‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, চট্টগ্রামে স্কুল-বালিকার বিস্ময়কর নির্মাণ’

একুশে প্রতিবেদক : শাহদিল সুরাহা। মাত্র নবম শ্রেণীর ছাত্রী। পড়েন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ গার্লস স্কুলে। এই স্কুল-বালিকা সুরাহার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে তৈরি হয়েছে ‘একটি ভাষণ, একটি দেশের জন্ম’ শিরোনামে ভিডিওচিত্র। ২১ মিনিটের ভিডিওচিত্রে উঠে এসেছে পাকিস্তানি শাসকের বুলেটের তাড়া, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটির অডিও-ভিডিও রেকর্ড হয়েছিলে কীভাবে, কারা জীবনবাজি রেখে এই কাজটি সম্পন্ন করে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত বেতারে পরদিন ৮ মার্চ প্রচার করেছিলেন অথবা রাতের অন্ধকারে রেসকোর্স ময়দানে ৭০টি মাইক লাগিয়ে কলরেডি কর্তৃপক্ষ (মাইক সার্ভিস) তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত ১০ লক্ষ মানুষের মাঝে স্বাধীনতার জাগরণ-অনুরণন তৈরি করে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিল; সেসবের আদ্যোপান্ত।

একুশে পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের কনিষ্ঠতম নির্মাতা শাহদিল সুরাহার তাৎপর্যপূর্ণ ভিডিওচিত্রটি সাড়ম্বরে উন্মোচিত হলো সোমবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে। একই অনুষ্ঠানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট নিয়ে খ্যাতিমান নির্মাতা সেলিম নাশিন’র লেখা, সুর ও কণ্ঠে ৩ মিনিট ব্যাপ্তির ‘আমরা ক্ষমার যোগ্য না…’ শীর্ষক গানের উন্মোচনও করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সাবেক সিটি মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন দুটি ভিডিওচিত্রের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন, বিস্মিতও হন ক্ষুদে নির্মাতা সুরাহার বৃহৎ চিন্তার কর্মযজ্ঞে।

তিনি বলেন, নবম শ্রেণী পড়ুয়া ছোট মেয়েটি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে যে ভিডিওচিত্র নির্মাণ করেছে তা আমাকে অবাক করেছে। ‘একটি ভাষণ, একটি দেশের জন্ম’- তথ্যবহুল, ইতিহাস-আশ্রিত ভিডিওচিত্রটির যথার্থ নামকরণ। একইভাবে সেলিম নাশিনের গানটিও আমাকে নাড়া দিয়েছে, হৃদয়ে দাগ কেটেছে। এরকম সৃজনশীল কর্ম-প্রচেষ্টা বঙ্গবন্ধুর প্রতি, তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা বারে বারে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি এধরনের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।’ – বলেন আ জ ম নাছির উদ্দীন।

বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) নিতাই কুমার ভটাচার্য বলেন, দুটি তথ্যচিত্রে যে বিষয়গুলো আমি দেখেছি সেগুলোর সাথে আমার অনেক স্মৃতির মিল রয়েছে। যেমন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর আবুল খায়েরকে দেখানো হয়েছে, আমি তাকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছি। সেসময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ কিছু নতুন তথ্য আমি জানতে পেরেছি। তিনি যে কাজগুলো করে অমর হয়েছেন সেই কাজগুলো সম্পর্কে আমি সরাসরি আবুল খায়ের স্যারের কাছেই জানতে পেরেছি। কতটা আন্তরিকতা আর সৎসাহস থাকলে একজন ব্যক্তি দেশের কালবেলায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে এই নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের এই ভাষণ যে শুধু আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে তা নয়, বিশ্বের কাছে বাঙালিদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে বাঙালি চাইলে পারে না এমন কিছুই নেই। সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ও ভাষণ সংরক্ষণের আদ্যোপান্ত চমৎকারভাবে স্কুল-বালিকার অন্তরচক্ষু ভেদ করে উঠে এসেছে। এজন্য ক্ষুদে নির্মাতা শাহদিল সুরাহাকে আমি অভিনন্দন জানাই।

চট্টগ্রামের সজ্জন ব্যবসায়ী নেতা এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘সেলিম নাশিন তার গানে বার বার তুলে ধরেছেন ‘আমরা ক্ষমার যোগ্য না…’। কথাটির সাথে আমি একমত। কারণ, বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সাল থেকে জেলযাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেলে কাটিয়েছেন। দেশস্বাধীন করার পর তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র ১ হাজার ৩১৩ দিন। আমরা স্বাধীন দেশে তাঁকে বেশিদিন বাঁচতে দিইনি। তাকে সপরিবারে হত্যার মতো জঘন্যতম কাজ যখন আমরা করি, তখন আমরা আসলেই ক্ষমার যোগ্য নই।

তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধও নিচ্ছি। যেদিন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আকাশে উড়েছে, যেদিন নিজেদের টাকায় আমরা পদ্মাসেতুর কাজ শুরু করেছি, যেদিন থেকে আমরা বিশ্বদরবারে স্বীকৃতি পেয়েছি; সেদিন থেকেই আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছি। আমাদের এই প্রতিশোধের যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। একসময় দেশের অগ্রগতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের আমরা ধুলোয় মিশিয়ে দিবো।’

অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিকে সবসময় ‘না’ বলেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগেও এ কথা বলেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বলেছেন যে, দুর্নীতিটাকে আমাদের প্রথমে ধ্বংস করতে হবে। আমার এই দেশের মানুষকে আমি যদি কিছু দিতে চাই, তাহলে কিন্তু এক নাম্বারে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন অসাধারণ প্রদীপ। আমার মনে হয় ফিদেল ক্যাস্ত্রো, ন্যালসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে যারা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের কথা ভেবেছেন দেশে দেশে প্রত্যেকেই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নেতা মেনেছেন। বঙ্গবন্ধুর পথটাকে অনুসরণ করেছেন, নিজের দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করেছেন।

শাহদিল সুরাহা ও সেলিম নাশিনের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে রানু বলেন, আমরা সবাই যদি তাদের পাশে থাকি তারা কেবল চট্টগ্রাম নয়, পুরো বাংলাদেশকে দিতে পারবেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিকে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষণে ব্যাখ্যা করা যাবে না। একটি ভাষণের মাধ্যমেই একটি জাতির জন্ম হয়েছে। আর সেই জাতি হল বাঙালি জাতি। আর এই পরিচয় দিতে আমরা গর্ববোধ করি। তবে সত্যিকার অর্থেই যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করতে পারতাম তাহলে আমরা আসলেই সোনার বাংলা পেতাম। ক্ষুদে নির্মাতা সুরাহা এই প্রমাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে সোনার বাংলা নির্মাণে আমাদের কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।’

ভিডিওচিত্র উন্মোচনের স্বাগতপর্বে নির্মাতা সেলিম নাশিন ও শাহদিল সুরাহা ভিডিওচিত্র নির্মাণে সহযোগিতা এবং প্রচারে সাড়ম্বর অনুষ্ঠান আয়োজন করায় একুশে পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

একুশে পত্রিকার সম্পাদক আজাদ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক শিল্পী সুফিয়া বেগম,
আবৃত্তিশিল্পী অ্যাডভোকেট মিলি চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ, চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রেসিডেন্ট টিপু সুলতান সিকদার প্রমুখ।

অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন একুশে পত্রিকার সম্পাদকীয় পরামর্শক নজরুল কবির দীপু, তরুণ শিল্পোদ্যোক্তা, সৌখিন অ্যান্টিক সংগ্রাহক তারেকুল ইসলাম জুয়েল, কবি আবু মুসা চৌধুরী, জাতীয় বিতার্কিক ইশরাত জাহান ইমা, নাসরিন কিচেনস-এর কর্ণধার নাসরিন জাহান শিল্পী, চট্টগ্রাম আইটি ফেয়ারের কর্ণধার জাহাঙ্গীর আলম, একুশে পত্রিকার চিফ রিপোর্টার শরীফুল রুকন, সহ সম্পাদক সুমন চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার আবছার রাফি, জোবায়েদ ইবনে শাহাদত, রিপোর্টার জিন্নাত আইয়ুব, বিপণন নির্বাহী মোখতার হোসেন ও একুশে পত্রিকার অফিস সহকারী খুকী নাথ প্রমুখ।