গ্রুপিং অবসানে মিষ্টি বিতরণ, সেই গ্রুপিংয়েই বলি ইমন!


মোহাম্মদ রফিক : গ্রুপিংমুক্ত রাজনীতি চেয়েছিলেন ইমন রনি। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক পথে এগিয়ে যাওয়াটাও ছিল তার চাওয়া। এজন্য ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুকে নগরের আরেফিন নগরে গ্রুপিংমুক্ত রাজনীতির প্রত্যাশা জানিয়ে মিষ্টি বিতরণের ছবিসহ একটি পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে লিখেন – ‘আরেফিন নগর গ্রুপ ইন রাজনীতি বন্ধ। সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়াতে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন শফিকুল ইসলাম শফি ভাইয়ের আস্থাভাজন প্রাণপ্রিয় মাসুদ ভাই। আপনার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা রইল।’

বিধিবাম, ১১ দিন যেতে না যেতে সেই গ্রুপিংয়ের নির্মম বলি হলেন ছাত্রলীগ নেতা ইমন রনি! গত ৭ মার্চ রাতে দলীয় গ্রুপিং ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে খুন হন তিনি।

বায়েজিদ এলাকায় রাজনীতির উদগ্র গ্রুপিং আর রক্তের হোলিখেলা কিংবা কথায় কথায় লাশ ফেলে দেওয়া নতুন ঘটনা নয়। ক্রাইম জোনখ্যাত বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায় আধিপত্যের লড়াই থামছে না। বিবদমান গ্রুপ-উপগ্রুপ লিপ্ত হচ্ছে সংঘর্ষে। ঝরছে একের পর তাজা প্রাণ।

পরিসংখ্যান বলছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সরকার দলীয় ১০ জন কর্মী-সমর্থক ও নেতা খুন হয়েছেন।

বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি প্রিটন সরকার বলেন, ‘খুনোখুনির মূল কারণ চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুটব্যবসা, পাহাড়ের জমি দখল এবং সরকারি উন্নয়ন কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ।’

আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে সরকারি দলের যেসব গডফাদারের নাম পুলিশের খাতায় এখনো আছে তারা হলেন- শেরশাহ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল কুদ্দুস ওরফে কানা কুদ্দুস, শফিকুল ইসলাম ওরফে শফি, অক্সিজেন এলাকার বাস্তুহারা লীগ নেতা আবদুন নবী লেদু। পলিটেকনিক্যাল এলাকার আবু মো. মহিউদ্দিন ও দিদারুল আলম।

পুলিশ জানায়, কুদ্দুস এবং শফি যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান বাদল হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামী। মহিউদ্দিন ও দিদার আওয়ামী লীগ সমর্থক রিপন হত্যা মামলার আসামি। লেদুর বিরুদ্ধে আছে একাধিক চাঁদাবাজি, সরকারি খাস জমি দখলসহ নানা অভিযোগ।

জানা গেছে, একসময় এসব নেতা একাট্টা ছিলেন। এলাকায় খাস জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এরপর প্রত্যেকে নিজ এলাকায় গড়ে তুলেন আলাদা বাহিনী। তাদের সহযোগী হিসেবে পুলিশের খাতায় যাদের নাম আছে তারা হলেন-আব্দুল নবী লেদুর অনুসারী আনোয়ার, শফির অনুসারী শেরশাহ এলাকার পিস্তল সোহেল, পাগলা মাসুদ, আরেফিন নগর এলাকার রিপন, আলিফ, মামুন, ওয়াহাব।

জানা গেছে, আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও দিদারুল আলম দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নেই। তারা আছেন বিদেশে। শফিও প্রায়সময় থাকেন বিদেশে। কুদ্দুস ও শফির সাথে লেদুর একসময় সাপ-নেউলে সম্পর্ক ছিল।

সম্প্রতি তারা বিরোধ মিটিয়ে মিষ্টি বিতরণ করেন। কিন্তু গ্রুপিং অবসানে মিষ্টি বিতরণের কিছুদিন না যেতেই না যেতেই গত ৭ মার্চ আরেফিন নগরে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী ইমন!

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি প্রিন্টন সরকার বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইমন খুন হয়। সে ছিলো পিস্তল সোহেলের অনুসারী। এ খুনের ঘটনায় আরেফিন নগর এলাকার আলিফ, মামুন, রিপন, ওয়াহাবের সংশ্লিষ্টতা আছে। তাদের গ্রেফতার অভিযান চলছে। আলিফ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, মারামারি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ১১টি, ওয়াহাবের বিরুদ্ধে ৭টি, রিপনের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা আছে। এছাড়া পিস্তল সোহেলের বিরুদ্ধে আছে ৫টি মামলা।’
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে ওসি প্রিটন একুশে পত্রিকাকে নাসিরাবাদ, আরেফিন নগর, শেরশাহ, বাংলাবাজার, চন্দ্রনগর তথা বায়েজিদ এলাকার ৯৯ ভাগ মানুষ ভালো। একভাগ সন্ত্রাসীর কারণে পুরো এলাকা কিছুদিন পরপর অশান্ত হয়ে ওঠে। তবে অপরাধী সে যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বায়েজিদ থানা এলাকায় এ যাবত ছাত্রলীগকর্মী ইমনসহ খুন হয়েছেন ১০ জন। সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীদের কয়েকটি গ্রুপ বায়েজিদের প্রায় পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।

স্থানীয়দের মতে, চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হল বায়েজিদ ও শেরশাহ এলাকা। এ থানার অধীনে পলিটেকনিক্যাল, জালালাবাদ, চন্দ্রনগর, আরেফিন নগর এলাকায় আছে সবচেয়ে বেশি সরকারি খাসজমি ও পাহাড়। এসব এলাকায় জমি দখল-বেদখল নিয়ে চলে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য।

জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বায়েজিদ এলাকা ছিল তিনটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নামধারী শফিকুল ইসলাম ওরফে শফি ও আবদুল কুদ্দুস ওরফে কানা কুদ্দুস।
আরেক গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাতে খুন হওয়া যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান বাদল এবং তৃতীয় গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন আবু মহিউদ্দিন ও দিদারুল আলম।

আধিপত্যের লড়াইয়ে মেহেদী হাসানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে মেহেদীর গ্রুপ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন শফি ও কুদ্দুস। মেহেদী খুনে গ্রেফতারের পর জামিনে বের হন তারা। গতবছর হকার্সলীগ নেতা রিপন হত্যার পর প্রকাশ্যে আসেন শফি ও কুদ্দুস। বিদেশে চলে যান মহিউদ্দিন ও দিদার। এ সুযোগে পুরো শক্তি নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠে অক্সিজেন এলাকার বাস্তুহারা লীগ নেতা আব্দুল নবী লেদু এবং তার অনুসারী সোর্স আনোয়ার।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রলীগকর্মী ইমন হত্যা মামলার আসামী রিপন ও মামুন বাংলা মদ বেচাকেনা করে। ১১ মামলার আসামী আলিফ এবং ৭ মামলার আসামী ওয়াহাব ইয়াবা ব্যবসায়ী। ইতিপূর্বে এই চারজন বিভিন্ন মামলায় একাধিক বার জেল খেটেছেন। একসময় তারা শফির অনুসারী ছিল। এখন তাদের ‘গডফাদার’ বাস্তুহারা নেতা আব্দুল নবী লেদু ও সোর্স আনোয়ার।
ইমন খুনের নেপথ্য কারণ জানিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি সোর্স আনোয়ার এক ধর্ষণ মামলায় কারাগারে গেলে আরেফিন নগর এলাকা নিয়ন্ত্রণ নেন শফির অনুসারী পিস্তল সোহেল। এ গ্রুপে আছে পাগলা মাসুদ, ইমরান ও তানভীর।

সূত্রটি জানায়, গত ২ মার্চ জেল থেকে বের হয়ে পুনরায় আরেফিন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন সোর্স আনোয়ার। পাগলা মাসুদ-রিপন গ্রুপের সাথে গত ৪ মার্চ সংঘর্ষ হয় সোর্স আনোয়ার গ্রুপের সাথে। এসময় এক যুবকের কব্জি কেটে দেয় আনোয়ার। এরই জের ধরে গত ৭ মার্চ লেদুর অনুসারী সোর্স আনোয়ার গ্রুপ ও শফির অনুসারী পিস্তল সোহেলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে ইমন নিহত হন।