
শরীফুল রুকন : থানায় দায়ের করা প্রতিটি মামলা তদন্তের জন্য বর্তমানে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ‘তদন্ত খরচ’ পাচ্ছেন দেড় হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা। মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলা তদন্ত করতে দেয়া হয় দেড় হাজার টাকা। বিধি অনুযায়ী এ টাকা দিয়েই সারতে হবে আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো, পরিবহন খরচ, সোর্সের খরচ মেটানোসহ মামলা সংক্রান্ত নানান কাজ। মামলার তদন্ত কাজে সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া এ অর্থ সহায়তা দিয়ে আদৌ তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
অভিযোগ আছে, মামলার তদন্ত খরচ সামলাতে অনেক সময় বাদী-বিবাদী দুই পক্ষের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এর ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলার চার্জশিটে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসে না। যিনি বেশি টাকা দিচ্ছেন তার অনুকূলেই বেশিরভাগ সময় চার্জশিট দেয়া হচ্ছে! একই কারণে আদালতে দাখিলকৃত চার্জশিটের মধ্যে অনেকগুলোতে ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে ন্যায়বিচার কার্যক্রম।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সাল থেকে থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কার্যক্রমে টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা চালু করা হয়। ডাকাতি ও খুনের মামলা তদন্তে তিন হাজার টাকা, অপহরণ মামলায় দুই হাজার ৫০০ টাকা, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর মামলায় দুই হাজার টাকা, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়ের করা মামলায় এক হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হতো। এরপর ২০১৭ সালের মে মাস থেকে ডাকাতি ও খুনের মামলার তদন্তের জন্য ৬ হাজার টাকা, অপহরণ মামলার জন্য ৫ হাজার টাকা, দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলা তদন্তের জন্য ৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা, এসিড নিক্ষেপ সংক্রান্ত মামলা ও দ্রুত বিচার আইনের মামলা তদন্তের জন্য দেয়া হয় ২ হাজার টাকা করে। মাদক মামলাসহ অন্যান্য মামলা তদন্তের জন্য দেড় হাজার টাকা পান তদন্তকারী কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদন্ত ব্যয় হিসেবে কম টাকা বরাদ্দের জন্য কর্মকর্তারা অনেক সময় মামলার গভীরে গিয়ে তদন্ত করেন না। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের মামলার ক্ষেত্রে উৎসের সন্ধান করা হয় না। মামলার এজাহারে যা লেখা আছে, সেটা তুলে ধরার পর ‘তদন্তে অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ উল্লেখ করে দায়সারা গোছের চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে অনেক সময়।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তদন্তের জন্য বরাদ্দকৃত এসব টাকা তারা নিয়মিত সংগ্রহ করেন না। কাজের চাপের কারণে এ টাকার জন্য বিল দাখিল করার সময়ও হয়ে উঠে না অনেকের। আর একটি মামলার ক্ষেত্রে যা খরচ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা তারা শুধু ‘রাইটারকে’ দিয়ে থাকেন। ‘রাইটার’রা হলেন এমন কিছু ব্যক্তি; যারা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের পক্ষে মামলার নথিপত্র লিখে থাকেন। যদিও তারা সরকারি কর্মচারী নন। কাগজে-কলমে থানায় তাদের প্রবেশ অনেক আগে থেকে নিষিদ্ধ আছে। তবুও থানায় রাইটারদের প্রবেশ থেমে নেই, যা সরেজমিন নগরের একাধিক থানায় রাতে অবস্থান করে দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অপরাধের ধরণ পাল্টেছে, কৌশল বদলেছেন অপরাধীরাও। সবকিছুর দামও বেড়ে গেছে। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে অপ্রতুল সরকারি বরাদ্দ দিয়ে ভিন্ন জেলায় গিয়ে আসামি গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা একেবারেই অসম্ভব পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য। বেশিরভাগ মামলা তদন্তের কাজে যুক্ত থাকেন উপ-পরিদর্শক পদবীর কর্মকর্তারা; তবে এসব বিষয়ে পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে তারা রাজী নন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের একটি থানার একজন উপ-পরিদর্শক বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার ভিকটিমকে উদ্ধারের জন্য চার সহকর্মীকে নিয়ে আমি কিছুদিন আগে পাবনা গিয়েছিলাম। ভিকটিম উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তার করে আনতে ২০ হাজার টাকার বেশী খরচ হয়েছিল।’ উপ-পরিদর্শক পদবীর আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ছিনতাইয়ের টাকা উদ্ধারের একটি মামলায় কাজ করতে গিয়ে আমার পকেট থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। মামলা তদন্ত কাজ ভালোভাবে করতে মামলা তদন্ত ব্যয় পুনরায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। নয়তো তদন্ত কাজে ধীরগতি, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ কোনদিনই সম্ভব নয়।’
নগরের চকবাজার এলাকার একজন ব্যবসায়ী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চেক প্রতারণার একটি মামলার আসামি গ্রেপ্তারের জন্য গড়িমসি করছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অথচ একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার রেফারেন্স নিয়ে গিয়েছিলাম আমি। পরে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, খরচের জন্য এই টাকাটা রাখুন। কেউ কিছু জানবে না। দুইদিন পর আসামি গ্রেপ্তার হয়ে গেল।’
এদিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আসামি গ্রেপ্তারে সোর্স নিয়োগ, যানবাহন ভাড়া, আলামত জব্দ ও ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে লাশ পাঠানো থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানোসহ প্রতিটি ধাপেই তদন্ত কর্মকর্তাকে বিভিন্নভাবে টাকা খরচ করতে হয়। কোতোয়ালী থানায় কর্মরত এসআই পদবীর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘চমেক হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য একজন কনস্টেবলকে পাঠালে গাড়ি ভাড়া দিতে হয় দুইশ টাকা। এমনকি হাসপাতালের কর্মচারীদেরকে পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৫০-১০০ টাকা দিতে হয়। তারা আবদার করে চায়, না দিয়েও পারি না।’
মামলা তদন্তে সরকারের বরাদ্দ পর্যাপ্ত কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (সদর) আমীর জাফর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এক সময় এই টাকাগুলোও বরাদ্দ ছিল না। একটি হত্যা মামলা হলে পুলিশ নিজ দায়িত্বে বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিয়ে খরচগুলো মেটাতো। পরবর্তীতে এই খরচটি দেয়া হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো বরাদ্দটি ঠিক আছে, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা অপ্রতুল।’
তিনি বলেন, ‘মামলা তদন্তের কাজে বরাদ্দ আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো। যেসব মামলায় দৌড়ঝাপের বিষয় থাকে, তখন এই বরাদ্দ নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিতে সমস্যা হয়। তারপরও কিছু তো দেয়া হচ্ছে, এর ফলে কিছুটা স্বস্তি আসছে। তবে এটা আরেকটু বাড়লে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাজ করতে সহজ হবে।’
তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরোপুরি আর্থিক সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই বলছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এখন তদন্ত পর্যায়েই মামলাগুলো মারা যাচ্ছে। ন্যায়বিচার না পেলে ভুক্তভোগীরা জজ সাহেব, আইনজীবি-পিপিকে দোষ দেন। কিন্তু যথাযথ বিচারের জন্য সবকিছু তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থাপন না করলে ন্যায়বিচার তো পাওয়া যাবে না। তদন্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা নেই। শতকরা ৯৯ ভাগ আসামি খালাস পাচ্ছে এমন মামলা অহরহ আছে। ভূয়া চার্জশিট দিলেও তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তদন্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা থাকলে, তদন্তে যা খরচ হয় তাই দেওয়া উচিত।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলা তদন্ত করার জন্য সরকার যা খরচ দেয়, তা পর্যাপ্ত নয়। এত কম টাকা দেয়া মানে ঘুষ খেতে বাধ্য করার মতো। তবে পুলিশে আমূল পরিবর্তন না হলে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে মামলার তদন্ত খরচ বাড়িয়ে লাভ হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি, ঘুষ না খাওয়ার অযুহাতে বেতন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ঘুষ খাওয়া তো কমেনি। প্রতিটি থানায় গাড়ির জন্য যে জ্বালানি তেল দেয় সরকার, সেটাও আশ্চর্য হওয়ার মতো। পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে প্রশিক্ষণের সময় বলে দেয়া হয়, এসব খরচ কীভাবে ম্যানেজ করতে হবে। এভাবে চলা উচিত নয়।’
মামলা তদন্তের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি, মামলা তদন্তের ব্যয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য পুলিশ সদরপ্তর একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। আশা করছি, এটি অনুমোদিত হবে।’
পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এবং সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অর্থ বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত পুলিশ সদরদপ্তর নেয় না। এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়। বরাদ্দ বাড়াতে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে কিনা বা এ বিষয়ে আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।’
