কাউন্টারে টিকিট নেই, ট্রেনে যাত্রী নেই!


মোহাম্মদ রফিক : ২৩ মার্চ, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা। চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে টিকিটের জন্য ৫ নম্বর কাউন্টারে লাইনে দাঁড়ান মনিরুল ইসলাম। ওইদিন বিকাল সোয়া ৫টার মেঘনা এক্সপ্রেসে লাকসাম যাবেন তিনি। কিন্তু কাউন্টার থেকে তাকে বলা হয়, লাকসামের টিকিট নেই। শেষতক হাজিগঞ্জের টিকিট কিনতে বাধ্য হন মনিরুল।

‘অনলাইনে ঢুকে পেলাম না টিকিট। কাউন্টারে এসে দেখি টিকিট নেই। কী করব? বাড়ি তো যেতে হবে। বাধ্য হয়ে লাকসাম থেকে ১০ কিলোমিটার আগের গন্তব্য হাজিগঞ্জের টিকিট কিনলাম।’- প্রতিবেদককে এমন করুণ সুরেই জানান মনিরুল।

একইদিন বিকাল তিনটায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়বে আন্তঃনগর ট্রেন ‘মহানগর গোধূলী’। এ ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে কাউন্টারে আসেন মাকসুদ আলম- পেশায় তিনি ব্যাংকার। কাউন্টারে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে চেয়েও ঢাকা যাবার টিকিট পেলেন না তিনি। অবশেষে এক কালোবাজারির কাছ থেকে ২৫০ টাকার টিকিট কিনলেন ৩০০ টাকায়। ‘কাউন্টারে টিকিট নেই। আছে কালোবাজারে। বড় আজব দেশ।’ – বলেন মাকসুদ।

আমিনুর রহমান। চট্টগ্রামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। অফিস থেকে তিনি ছুটি পেয়েছেন সাত দিনের। তার পরিকল্পনা, ২৫ মার্চ রাত ১১টায় ‘তূর্ণা এক্সপ্রেসে’ ঢাকা যাবেন। তাই অগ্রিম টিকিট কাটতে গত ২৩ মার্চ মঙ্গলবার দুপুরে হাজির হন চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে। কাউন্টারে গিয়ে শোনেন, ২৫ তারিখের টিকিট নেই! অগত্যা ২৬ তারিখ রাতের টিকিট কাটেন তিনি।

চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে টিকিট নিয়ে যাত্রীদের এমন দুর্দশার চিত্র প্রতিদিনের। কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে দুর্ভোগের কথা জানালেন ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দা তাহের খান।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সময়মতো কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরিতে সমস্যায় পড়ব। এখন যে করেই হোক বেশি টাকা দিয়ে হলেও ঢাকায় পৌঁছতে হবে। তাই ৪০০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছি।’ শুধু তাহের খান নন, গত ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে আসা প্রায়সব যাত্রীরই একই অভিযোগÑ কাউন্টারে টিকিট নেই। টিকিট পাওয়া যাচ্ছে কালোবাজারিতে। তাও আবার বেশি দামে।

লাকসাম উপজেলার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘বাসে যাতায়াতের ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য রেলস্টেশনে এসেছি। এখানে এসে দেখি আরেক ঝামেলা। টিকিট নেই। বাধ্য হয়ে বাসের টিকেট কাটতে হবে।’

গত ২৩ মার্চ দুপুর ১২ টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত রেলস্টেশনে অবস্থান করে টিকিট নিয়ে মানুষের হাহাকারের এ দৃশ্য চোখে পড়ে একুশে পত্রিকার। যাত্রীরা কাউন্টারে টিকিট না পেলেও কালোবাজারির হাতে হাতে ছিল টিকিট। অভিযোগ আছে, কালোবাজারির সাথে রেলস্টেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আরএনবি’র (রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী) সদস্যরাও জড়িত।

সাদা পোশাক পরা আরএনবি’র এক সদস্যেকে দেখা গেছে, আনুমানিক ২৫-২৬ বছর বয়সী ওই যুবক রেলস্টেশনে আসা যাত্রীদের জিজ্ঞেস করছেন ‘কোথায় যাবেন? টিকিট লাগবে? বেশি দাম নেব না।’ বেলা ২টার দিকে এক যাত্রীকে ৩০০ টাকায় ‘মহানগর গোধূলীর’ টিকিট হাতে ধরিয়ে দেন আরএনবি’র ওই সদস্য। ৫০ টাকা বেশি হওয়ায় ওই যাত্রী টিকিটটি যুবকের কাছে ফেরত দিয়ে দেন। যাত্রী সেজে ঢাকা যাওয়ার ৫টি টিকিট চাইলে ওই যুবক প্রতিবেদককে বলেন, ‘দেওয়া যাবে। দাম ৩০০ টাকা।’

যাত্রীভেবে এ প্রতিবেদককে টিকিট লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করেন স্টেশন মাস্টার অফিসে কর্মরত পিয়ন আব্দুল মজিদ। তাকে সেদিনের ট্রেনে (২৩ মার্চ) ঢাকা যাওয়ার টিকিট লাগবে বলে জানালে আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আজ রাত ১১টার ‘তূর্ণা এক্সপ্রেসের’ টিকিট আছে। একটি টিকিটের দাম ৫০০ টাকা। ১ টাকাও কম হবে না।’

চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের মাস্টার জাফর আলম জানান, অধেক টিকিট বিক্রি হয় অনলাইনে। আমরা পাই ৫০ শতাংশ। প্রতিদিন শত শত যাত্রী কাউন্টারে টিকিট কিনতে আসেন। অধিকাংশ যাত্রীকে টিকিট দেওয়া সম্ভব হয় না। টিকিট কালোবাজারির সাথে রেলস্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানায় একাধিক মামলা আছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি নেজাম উদ্দিন।

এদিকে টিকিট ছাড়াও ট্রেনের এটেন্ডেন্টকে টাকা দিলে ঢাকা যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানা গেল। ২৩ মার্চ, বিকাল ৩ টা। পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে ভিড়েছে ‘মহানগর গোধূলী’। ৩টা ১৫ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ট্রেনটি ছাড়ার মুহূর্তে একুশে পত্রিকার দুই প্রতিবেদক দাঁড়ান ১৪১১ নম্বর কোচের দরজায়। ‘আমাদের কাছে টিকিট নেই। ঢাকা যাওয়া যাবে কিনা?’- এমন জিজ্ঞাসায় ওই কোচের দায়িত্বরত এটেন্ডেন্ট আমজাদ বলেন, ‘একজন ৪০০ টাকা করে লাগবে।’

এরপর ওই এটেন্ডেন্ট কোচে ঢোকার মুখে একটি টুলবক্স দেখিয়ে বলেন, এই সিটেই আপনারা ঢাকা যাবেন।’ টিকিট ছাড়া গেলে কোনও ঝুঁকি নেই তো? প্রশ্ন করলে আমজাদ বলেন, ‘তিন বার টিকিট চেক করবেন টিটি। আমি তাদের ম্যানেজ করব।’

কাউন্টারে টিকিট মিলে না, টিকিট পাওয়া যায় কালোবাজারে, এ চক্রে রেলের লোকজন জড়িত থাকার অভিযোগ আছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জাহাঙ্গীর হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ অভিযোগটি কিছুটা সত্য। এ চক্রের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান পরিস্কার। তাদের ধরে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আপনারা (গণমাধ্যম) লিখুন।’