বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮

নতুন ‘ট্রেন্ডে’ হারিয়ে যাচ্ছে ইফতারের চেনা পদ

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১, ৮:২৯ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : মাছে-ভাতে বাঙালি- প্রবাদটি ‘ছোলা-পেঁয়াজুতে বাঙালি’ হয়ে যায় পবিত্র রমজান মাস আসলে। রমজানের ইফতার মানেই ছিল প্লেটভর্তি ছোলা, পেঁয়াজু এবং মুড়ি। তবে দিন পাল্টেছে। সেই সাথে পাল্টেছে মানুষের স্বাদ ও রুচিও।

চট্টগ্রামের ইফতারের টেবিল এখন ছোলা-পেঁয়াজুর পরিবর্তে গ্রিল, চিকেন আর বিরিয়ানির দখলে! হোটেল-রেস্টুরেন্টের মেন্যুতেও তাই এখন এসব নতুন পদের জয়জয়কার। ক্রেতারাও বাহারি এসব খাবারকে পছন্দের তালিকায় স্থান দেওয়ায় অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে ছোলা-পেঁয়াজুর সেই চিরাচরিত ঐতিহ্য।

সরেজমিন চট্টগ্রামের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ঘুরে দেখা গেছে, ইফতারের মেন্যু হিসেবে হরেক রকমের বিরিয়ানি, মাংসের বিভিন্ন আইটেম এবং রুটি-পরটার বেচাকেনা বেশি। ছোলা-পেঁয়াজু থাকলেও তার পরিমাণ খুবই কম। রেস্টুরেন্টের কর্মীদের দাবি, ‘ছোলা-পেঁয়াজুর চাহিদা কম। তাই পরিমাণও কম।’

আবার এমন রেস্টুরেন্ট ও হোটেল আছে যেখানে ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ পাওয়াই যায় না! বিভিন্ন নামের বিরিয়ানিই তাদের ইফতারির মেন্যু হিসেবে স্থান পেয়েছে। এমনই একটি হোটেল কাজী চিকেন ফার্মস। চট্টগ্রামের জামালখান এলাকায় এই হোটেলের ইফতারির মেন্যু হিসেবে রয়েছে বিরিয়ানি, চিকেন ফ্রাই, খেজুর ও পানি।

একইভাবে নানা ধরণের চিকেন চাপ-গ্রিলসহ বিরিয়ানির সেট মেন্যু বিক্রি করছে ‘রোদেলা বিকেল’, ‘মোগল’, ‘চট্টোমেট্রো’, ‘সাদিয়াস কিচেন’সহ বেশকিছু রেস্টুরেন্ট।

ইফতারির মেন্যুর এই বিবর্তন সম্পর্কে চট্টো-মেট্রো রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী গোলাম সারোয়ার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইফতারে ভাজা-পোড়ার চেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দিকে মানুষ বেশি ঝুঁকছেন। আমরাও সেই চাহিদামত ইফতারের আয়োজন করেছি। আমরা ইফতারে বিরিয়ানির বেশ কিছু নতুন মেন্যু সংযোজন করেছি। মানুষের সাড়াও ভালো’।

অন্যদিকে ইফতারে ছোলা-পেঁয়াজুর চেয়ে চিকেন গ্রিল, চাপ, কাবাবের চাহিদা বেশি বলে জানান সাদিয়া’স কিচেনের কর্ণধার রায়হানুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোলা-পেঁয়াজুর চেয়ে গ্রিল, চাপ, কাবাবের চাহিদা বেশি দেখতে পাচ্ছি। হাতে গোনা কয়েকজন ছোলা-পেঁয়াজুর খোঁজে আসেন’।

বৃহস্পতিবার মোগল রেস্টুরেন্টে ইফতার কিনতে আসেন সাইফুল খালেদ। তিনি ইফতার হিসেবে কিনেন বিরিয়ানি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগে ইফতার মানেই মনে করা হতো ছোলা-পেঁয়াজু। কিন্তু এখন আর এই দিন নেই। বাচ্চারা রোজা রেখে ইফতারে বিরিয়ানি চায়। তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় বিরিয়ানি আমাদেরও বেশ পছন্দ। তাই বিরিয়ানি কিনতে এসেছি।’

শাফিন আহমেদ নামের আরেক ক্রেতা কিনেন মেজবানি মাংস। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক ভাজা-পোড়া খেতে নিষেধ করেছেন। তাই ছোলা-পেঁয়াজু না কিনে মেজবানির মাংস কিনতে চলে এলাম। শরীরটাও সুস্থ থাকবে মেজবানির স্বাদও পাবো।’

এদিকে কোভিড পরিস্থিতির কারণে সরকার ঘোষিত লকডাউনে ঘর থেকে বের হওয়া না গেলেও অনলাইনে খাবার অর্ডার করার সুযোগ থাকায় ক্রেতারা ঘরে বসেই পেয়ে যাচ্ছেন পছন্দের ইফতার। অনলাইনে খাবার অর্ডার করা ক্রেতারা বলছেন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের বাহারি মেন্যুর এবং বিরিয়ানি-কাবাবের মত খাবারের অর্ডারের ক্ষেত্রে ছাড় থাকায় ছোলা-পেঁয়াজুর প্রতি তাদের আগ্রহ কমেছে।

আগ্রহ কমলেও ছোলা-পেঁয়াজুর চাহিদা যে একেবারে নেই এমনটাও নয়। পাড়া-মহল্লার খাবারের দোকানগুলোতে এখনো বেশ চাহিদা রয়েছে ছোলা, পেঁয়াজু, আলুরচপ, বেগুনীর। কিছু মানুষের পছন্দের তালিকায় এখনো জায়গা ধরে রেখেছে এসব ভাজা-পোড়া খাবার।

পেশায় রিকশাচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রমজানে ছোলা-পেঁয়াজু ছাড়া ইফতার তো ভাবতেই পারি না। অল্প টাকার মধ্যে পেট ভরে ইফতার করা যায়। আর স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা যদি বলেন, যা খাই তার বেশিরভাগই তো ভেজাল। এই ছোলা-পেঁয়াজুতে আর এমন কী হবে?’

ওষুধের দোকানদার ইস্কান্দার আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি- এসব ছাড়া কি ইফতার হয়? ছোটবেলা থেকেই জানি ইফতার মানে এসব খাবার। কিন্তু আজকাল মানুষ ইফতারে পরিবর্তন আনছে। যার যেমন পছন্দ।’