্তর) মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মো.মাজহারুল ইসলামকে সদস্য করা হয়।

এতো কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে বন্দী রুবেল কী পালিয়ে গেল, নাকি তাকে ঘিরে কারা অভ্যন্তরে অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেছে তা নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। অদ্ভুদ এ পরিস্থিতির মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

কারা সূত্র জানায়, নিখোঁজের দুইদিন আগে ৪ মার্চ অন্য বন্দির সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয় রুবেল। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে রুবেলকে শাস্তি হিসাবে কর্ণফুলী ভবনের ১৫ নম্বর ‘পানিশমেন্ট’ ওয়ার্ড’-এ ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছিল।

নিখোঁজ থাকা রুবেল গত ৯ ফেব্রুয়ারি একটি সদরঘাট থানার একটি হত্যা মামলায় কারাগারে যান।

এর আগে ২০১৮ সালে রুবেল কারাগারে গেলে সে সময় দুইবার কারাগারের ড্রেনে ও ছাদে আত্মগোপন করেন। সে সময় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করে তাকে উদ্ধার করেছিল কারা কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার রফিকুল ইসলাম কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। এর আগে একই ঘটনা নিয়ে একই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান।

এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘শনিবার (৬ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে তালামুক্ত করার পর ফরহাদ হোসেন ওরফে রুবেল নামে এক হাজতিকে পাওয়া যাচ্ছে না। যার হাজতি নম্বর ২৫৪৭/২১। তিনি গত ৯ ফেব্রুয়ারি সদরঘাট থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আসেন। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানায়।’

কারা সূত্র জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম কারাগারের ১৫ নম্বর কর্ণফুলী ভবনের ‘পানিশমেন্ট’ ওয়ার্ডে হত্যা মামলার আসামি ফরহাদ হোসেন রুবেলসহ অন্য আসামিদের রুমে তালাবদ্ধ করে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শনিবার ভোর ৬টায় যখন আবার কক্ষের তালা খোলা হয় তখন হাজতিদের রোলকল করা হয়। তখনই সন্ধান মিলছিল না রুবেল নামের ওই হাজতির।

কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যেও তালাবদ্ধ একটা ভবন থেকে একজন হাজতির হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে কারা অভ্যন্তরে। কারা অভ্যন্তরেই ওই হাজতি লুকিয়ে থাকতে পারে ধারণা করে সেখানে ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় অতিরিক্ত পুলিশও কারাগারে প্রবেশ করানো হয়েছে।

জানা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে সদরঘাট থানার এসআরবি রেল গেইট এলাকায় আবুল কালাম আবু নামে এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীকে বুকে ছুরিকাঘাত করেন রুবেল। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কালাম হাসপাতালে মারা যান। ৬ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে হত্যার অভিযোগে ডবলমুরিং থানার মিস্ত্রি পাড়া থেকে ফরহাদ হোসেন রুবেলকে গ্রেপ্তার করে সদরঘাট থানা পুলিশ। ওই মামলায় ৯ ফেব্রুয়ারি আদালতের মাধ্যমে কারাগারে যান রুবেল।