বিয়ে রেজিস্ট্রির নামে হচ্ছে কী?


শরীফুল রুকন : চট্টগ্রাম নগরের মিসকিন শাহ মসজিদ ও মাজার এবং আশপাশের এলাকায় ২০ বছর ধরে বিয়ে ‘রেজিস্ট্রির’ কাজ করে আসছেন শামসুল ইসলাম প্রকাশ বাবুল নামের এক ব্যক্তি। প্রতি মাসে তিনি অন্তত ৩০টি বিয়ে ও তালাক ‘রেজিস্ট্রি’ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সে হিসেবে গত ২০ বছরে বাবুল ৭ হাজারের বেশি বিয়ে ও তালাক ‘রেজিস্ট্রি’ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি ভুয়া কাজী।

সম্প্রতি মিসকিন শাহ মসজিদ ও মাজারে একটি আকদ অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, বাবুল নামের ওই ব্যক্তি ‘বালাম বই’ হাতে নিয়ে বিয়ে ‘রেজিস্ট্রি’ করছেন। সেখানে কার সঙ্গে কার, কত দেনমোহর ধার্য, কী কী শর্তে বিয়ে সম্পন্ন হলো, সাক্ষী ও উকিলের নাম প্রভৃতি লিখছেন তিনি। এ সময় বাবুলের আশপাশে বর-কনে দুই পক্ষের লোকজন গোল করে বসে ছিলেন। এই বিয়ের আগে ওই ‘বালাম বইয়ে’ আরও অনেক পৃষ্টা পূরণ অবস্থায় দেখা গেছে। উক্ত ঘটনার ভিডিও একুশে পত্রিকার কাছে সংরক্ষিত আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহানগর পর্যায়ে প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে কাজী নিয়োগ দেয় সরকার। চট্টগ্রাম মহানগরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজীদের তালিকায় শামসুল ইসলাম প্রকাশ বাবুল নামে কারও নাম নেই। এরপরও কাজী হিসেবে কাজ চালিয়ে আসছেন বাবুল। মিসকিন শাহ মসজিদ ও মাজার এলাকাটি পড়েছে নগরের চকবাজার ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী মুহম্মদ সিকান্দরের অধিক্ষেত্রের মধ্যে। কিন্তু সিকান্দর বিয়ে রেজিস্ট্রি করার জন্য মিসকিন শাহ মাজারে যেতে পারেন না। সেখানে গেলেই দলবল নিয়ে সিকান্দরের উপর হামলা চালান বাবুল। এ ধরনের একটি ঘটনায় বাবুলসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৬ জুন আদালতে মামলা করেছিলেন চকবাজারের কাজী সিকান্দর। কিন্তু মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

জানতে চাইলে চকবাজার ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী মুহম্মদ সিকান্দর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শামসুল ইসলাম প্রকাশ বাবুল একজন ভুয়া কাজী। তার দ্বারা নিবন্ধিত বিয়ে এবং তালাকও ভুয়া। ভুয়া কাজীর দ্বারা যারা বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন করিয়েছেন জরুরি মুহূর্তে তারা জটিলতায় পড়বেন।’

মিসকিন শাহ মাজারে নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন এমন একজন ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার মাজারে তিন থেকে চারটি বিয়ে হতে আমি দেখে আসছি। বেশিরভাগ বিয়ে হয় আসরের নামাজের পর। এছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিনও কম-বেশি বিয়ে হয়। সবগুলো বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন বাবুল। অন্যান্য কাজীদের চেয়ে তিনি অর্ধেক টাকা কম রাখেন।’

সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে জানান, বাবুলের গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীর শাকপুরায়। তারা থাকেন গণি বেকারি এলাকায়। তার বাবা সিরাজুল হক ছিলেন দারোয়ান। তিনি ৮-১০টি বিয়ে করেছেন। সে সুবাদে বাবুলের ভাই-বোনদের সংখ্যা শ’খানেক হবে। বাবুল এক সময় বিদেশে ছিলেন। পরে দেশে এসে কসাইগিরি শুরু করেন, গরুর গোশত বিক্রি করতেন। এরপর ২০০১ সালের দিকে মিসকিন শাহ মাজারে বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজ শুরু করেন বাবুল। গণি বেকারি ও মিসকিন শাহ মাজার এলাকায় তিনি বেশ প্রভাবশালী। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। এছাড়া একজন পুলিশ পরিদর্শকের নাম ভাঙিয়েও চলেন তিনি। যার কারণে তাকে সমস্যায় পড়তে হয় না।

এই সুযোগে কাবিননামা জালিয়াতির সঙ্গেও বাবুল যুক্ত হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। একজন ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনি যদি বাবুলের কাছে গিয়ে ৮-১০ বছর আগের তারিখ দিয়ে একটি কাবিননামা বানিয়ে দিতে বলেন, তিনি করে দেবেন। চট্টগ্রামের প্রায় সব কাজীর সিল আছে তার কাছে। যখন যেটা দরকার হয়, সেটা ব্যবহার করেন তিনি।’ এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাবুলের গ্রামীণ নাম্বারে পরিচয় গোপন করে ফোন করেন এ প্রতিবেদক; বাবুলকে বলা হয়, ‘ভালোবেসে একটা মেয়েকে দুই বছর আগে বিয়ে করেছি, কাবিননামা করা হয়নি। এখন দুই বছর আগের তারিখ দিয়ে কাবিননামা বানাতে চাই।’ তখন বাবুল বলেন, ‘যাবে, তবে এসব কথা ফোনে বলা ঠিক না। আপনি সরাসরি আসুন, কথা বলবো।’ এ কাজের জন্য কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে বাবুল বলেন, ‘সরাসরি আসলে বলবো।’ তখন তাকে জানানো হয়, ‘নিজাম নামের একজনের সঙ্গে এ কাজের বিষয়ে কথা হয়েছে, তিনি পাঁচ হাজার টাকা চান।’ তখন বাবুল বলেন, ‘তাহলে তার কাছ থেকে করে ফেলুন।’ এ কথা বলে ফোন কেটে দেন তিনি।

এরপর ১০ এপ্রিল দুপুরে পরিচয় দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল ইসলাম প্রকাশ বাবুল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনার সমস্যা কী? আপনি কেন এসব জিজ্ঞেস করতেছেন? আমি কাজী নাকি আর কিছু সেখানে আপনার সমস্যা কী? আপনি কালকেও ফোন করেছেন, এখনও ফোন করেছেন, একটা বিয়ে আছে, প্রেম আছে বলেছিলেন। আপনার সাথে আমার কী? আপনি কেন আমাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করছেন?’

জানতে চাইলে মিসকিন শাহ মসজিদ ও মাজারের মোতোয়াল্লী আব্দুল্লাহ মো. এহতেশাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শামসুল ইসলাম বাবুলকে আমি আমাদের পাড়ার লোক হিসেবে চিনি। তিনি কাজী নয়, আমাদের ওয়ার্ডের কাজী হচ্ছেন সিকান্দর। কেউ আমাদেরকে বিয়ে রেজিস্ট্রির বিষয়ে জানালে আমি কাজী সিকান্দরকে ফোন করে দাওয়াত দিই। তিনি এসে রেজিস্ট্রি করে যান।’ কিন্তু কাজী সিকান্দরের দাবি ভুয়া কাজী বাবুলের কারণে তিনি মিসকিন শাহ মাজারে যেতে পারেন না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোতোয়াল্লী আব্দুল্লাহ মো. এহতেশাম বলেন, ‘আপনার সঙ্গে যদি কারও ব্যক্তিগত দ্বন্ধ থাকে, তাহলে তো সেটা আমার বিষয় না। ব্যক্তিগত ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করা আমার কাজ না। আপনি বলেন যে আপনি কাজী, তিনি বলেন যে তিনি কাজী, তাহলে এ বিষয়ে আইনানুগভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, এটা আমি চাই।’

এদিকে চট্টগ্রাম নগরের সুগন্ধা আবাসিকের দুই নম্বর সড়কের মাজার এলাকায় সক্রিয় থাকা নিজাম উদ্দিন নামের আরেকজন ভুয়া কাজীর খোঁজ পাওয়া গেছে। তার প্রকৃত বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর এলাকায়। যদিও তিনি বোয়ালখালীর কেরানিবাজার বাড়ি বলে পরিচয় দেন। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, নিজামের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। তিনি কারাগারে ঢুকেন আর বের হন। প্রায় সবই প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা। চট্টগ্রামের প্রায় সব কাজীর সিল তার কাছে আছে। এমনকি কোন কাগজে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরও যদি করা লাগে নিজাম করে দিতে পারবেন- এমন আলোচনা আছে।

৫ বছর আগের তারিখ দিয়ে বিয়ের কাবিননামা তৈরি করতে পারবেন কিনা- পরিচয় গোপন করে জানতে চাই নিজাম উদ্দিনের কাছে। মুঠোফোনে নিজাম বলেন, ‘অবশ্যই যাবে। কাবিন কত?’ ৫ লাখ টাকা জানালে নিজাম বলেন, ‘প্রতি লাখের জন্য সাড়ে ১২শ’ করে দিতে হবে। ৫ বছর আগের হওয়ায় পয়সা একটু বাড়তি দিতে হবে, কম হবে না। কাবিননামা জেনুইন হবে, বালামভুক্ত।’ কার কাছ থেকে বালামভুক্ত করবেন জানতে চাইলে নিজাম বলেন, ‘যার কাছ থেকেই হোক, সিটি করপোরেশনের যে কোন কাজীর বালামে উঠবে, আপনাকে একটা কপি দেবে, এই হলো কথা।’ ৫ বছর আগের তারিখ দিলে বালাম বইয়ে সিরিয়াল মেলানো যাবে কিনা, আইন অনুযায়ী হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইনে কেন কাভার করবে না? ৫ বছর আগে যেদিন বিয়ে করেছেন সেদিনের তারিখ দেয়া হবে। ৫ বছর আগের বালামে এই বিয়েটা যোগ হবে। সচরাচর বিয়ে যে রকম আপনারটাও সে রকম হবে।’ পরে প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন তিনি।

শুধু বাবুল ও নিজাম নয়, চট্টগ্রামে এ ধরনের শতশত ব্যক্তি কাজী না হয়েও বিয়ে রেজিস্ট্রি করে আসছেন। তাদের অনেকেই আবার বৈধ কাজীর সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। অভিযোগ আছে, ১৯৯৯ সাল থেকে নগরের ৩২ নং আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী নাঈমুল আলম গত ১০ বছর ধরে অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। শারীরিকভাবে চলতে-ফিরতে তিনি অক্ষম। তার অধিক্ষেত্র আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ, আমানত শাহ (রহ.) মাজার জামে মসজিদ এবং কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় প্রতিনিয়ত যে বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়, সেখানে তার উপস্থিতি দেখা যায় না।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজগুলো করে যাচ্ছেন কাজী নাঈমুল আলমের সহকারীরা, এসব কাজ তদারকি করছেন কাজী নাঈমুলের স্ত্রী। ওই নারী মোশাররফ নামের একজন কাজীর শালী। মোশাররফ এক সময় কক্সবাজারের পেকুয়ার কাজী ছিলেন। সে সুবাদে নাঈমুলের স্ত্রী কাজীর সব কাজ জানেন। স্টাফরা সব রেডি করে আনেন, তিনি সই করেন। এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামের জেলা রেজিস্ট্রারের কাছেও জমা পড়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের একজন সাবেক মন্ত্রী ও একজন সদ্য সাবেক প্রভাবশালী একজন জনপ্রতিনিধির হস্তক্ষেপে নাঈমুলের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

এদিকে কাজী নাঈমুলের ব্যাপারে উঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা খুঁজতে নেমে পাওয়া গেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। নগরের একটি ওয়ার্ডের কাজী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নাঈমুল আলম আর আমি কাছাকাছি সময়ে কাজী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলাম। ওনাকে আমি ভালো করে চিনি। তিনি লোহাগাড়ার রাজঘাটা হোছাইনিয়া আজিজুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। কওমি মাদ্রাসার ছাত্র হয়ে তিনি কিভাবে কাজী হলেন সেটা বড় প্রশ্ন। কারণ কাজী হতে গেলে আলিম পাশ করতে হয়।’

চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে জমা থাকা কাজী নাঈমুল আলমের নিয়োগ সংক্রান্ত ফাইলটি দেখতে সক্ষম হন এ প্রতিবেদক। সেখানে দাখিল ও আলিম পরীক্ষার সনদ দিয়েছেন নাঈমুল আলম। এর মধ্যে দাখিল পরীক্ষার সনদে উত্তীর্ণ ব্যক্তি হিসেবে নাম লেখা হয়েছে, ‘মো: নঈমুল আলম’; আর আলিম পরীক্ষার সনদে উত্তীর্ণ ব্যক্তির নাম লেখা হয়েছে, ‘মো: নাঈমুল আলম’। অর্থ্যাৎ একটি সনদে ‘নঈমুল’, আরেকটি সনদে ‘নাঈমুল’ লেখা হয়েছে। এছাড়া দাখিল পাশের সনদে বাবার নাম লেখা হয়েছে, ‘খোরশেদুল আলম আনছারী’; আবার আলিম পাশের সনদে বাবার নাম লেখা হয়েছে ‘খোরশেদ আলম আনছারী’। অর্থ্যাৎ একটি সনদে বাবার নাম ‘খোরশেদুল’, আরেকটি সনদে ‘খোরশেদ’ লেখা হয়েছে।

নাঈমুল আলম ১৯৯১ সালে দাখিল পাশ করেছেন বলে ০০৩০৯৭২ ক্রমিক নম্বরের যে সনদ সরকারকে দিয়েছেন, সেটি ১৯৯১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইস্যু হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। ওই সনদে ১৯৯২ সালের একটি স্মারক নাম্বার আছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বামাশিবো-কম/১২৬৫/পি-৬(দাঃ ৬০,০০০) ২৩-৯-৯২ ইং’। একই সনদে শিক্ষাবর্ষের জায়গায় ঘষামাজা করে ৯ এর উপর ৮ বসানো হয়েছে।

অন্যদিকে নাঈমুল আলম দাবি করেছেন, তিনি ১৯৯৩ সালে আলিম পাশ করেছেন; পাশ করার পাঁচ বছর পর ১৯৯৮ সালের ৩ মার্চ তারিখে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক স্বাক্ষরিক সাময়িক সনদপত্র তিনি সরকারকে জমা দিয়েছেন। এছাড়া সনদগুলোতে নিজের বয়স ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ ইং উল্লেখ করেছেন নাঈমুল আলম; যদিও বর্তমানে তাকে দেখলে মনে হবে বয়স ৬০ বছরের কম নয়। এসব অসংগতির কারণে নাঈমুল হকের সনদগুলো আদৌ সঠিক কিনা তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ১৯৯৬ সালের আগের দাখিল-আলিম পরীক্ষার ফলাফল অনলাইনে যাচাই করার সুযোগ না থাকায় নাঈমুলের সনদের সত্যতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক যাচাই করা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য আন্দরকিল্লা কাজী অফিসের নাম্বার বলে প্রচার করা একটি রবি নাম্বারে যোগাযোগ করা হয়। এরপর কল ধরে এক ব্যক্তি নিজেকে নাঈমুল আলম বলে পরিচয় দেন। সনদপত্রগুলোতে থাকা অসংগতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘সনদ সঠিক আছে। সেখানে কোন সমস্যা নেই।’ নাঈমুল আলমকে কিছুদিন আগে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে এ প্রতিবেদক দেখেছেন, তিনি বর্তমানে হাঁটতে পারেন না, একজনের সাহায্য নিয়ে মসজিদে এসে এক পাশে চেয়ারে বসে ছিলেন, তিনি ভালো করে কথা বলতে পারেন না- আপনি নিশ্চয়ই অন্য কেউ, এ কথা বলার পর ফোনের অপরপ্রান্তের ওই ব্যক্তি বলেন, ‘পরে কথা বলেন। আপনি কী বলেন আমি কিছু বুঝি না।’ সনদ অনুযায়ী নাঈমুল আলমের বয়স ৪৪, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ৬০ এর কম হবে না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আপনি কী বয়সের সার্টিফিকেট দেবেন, ভাইয়া?’ সনদের সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার সত্যতা মিলছে না বললে তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে।’ কী ঠিক আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, সার্টিফিকেট আছে না?’ কিছু অসংগতির কারণে সনদগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জানালে নাঈমুল আলম পরিচয় দেয়া ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আপনার কথার সত্যতা আমি পাচ্ছি না। সার্টিফিকেটগুলো তো বোর্ড দিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার তাপস কুমার রায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আচ্ছা, আমি দেখবো।’ এভাবে দায়সারা গোছের জবাব দিয়ে ফোন রেখে দেন তিনি। অথচ বিয়ে রেজিস্ট্রি ও কাজীদের ক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে কিনা তা নজরদারির জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে রেজিস্ট্রার অফিসকে। কিন্তু তারা ভালোভাবে নজরদারি করবেন দূরের কথা, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন্দ্রীক অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, ২০০০ সালের ৪ জানুয়ারি চকবাজারের ওয়ার্ডের কাজীর পদ থেকে এ এস এম আব্দুল কাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়। তার স্থানে নিয়োগ দেয়া হয় মাওলানা মুহম্মদ সিকান্দরকে। বিধিমালা অনুযায়ী, সাবেক কাজীর ব্যবহার করা পুরনো বালাম বই নতুন কাজীকে হস্তান্তর করার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে তা হয়নি। রেজিস্ট্রার অফিসের পক্ষ থেকে চকবাজারের পুরনো বালাম বইগুলো তুলে দেয়া হয়েছে বাগমনিরাম ওয়ার্ডের কাজী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে। যার কারণে চকবাজারের যেসব বাসিন্দার বিয়ে ২০০০ সালের আগে হয়েছে, তাদেরকে কাবিননামা নিতে বাগমনিরাম ওয়ার্ডের কাজীর কাছে যেতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমনিরাম ওয়ার্ডের কাজী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বালাম বইগুলোর বিষয়ে মামলা আছে। এ কারণে রেজিস্ট্রার অফিস থেকে বালাম বইগুলোর দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে।’ তবে কাজী গিয়াসের এ বক্তব্য অসত্য দাবি করে কাজী সিকান্দর বলেন, ‘কোন মামলা হয়েছে দেখাতে পারলে, আমি গিয়াসকে ১০ লাখ টাকা দেব। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, নুরুল ইসলাম বিএসসি ফোন করায় পুরনো বালামগুলো গিয়াসের হাতে তুলে দিয়েছেন জেলা রেজিস্ট্রার।’

এদিকে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কাজীদের মধ্যে কেউ কেউ জালিয়াতি করে মামলার আসামি হয়েছেন, জেলে গিয়েছেন। অনিয়মের দায়ে নগরের ৩৫ নং বক্সিরহাট ওয়ার্ডের কাজী জাহাঙ্গীর আলম হেলালীর নিকাহ রেজিস্ট্রির লাইসেন্স ২০১৩ সালে বাতিল করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ এনে আবারও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন হেলালী। মো. সাঈদসহ আর বেশ কয়েকজন সহকারী নিয়োগ দিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে আসছিলেন তিনি। পরে ৩ লাখ টাকার কাবিন ৩০ লাখ টাকা করার একটি ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে হেলালী কারাগারে আছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে নগরের ৩১ নং আলকরণ ওয়ার্ডের কাজী জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। একজন কাজী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সন্দ্বীপের ছেলে জামালের বালাম বই শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় পর্যন্ত আছে। এসব বই ব্যবহার করে নানা অনিয়ম হচ্ছে। যার কারণে তার বিরুদ্ধে কিছুদিন পরপর মামলা হয়। বাল্যবিয়ে, জালিয়াতি ও জোরপূর্বক বিয়েসহ নানা অভিযোগে মামলাগুলো হয়। তিনি কারাগারে ঢুকেন, আর বের হন। হাইকোর্টে তার আত্মীয়-স্বজন আছেন। বলে দিলে, তারা জামিন নিয়ে নেন।’

নজরদারির অভাবে শুধু কাজীরা নয়, তাদের সহকারীরাও বিয়ে রেজিস্ট্রি নিয়ে নানা অনিয়মে জড়িয়েছেন। আর কেউ এক সময় কাজীর সহকারী হিসেবে কাজ করলেও পরে চাকরি ছেড়ে বিয়ে রেজিস্ট্রির নামে প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনায় যুক্ত হয়েছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী শুধু, কাজীরা বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে পারবেন। কিন্তু নগরের সরাইপাড়া ওয়ার্ডের কাজী একরামুল হক তার এলাকায় চারটি অফিস খুলে বেশ কয়েকজন সহকারীর মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ২৬ নং ওয়ার্ডের কাজী জয়নাল আবেদীন মামলার আসামি হয়ে পলাতক থাকলেও আবদুল মান্নান কাউসারসহ কয়েকজন সহকারী দিয়ে তিনি বিয়ে রেজিস্ট্রি চালিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে নগরের প্রায় প্রতিটি কাজী তাদের সহকারী নিয়োগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে আসছেন বলে অভিযোগ আছে। এই সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করছেন ভুয়া কাজীরা।
নগরের বাগমনিরাম ওয়ার্ডের কাজী গিয়াস উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ রকম অনেক সময় হয় যে, মানুষজন এসে কাবিননামা খুঁজে, কিন্তু বালামে তাদের তথ্য থাকে না। তারা বিয়ের রেজিস্ট্রির নামে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এমনও হতে পারে, প্রতারকরা আমরা সিল ব্যবহার করে প্রতারণা করছে।’

চকবাজার ওয়ার্ডের কাজী মুহম্মদ সিকান্দর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রতারকরা বৈধ কাজীদের সিল ব্যবহার করে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে আসছেন। তাদেরকে অবিকল বালাম বই ও কাবিনের কাগজপত্র ছাপিয়ে দিচ্ছে আন্দরকিল্লার কিছু ছাপাখানা। আন্দরকিল্লায় আ জ ম নাছির সাহেবের বাসার নিচে থাকা একটি ছাপাখানায় এ অনিয়মগুলো বেশি হচ্ছে। যার কারণে বিয়ের নামে চলছে ভয়াবহ প্রতারণা। এসব বিষয় দেখভাল করার জন্য যেন কেউ নেই।’

এদিকে বিয়ে রেজিস্ট্রির বিষয়টি নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে না থাকায় পরিচয় গোপন রেখে কিংবা আইনের ফাঁক গলে একাধিক বিয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব বিয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্র ভুয়া কাজীরা ভুয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে দেন। যদিও ফৌজদারি আইনে তথ্য গোপন করে একাধিক বিয়ে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনায় মামলা হয়না, সমঝোতার মাধ্যমে অনেকে মিটিয়ে নেন। বছরে এ ধরণের প্রতারণার কতগুলো ঘটনা ঘটে, কিংবা কতগুলো মামলা হয় সে নিয়ে সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। কেবল গণমাধ্যমে আলোচিত হলেই সেগুলো সামনে আসে। বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্টার সমিতির মহাসচিব কাজী ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে যেভাবে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন হয়, তাতে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধের উপায় বলতে গেলে নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘সংশ্লিষ্টরা ভুয়া কাজীর দায় এড়াতে পারেন না। ভুয়া কাজীর দৌরাত্ম্য কমাতে হলে কাজীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডাটাবেজ এবং ওয়েবসাইট তৈরি করতে হবে। যাতে নিবন্ধন নাম্বার দিয়ে যে কেউ কাজী বৈধ না ভুয়া তা যাচাই করতে পারেন। আর বিয়ে রেজিস্ট্রির বিষয়ে অনলাইনে যাচাই করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলে বিয়ে রেজিস্ট্রি নিয়ে প্রতারণা কমে আসবে।’

এদিকে বিয়ে রেজিস্ট্রির জন্য বৈধ কাজীরা প্রতি এক লাখ টাকা কাবিনের জন্য সাড়ে ১২শ’ টাকা নিয়ে থাকেন। এই সংখ্যা ৪ লাখ টাকা কাবিনের জন্য ধার্য্য করা। অর্থ্যাৎ চার লাখ টাকা কাবিনের জন্য ৫ লাখ টাকা রেজিস্ট্রি ফি আদায় করা যায়। এর বেশি টাকা কাবিন হলে প্রতি লাখে ১০০ টাকা করে নেন কাজীরা। অথচ চট্টগ্রাম নগরের কাজীরা সরকারকে বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা ফি দিয়ে থাকেন। উপজেলা পর্যায়ের কাজীরা সরকারকে বছরে ফি দেন ৫ হাজার টাকা মাত্র।

জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কাজী ও তাদের সহকারীদের অনেকেই বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের সম্পদের খোঁজে দুদকসহ সরকারের সংস্থাগুলো অনুসন্ধানে নামলে পিলে চমকানো তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চট্টগ্রামের উপজেলা পর্যায়ের একজন কাজী বলেন, ‘সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য অসাধু ব্যক্তিরা কাবিননামা বানিয়ে থাকেন। ৫০ বছর আগের পুরনো তারিখ দিয়েও কাবিননামা বানানোর সুযোগ আছে। যাদের বিয়ে হয়েছে ৫০ বছর হয়ে গেছে, তাদের স্থলে বসিয়ে দেওয়া হয় এক্ষেত্রে। আগের একটা ফাইল বের করে ফেলে দেবে আরকি। পুরনো বালাম বই নিয়ে অডিট বা পরিদর্শন তেমন হয় না, যার যার বালাম শুধু তার কাছেই থাকে। যার কারণে এসব অনিয়ম করলে তেমন ধরা পড়ে না। অন্যদিকে এ ধরনের কাজ করলে বড় অংকের টাকা পাওয়া যায়। এসব ঘটনা কিন্তু এখন ঘটছে তা নয়। ২০-৩০ বছর আগে থেকে এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটে আসছে দেখছি।’

যদিও চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার তাপস কুমার রায় বলছেন, ‘বিয়ে রেজিস্ট্রার নিয়ে প্রতি বছর অডিট হয়। কোন কাজী অনিয়ম করলে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।’