সীতাকুণ্ডের সমুদ্র-উপকূল গিলে খাচ্ছে ‘ক্যাপিটাল’!

এম কে মনির, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি : সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের সমুদ্র-উপকূল গিলে খাচ্ছে ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম লিমিটেড নামের একটি এলপি গ্যাস প্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে কয়েক হেক্টর বনাঞ্চল কেটে সাবাড় করেছে তারা। খনন করছে উপকূলীয় ভূমি বালু। মাটি উত্তোলন করে গভীর খাদের সৃষ্টি করছে সমুদ্র তীরে। দিনরাত সীতাকুণ্ড উপজেলার উপকূল ধ্বংসের এতসব আগ্রাসী আচরণের পরও নিরব সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন।

সরেজমিন, প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির আগ্রাসী ভূমিকার শুরু সেই প্রায় ৩ বছর আগে। যখন প্রতিষ্ঠানটি সবেমাত্র জমি কিনে সীমানা নির্ধারণ করছিল, তখন থেকেই রাতারাতি উপকূলীয় বনাঞ্চল, খাল, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা একের পর এক দখল করতে থাকে এলপি গ্যাসের নামে প্রতিষ্ঠান গড়তে আসা “ক্যাপিটাল”।

এখানেই শেষ নয়, তাদের আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি সীতাকুণ্ড উপকূলের পরিবেশবান্ধব কেওড়া বনও। এখানকার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে কেওড়া বনাঞ্চলটি ধীরে ধীরে কেটে সাবাড় করেছে তারা। এরপর বেড়িবাঁধের পশ্চিমে স্বল্পমূল্যে কেনা ও দখলকৃত তাদের এই নিম্ন উপকূলীয় জায়গাটি ব্যবসায়িক রূপ দিতে আরও ভয়াবহ আগ্রাসী ভূমিকার আশ্রয় নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

তাদের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অবৈধ পন্থায় সমূদ্র উপকূলে একাধিক ড্রেজার লাগিয়ে বালু উত্তোলন করতে থাকে। অথচ ২০১০ সালের বালুমহাল আইনে সমুদ্র উপকূলের তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ হলেও কোনও কিছুই তোয়াক্কা করছে না প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে বছরের পর বছর ক্যাপিটাল-এর এমনসব আগ্রাসী ঘটনায় সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকায় বিস্মিত সীতাকুণ্ডবাসী।

এসব বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের জন্য উপজেলা প্রশাসন কাউকে অনুমোদন দেয়নি। সরকারি জায়গা দখল করা হলে বিষয়টি আমরা দেখব।’

সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে তার দপ্তরে বলেন, বালু উত্তোলনের কোনও অনুমোদন ক্যাপিটালকে দেওয়া হয়নি।

বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী একুশে পত্রিকাকে জানান, একটু আগে বিষয়টি ইউএনও মহোদয় আমাকে জানিয়েছেন। আমি তাৎক্ষণিক সেখানে গ্রাম পুলিশ পাঠিয়েছি। এছাড়া জায়গাটি বেড়িবাঁধের বাইরে হওয়ায় সেদিকে তার যাতায়াত কম বলেও জানান তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সীতাকুণ্ড উপজেলার এআরও আলমগীর হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ক্যাপিটাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করেছে কিনা এটা জানতে হলে আমাকে নথিপত্র দেখতে হবে।

বনবিভাগের উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন বলেন, আমার দেখা মতে বনাঞ্চল ধ্বংস ও দখলের এমন কোনও ঘটনা ঘটে নাই।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ব্যবস্থাপক ফারুক তাচ্ছিল্যের সুরে প্রতিবেদককে বলেন, বালু কি শুধু আমরাই তুলছি? অন্যেরাও বালু তুলছে। তবে সরকারি জায়গা দখল ও বনাঞ্চল ধ্বংসের বিষয়ে কোনও সদুত্তর না দিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

ফারুকের কথার সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাসিক মাহমুদের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নানান বাহানায় প্রতিবেদকের প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি সীতাকুণ্ড উপজেলায় এলপি গ্যাসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা সম্মিলন ঘটান স্থানীয় চেয়ারম্যান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তাদের কাজে বাধা হতে পারেন এমন লোকজনদের। ওইদিন আয়োজন করা হয় বিশাল মেজবানের। বৃহত্তর চট্টগ্রামের শিপিং ইয়ার্ড এবং নৌপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সম্ভাবনাময় সামুদ্রিক রুটের বিশাল এলাকাজুড়ে এলপি গ্যাস ইন্ডাস্ট্রির আরো একটি যুগোপযোগী টার্মিনাল হতে যাচ্ছে বাঁশবাড়িয়া এবং নড়ালিয়া মৌজার অন্তর্গত এই লোকেশনে- এমন ঘোষণা  দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই উপজেলার লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন বলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে টোপ দেন ক্যাপিটাল এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাসিক মাহমুদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন টোপ ও প্রণোদনা আশ্বাসের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে বিভিন্ন উপায়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলায় পরিবেশবিধ্বংসী ভয়াবহ খেলায় মেতে ওঠলেও ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলছেন না। সবাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন।