বিয়ে আর বিসিএস, একসঙ্গে দুই পরীক্ষা!

চট্টগ্রাম : শুক্রবার (১৯ মার্চ) রাতে পূর্ব নির্ধারিত বিয়ে হালিশহর জি ব্লকের বাসিন্দা মুজিবুর রহমানের ছেলে হাসিব আল সায়েমের। ভেন্যু নগরের জিইসি মোড়ের জিইসি কনভেনশন সেন্টার। সে লক্ষ্যে চলছিল বিয়ের আয়োজন, প্রস্তুতি।

অন্যদিকে, উচ্চআদালত পর্যন্ত গড়ানোর পরও তিনদিন আগে সিদ্ধান্ত এলো ১৯ মার্চ সকাল ১০ টায় ৪১তম বিসিএস’র প্রিলিমিনারি পরীক্ষা।

পরিবারকে তো জানানইনি; ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু জানার পর বললেন, তোর কি মাথা খারাপ, দুদুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা একইদিন কীভাবে দিবি? বিসিএসটা বাদ দিয়ে বিয়ের পরীক্ষাটাই ঠিকমতো দেয়। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নন মেধাবি হাসিব। বরং চ্যালেঞ্জটা সানন্দে নিতে চান তিনি। রাতভর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মেহেদি লাগালেন হাতে, সবাই মিলে নাচলেন-গাইলেন। এরপর সকালে ঘুমাতে যাওয়ার ভান করে সেখান থেকে সোজা কলেজিয়েট স্কুল সংলগ্ন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিসিএস পরীক্ষা হলে।

এদিকে, দিনের ১২টায়ও হাসিবের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারে সদস্যরা নিদ্রাকক্ষে গিয়ে দেখেন হাসিব নেই। পুরো বাড়ির কোথাও দেখা নেই তার। সেলফোনটিও বন্ধ। রূদ্ধশ্বাস অবস্থা পরিবারের সদস্যদের। চিন্তায় দিশেহারা বাবা-মা। বিয়ের আগ মুহূর্তে বর নিখোঁজ! নানা দুশ্চিন্তা আর রহস্যের ঘেরাটোপে সময়টা যখন ভারি হয়ে ওঠল, তখনই একগাল হাসি দিয়ে টুক করে ঘরে ঢোকেন হাসিব।

কোথায় গেলি বাপ? একযোগে সবার বিলিয়ন প্রশ্নে হাসিবের জবাব-বিসিএস পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। আশ্চর্য এক ছেলে তো! বিয়ের দিনে বিসিএস পরীক্ষাটা তোর জন্যে বড় হয়ে গেল?

হ্যাঁ, মেধাবি, প্রত্যয়ী হাসিব ছোটবেলা থেকে এমনই। সময়গুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন সবসময়। চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা বাবার। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। লেখাপড়া শিখে নিজ চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পণ-প্রত্যয় তার। কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন প্রতিটি পরীক্ষায়। পড়েছেন নামকরা বিদ্যাপীঠে। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং নটরডেম কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন। এরপর আহসান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেন কৃতিত্বের সাথে।

শুক্রবার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে জিইসি কনভেনশন সেন্টারে কথা হচ্ছিল বর হাসিব আল সায়েমের সাথে। বিয়ের দিন কেন বিসিএস পরীক্ষার ধকল-চ্যালেঞ্জটা নিলেন? – স্মিত হেসে হাসিব বললেন, ‘চ্যালেঞ্জ নিতে আমার ভালোই লাগে। বিয়ে আর বিসিএস- দুটোই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষা। যখন দুটো পরীক্ষা একই দিনে, অনেকটা একই সময়ে তখন চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি। কারো কথা না শোনে চ্যালেঞ্জটা নিয়েই নিলাম। চেয়েছি বিয়ে নামক পরীক্ষার সাথে বিএসএস পরীক্ষা যুক্ত করে দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে।’ বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা খুব ভালো না হলেও খারাপ হয়নি বলে জানান হাসিব।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স অধ্যয়নরত কনে মুনতাহা আলম তাহিও বিস্মিত বরের এমন কা-ে! হাসিবকে পাশে রেখে বললেন- একদিনে এত প্রেসার কীভাবে সে নিল সেটাই রীতিমতো আশ্চর্যের বিষয়। অবশ্য দৃঢ়প্রত্যয়ী, সাহসী, মেধাবিরাই পারে এমন করে। এরপর মিষ্টি হেসে চোখের টিপ্পনি কাটেন বরের দিকে তাকিয়ে।

প্রসঙ্গত, হাসিব আল সায়েম চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি আজিম আলী-হাকিম আলী ভ্রাতাদ্বয়ের ভাগনে। তার মা হালিমা বেগম। বাবা গোপালগঞ্জের সন্তান মুজিবুর রহমান প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে গণিতে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের পর চট্টগ্রামেই প্রতিষ্ঠিত হন, স্থায়ীভাবে এখানেই বসবাস শুরু করেন।