
জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সাড়ে তিন হাজারের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে কোনো ধরনের সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে হাসপাতাল, বাজার, গৃহস্থালীসহ সব ধরনের বর্জ্য অপসারণের কাজ করতে হচ্ছে তাদের।
অন্যদিকে কখনো সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনিহার অজুহাত আবার কখনো সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করার আশ্বাস দিয়ে দায় সারছেন চসিকের কর্মকর্তারা।
চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগ সূত্র জানায়, করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে তিন শিফটে নালা-নর্দমা পরিষ্কার, ‘ডোর-টু-ডোর’ বর্জ্য সংগ্রহ এবং এসব আবর্জনা নির্দিষ্ট গ্রাউন্ডে নেয়ার কাজ করে আসছেন ৩ হাজার ৮২৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
গতকাল রোববার ও আজ সোমবার নগরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, আবর্জনা অপসারণের সময় অধিকাংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মুখে ছিল না মাস্ক। কয়েকজনের মুখে মাস্ক দেখা গেলেও সংখ্যাটা খুবই কম। হ্যান্ড গ্লাভস বা বুট জুতা ছাড়াই ময়লা পরিষ্কার করতে দেখা গেছে বেশিরভাগ সেবককে।
কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, নিজ নিজ এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে সিটি কর্পোরেশন কড়া নির্দেশ দিলেও কোনো সুরক্ষা সামগ্রি তাদের দেওয়া হয়নি। সুরক্ষা সামগ্রী তো দূরের কথা, কাজ শেষে সাবান বা জীবানুনাশক ছাড়াই শুধু পানি দিয়ে হাত-মুখ পরিষ্কার করেন তারা।
ময়লা পরিষ্কার করছেন অথচ কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই, এমনটা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ১২ নং ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্বপন বিশ্বাস বলেন, ‘করোনার সময় আর কেউ আমাদের মতো ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে না। আমরা ঝুঁকি নিই কিন্তু আমাদের চিন্তা কারো নেই। এই যে মাস্ক আমি পরে আছি, এটা নিজের টাকায় কেনা। কিন্তু অল্প বেতনে গ্লাভস, বুট জুতা তো আর নিজের টাকায় কেনা সম্ভব না। তাই খালি হাতেই কাজ করি।’
পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. লিটন বলেন, ‘সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া কাজ করে আমরা তো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছি, আমাদের পরিবারকে ঝুঁকিতে থাকতে হচ্ছে। সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যাপারে অফিসের স্যারদের বেশ কয়েকবার বলেছি। দিবে তো বললো কিন্তু কখন দিবে তা জানায়নি। আমি একা বললে তো হবে না, সকল পরিচ্ছন্নকর্মীদের একসাথে বলতে হবে।’
২৫ নং ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী এখলাস উদ্দিন বলেন, ‘শহর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে সবাইকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের কাজ। কিন্তু আমরাই সুরক্ষিত নই। যেকোন সময় আমরা করোনায় আক্রান্ত হতে পারি। গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে একবার মাত্র দুটো মাস্ক আর হ্যান্ড গ্লাভস দেওয়া হয়। সেগুলো একবার ব্যবহার করার পরেই ফেটে যায়, দ্বিতীয় বার ব্যবহার করা যায় না। এবছর অফিস থেকে এখন পর্যন্ত কিছু পাইনি।’
এদিকে, অনেক এলাকায় বাসার ভেতরে ঢুকে ময়লা সংগ্রহ করতে হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া আবর্জনা সংগ্রহ করায় পরিচ্ছন্নকর্মীরা করোনাভাইরাসের ঝুঁকি নিয়েই প্রবেশ করছেন এসব বাসায়। তাদের মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি একুশে পত্রিকাকে বলেন, সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার ছাড়াই আবর্জনা সংগ্রহ করায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা করোনাসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে থাকেন সবচেয়ে বেশি। আবর্জনা অপসারণের সময় তাদের অবশ্যই মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ও বুট জুতা ব্যবহার করতে হবে। কারণ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর নিরাপত্তাহীনতা মানে নগরবাসী নিরাপত্তাহীনতা। তাই এই বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সেবকদের জন্য ইতোমধ্যে মাস্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো চলে আসবে। আর যারা ড্রেন পরিষ্কার ও ময়লা ডাম্পিং করে তাদের মধ্যে ১৫০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে জুতা দেওয়া হয়েছে।’ সকলকে কবে নাগাদ পরিপূর্ণ সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হবে এই বিষয়ে নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোজাম্মেল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পদ-পদবি অনুযায়ী কোন কর্মচারী কী পাবেন, আর কী পাবেন না- প্রাপ্যতার প্রাধিকারের একটা বিষয় আছে। তারপরও কোভিড বিবেচনায় তাদের আমরা সুরক্ষা সামগ্রী দিতে শুরু করেছি, পর্যায়ক্রমে সবাইকে দেওয়া হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো ধরণের সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয় না এমন অভিযোগটি সঠিক নয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হ্যান্ড গ্লাভস এবং মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রী দিলেও তারা এগুলো পরতে চায় না। কেন তাদের এই অনিহা সেটা বুঝতে পারি না।’
এ বিষয়ে জানতে সিটি মেয়র এম রেজাউল করিমের নাম্বারে বেশ কয়েকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
