এত সাক্ষ্য-প্রমাণ, তবুও ফাঁসানো হলো নিরীহ শুক্কুরকে!


জিন্নাত আয়ুব, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এক আওয়ামী লীগ নেতার রোষানলে পড়ে ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে না পারায় একজন জেলেকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকার নানা তথ্য-প্রমাণ নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি হওয়া থেকে ওই জেলে রেহাই পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এর আগে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে আনোয়ারার রায়পুর ইউনিয়নের ঘাটকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। এ ঘটনায় ২৮ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা থানায় মৃত সুলতান আহমদের ছেলে আবদুল শুক্কুরসহ তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়; আসামি শুক্কুর পেশায় জেলে।

কোস্টগার্ডের সাঙ্গু সিজি স্টেশনের পেটি অফিসার প্রবীর কুমার রায়ের দায়ের করা ওই মামলায় বলা হয়েছে, ‘২৬ সেপ্টেম্বর রাত দশটায় ঘাটকুল এলাকার মাদক ব্যবসায়ী আবদুল শুক্কুরের বাড়ির পেছনে টয়লেটের পাশে মুখবন্ধ একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে ৯০ হাজার ইয়াবা পাওয়া যায়। চৌকিদার আবদুল শুক্কুরের উপস্থিতিতে এসব ইয়াবা জব্দ করা হয়।’

মামলাটিতে মৃত সুলতান আহমদের ছেলে আবদুল শুক্কুরকে আসামি করায় স্থানীয়রা হতবাক হন। তাদের দাবি, ইয়াবাগুলো যে ঘরের পেছন থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে সেই বাড়িতে থাকতেন মৃত আবদুল শুক্কুরের ছেলে সেলিম; মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি।

অথচ এজাহারে বলা হয়েছে, মৃত সুলতান আহমদের ছেলে আবদুল শুক্কুরের ঘরের পেছনে টয়লেটের পাশ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে; এজন্য তাকে এজাহারভুক্ত আসামিও করা হয়। যদিও মৃত সুলতান আহমদের ছেলে সেই আবদুল শুক্কুরের ঘরে ঘটনার দিন কোন অভিযান চালানো হয়নি; তার বাড়ির পেছনে কোন টয়লেটও নেই।

এছাড়া যে মৃত শুক্কুরের বাড়ির পেছন থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকে জীবিত শুক্কুরের বাড়ির দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

এদিকে মামলাটি কোস্টগার্ডের চার সদস্য ছাড়াও সাক্ষী করা হয়েছে স্থানীয় চৌকিদার আবদুল শুক্কুরকে; পায়ের মাংসে পচন ধরায় প্রায় ছয় মাস তিনি হাসপাতালে ছিলেন। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। ঘটনার পরদিন সকালে কোস্টগার্ডের সদস্যরা গাড়িতে করে তাকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে সাক্ষী হিসাবে তিনি স্বাক্ষর করেন।

জানতে চাইলে চৌকিদার আবদুল শুক্কুর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কোস্টগার্ড ইয়াবা উদ্ধার করেছে রাতে। কার ঘর থেকে উদ্ধার করেছে আমি জানি না। ইয়াবা উদ্ধারের সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। ঘটনার পরদিন সকালে কোস্টগার্ডের সদস্যরা গাড়িতে করে আমাকে থানায় নিয়ে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করান।’

ভুক্তভোগী আবদুল শুক্কুর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ইয়াবাগুলো মৃত শুক্কুরের বসত বাড়ি থেকে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। ২৮ তারিখ এই ঘটনার মামলা করে আমাকেসহ আরো তিনজনকে আসামি করা হয়। বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে আমার দৃষ্টিগোচর হয়। তখন আমি কোস্টগার্ড সিজি সাঙ্গু স্টেশনে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে, তারা প্রথমে আমাকে হুমকি-দমকি দেয়। পরে বলে তুমি নির্দোষ হলে মামলার তদন্তকারী অফিসার বাদ দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. ইকরাম উজ্জামান আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা-পয়সা চান। আমি অপারগতা দেখালে আমাকে বলেছিলেন, ‘পরে বুঝবে’। এখন দেখি চার্জশিটেও আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমাকে এভাবে ফাঁসানোর পিছনে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার হাত রয়েছে। তিনি আমাকে আগেও এরকম দুইটি মিথ্যা মামলায় আসামি করেছেন। এসব মামলায় আমি আদালত থেকে রেহায় পেয়েছি।’

শুক্কুর বলেন, ‘এই মাদক মামলায়ও আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি একজন জেলে। আমার মাছ ধরার একটা বোট রয়েছে। এই বোটে আমরা কয়েকজন জেলে গিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। আমি ওই আওয়ামী লীগ নেতার প্রতিহিংসার শিকার। তার নাম প্রকাশ করলে আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপরও নির্যাতন নেমে আসতে পারে। তাই এখনই প্রকাশ করছি না।’

এদিকে নামের মিলের কারণে আবদুল শুক্কুরকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর এ অভিযোগটি নিয়ে গত বছর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ঘটনাস্থল ঘুরে এসে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ওই প্রতিবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইকরাম উজ্জামানের বক্তব্য হিসেবে ছাপা হয়, ‘সেলিমের ঘরের পেছন থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়েছে প্রাথমিক তদন্তে এমনটি জানা গেছে। মামলাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। সেলিমকে কেন আসামি করা হয়নি কিংবা শুক্কুর কিভাবে আসামি হলো সবকিছু তদন্তে বেরিয়ে আসবে। এজাহারে আসামি করা হলেও নির্দোষ কোনো ব্যক্তিকে তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত করা হবে না।’

এ বক্তব্যের পরও এজাহারের সঙ্গে মিল রেখে গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্কুরের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়ে গেছেন এসআই মো. ইকরাম উজ্জামান। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইয়াবা উদ্ধারের সময় আবদুল শুক্কুরসহ আরও দুই আসামি পালিয়ে যান।’ এভাবে চার্জশিট তৈরি করার জন্য স্থানীয় চৌকিদার আবদুল শুক্কুরকে চাপ দিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মিথ্যা জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মাদক মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. ইকরাম উজ্জামান বর্তমানে আনোয়ারা থানায় কর্মরত নেই। মুঠোফোনে যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই ইকরাম উজ্জামান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আসামি তো বাঁচার জন্য কত কথা বলবে। তদন্ত করে যা পেয়েছি, তাই লিখেছি।’

আসামি শুক্কুর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন- এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কী পেয়েছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ইয়াবাগুলো জব্দ করেছে কোস্টগার্ড। আমি তদন্তে যা পেয়েছি, তাই চার্জশিটে লিখেছি।’

মামলার বাদী কোস্টগার্ড সাঙ্গু স্টেশনের পেটি অফিসার প্রবীর কুমার রায় একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘শুক্কুর আমাদের কাছে এসে বিষয়টি জানিয়েছেন। যে ঘরের পেছন থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়েছে সেই ঘরে কোনো লোকজন ছিল না। আমরা ওখানে কাউকে চিনি না। উপস্থিত সাক্ষীদের কাছ থেকে জেনে এজাহারে নাম দিয়েছি। বাকিগুলো তদন্তকারী কর্মকর্তার কাজ।’

এদিকে যে স্থান থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে, সেখান একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে মৃত আবদুল শুক্কুরের ছেলে সেলিমের ঘরে অভিযান চালায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা। তখন তার ঘরের পেছন থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পাশের ঘরের সরোয়ার আলম ও সেলিম একই চক্রের সদস্য। ঘটনার পর থেকে তারা দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। তালাবদ্ধ ছিল সেলিমের ঘর।

স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সরোয়ারের ঘর থেকে এক লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। এছাড়া নিরীহ শুক্কুরকে যে মামলায় আসামি করা হয়েছে, ওই মামলাটিতেও এক নম্বর আসামি সরোয়ার। মৃত সুলতান আহম্মদের ছেলে শুক্কুরের ঘরের পেছনে ইয়াবা উদ্ধারের কোনো ঘটনা ঘটেনি; তার ঘর ঘটনাস্থল থেকে দুই কিলোমিটার দূরে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. হুমায়ুন কবির একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আনোয়ারায় আমার দায়িত্ব নেয়ার আগে শুক্কুরের মামলাটিতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত নই। এ বিষয়ে খোঁজখবর নেব।’