ছাত্রলীগে এত হেফাজত-ভক্ত?

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : নারায়ণগঞ্জের রিসোর্ট থেকে কথিত স্ত্রীসহ মামুনুল বেরিয়ে আসার পাশাপাশি ছাত্রলীগের বিভিন্ন কমিটি থেকেও বের হতে থাকে হেফাজত ভক্তের নাম! হেফাজত-কর্মীদের পাশাপাশি মামুনুলের পক্ষ নিয়ে ভার্চুয়াল সাফাই গাইতে দেখা যায় ছাত্রলীগের কিছু নেতাকে।

এসব নেতার কর্মকাণ্ড হেফাজত নেতাকর্মীদের ‘উৎসাহ জোগানোর পাশাপাশি বিব্রত করছে ছাত্রলীগকেও। দেরিতে হলেও ধীরে ধীরে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এসব নেতাদের বিরুদ্ধে। তবে কীভাবে এত হেফাজত-ভক্ত ছাত্রলীগের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ পেল এটা নিয়ে বিস্ময় খোদ সরকারদলেই।

কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী ও হেফাজতভক্তের সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতারা। তাই মামুনুল ইস্যুর পর কেন্দ্র থেকে দেওয়া হয়েছে কঠোর সতর্কবার্তা। বলা চলে, জাতীয় ইস্যুতে ঘরের শত্রু বিভীষণদের ছাঁটাই করার পাশাপাশি, সংগঠনের ইমেজ রক্ষা করাও এখন চ্যালেঞ্জ ছাত্রলীগের জন্য।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) সরকার ও দেশবিরোধী এবং হেফাজত ও মামুনুলের পক্ষে স্ট্যাটাস দেওয়ায় রাঙামাটি পৌর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবীর হাসানকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর রাঙামাটি পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম আলাউদ্দিন স্থানীয় রিজার্ভ বাজার এলাকার বড় ভাইদের অনুরোধে আবীরের দলে অন্তর্ভুক্তির গোমর ফাঁস করেন।

এর একদিন আগে গত ৭ এপ্রিল কাপ্তাই উপজেলার কাপ্তাই ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ওমর ফারুক হেফাজত নেতা মামুনুল হকের পক্ষ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদির বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে বহিষ্কার হন।

একইভাবে গত ৬ এপ্রিল মামুনুল হককে আটক করায় সবার উপর ‘গজব’ কামনা করে স্ট্যাটাস দেওয়া এবং অন্যের পোস্ট শেয়ার করায় সীতাকুণ্ড থানার ৮ নং সোনাইছড়ি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক মো. আজিজুল হক এবং ভাটিয়ারী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ২ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন সালেহকে বহিষ্কার করা হয়।

মামুনুল হককে নারায়ণগঞ্জে কথিত স্ত্রীসহ আটক করার পর আজিজ নিজের ফেসবুকে লিখেন, ‘কোনও অবস্থাতেই মেনে নিতে পারছি না। একজন আলেমকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এইভাবে হেনস্থা করলি। আল্লাহর গজব পড়বে তোদের উপর।’

শুধু তাই নয়, হেফাজত নেতা মামুনুল হককে কেন ছাত্রলীগ সম্মান দিতে জানে না- এমন প্রশ্ন তুলে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে মামুনুল হকের পক্ষে স্ট্যাটাস দেওয়ায় গত ৫ এপ্রিল বহিষ্কার হন সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফয়েজ উদ্দিন।

এদিকে, গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করে দলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঘটনাকে মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছেন না ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা। তারা বলছেন, যাচাই-বাছাইয়ে ফাঁকফোকর থাকার কারণেই দলের এই পরিণতি। দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন সংগঠনের বর্তমান নেতা-কর্মীদের এমন আচরণ বিব্রতকর বলেও জানিয়েছেন তারা।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ একুশে পত্রিকাকে বলেন, যারা মামুনুলের পক্ষে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তারা দলীয় নীতি-আদর্শের বিপক্ষে গিয়ে এই কাজ করেছেন। দেখবেন তথ্য গোপন করেই এরা ছাত্রলীগে প্রবেশ করেছে। যাচাই-বাছাইয়ে গলদের কারণেই এরা ছাত্রলীগে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। ছাত্রলীগকে আরো সুসংগঠিত করতে বর্তমান নেতৃত্বকে যাচাই-বাছাইয়ে আরও সতর্ক ও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শও দেন সাবেক এই শীর্ষ ছাত্রলীগ নেতা।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আদিত্য নন্দী একুশে পত্রিকাকে বলেন, যারা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সরকারবিরোধী এসব কাজে সমর্থন দিচ্ছে তারা নিঃসন্দেহে অনুপ্রবেশকারী। আর কেন্দ্র থেকে এসব অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এরপরও নেতৃত্ব যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরো শাণিত করার উপর গুরুত্বারোপ করা দরকার।
অন্যদিকে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী মনে করেন সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বে ব্যর্থতা, ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই ছাত্রলীগের আজ এই অবস্থা।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘যাচাই-বাছাই না করে দলে প্রবেশ করার সুযোগ দিয়ে, পরবর্তীতে শুধুমাত্র অনুপ্রবেশকারী বলে বহিষ্কাার করে এর দায় এড়ানো যায় না। এতো বড় সংগঠনের একটা ওয়েবসাইট/অ্যাপস নেই, কর্মীদের কোনো আইডি নাম্বার নেই, যাচাই-বাছাইয়ের কোনো ডিজিটাল পদ্ধতি নেই, কোনো সাংগঠনিক ফান্ড নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সুষ্ঠু জবাবদিহিতা না থাকার কারণেই এমনটা হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাব্বানী বলেন, ‘ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এসব আলোচনা-সমালোচনা করার সুযোগ ছাত্রলীগই করে দিচ্ছে। অনেক সময় ছাত্রলীগকর্মীর জন্য অনেকে সুপারিশ করেন। তাদের কথা রাখতে পদ-পদবি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কারা সুপারিশ করছেন সংগঠন তাদের রেফারেন্সের তথ্য রাখছে না। আর এর কারণেই ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারীরা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।’

এদিকে, দলে হেফাজতপন্থি নেতাকর্মীর প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক নাজির আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, হেফাজত প্রীতির কারণে দল থেকে বেশ কয়েকজনকে বহিঃষ্কার করা হলেও এদের সংখ্যা আরো বেশি। বিভিন্নভাবে অনেকে ছাত্রলীগে ঢুকে পড়েছে। সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে এরা সক্রিয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মামুনুল কেলেঙ্কারিতে দলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর তাদের আসল পরিচয় বেরিয়ে এসেছে।

এসময়, ছাত্রলীগের কোনও নেতাকর্মীর সাথে হেফাজত সংশ্লিষ্টতা পেলে কেন্দ্র থেকে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি আল-নাহিয়ান খান হয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও বরাবরের মতো এবারও তারা সাড়া দেননি।