শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮

মিতু হত্যা: বাবুল আক্তার ৫ দিনের রিমান্ডে

প্রকাশিতঃ বুধবার, মে ১২, ২০২১, ৩:৩৪ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

আজ বুধবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম সরোয়ার জাহানের আদালত এই আদেশ দিয়েছেন।

এর আগে আজ বুধবার দুপুরে নগরের পাঁচলাইশ থানায় মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনের দায়ের করা মামলায় বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ।

পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভুঁইয়া জানান, ৮ জনের বিরুদ্ধে যে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে সেখানে হত্যার কারণ হিসেবে পরকীয়া সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। দণ্ডবিধির ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবিরুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বাকি আসামিরা হলেন- মো. কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসা (৪০), এহতেশামুল হক ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলাইয়া (৪১), মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম (২৭), মো. আনোয়ার হোসেন (২৮), মো. খায়রুল ইসলম ওরফে কালু (২৮), সাইদুল ইসলাম সিকদার (৪৫) ও শাহজাহান মিয়া (২৮)।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, মিতু হত্যার পর সিসিটিভি ফুটেজের ছবি বাবুল আক্তারকে দেখানো হয়। তখন তিনি হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসাকে তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও পারিবারিকভাবে পরিচিত সোর্স হওয়া সত্ত্বেও সুকৌশলে তাকে শনাক্ত না করে জঙ্গীদের দ্বারা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করে। উক্ত মামলাটি তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার বাদী বাবুল আক্তারসহ তদন্তে প্রাপ্ত ৮ আসামির সবাইকে মিতু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পান।

হত্যার কারণ তুলে ধরে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বাবুল আক্তার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কক্সবাজার জেলায় চাকুরি করাকালীন ইউএনএইচসিআরের ফিল্ড অফিসার (প্রোটেকশন) গায়ত্রী অমর শিং এর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এতে আমার মেয়ের পরিবারে চরম অশান্তি দেখা দেয়। বাবুল আক্তার পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ায় প্রতিবাদ করলে আমার মেয়ে মিতুকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে।

২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাবুল আক্তার সুদানে মিশনে কর্মরত থাকাকালীন তার ব্যবহার করা মোবাইল নম্বর চট্টগ্রামের বাসায় রেখে গেলে গায়ত্রী ওই নাম্বারে বিভিন্ন সময় ২৯ বার বিভিন্ন ম্যাসেজ দেন। এই ম্যাসেজগুলো আমার মেয়ে মিতু তার একটি খাতায় নিজ হাতে লিখে রাখে।

সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কয়েকমাস আগে বাবুল আক্তার চায়নাতে ট্রেনিংয়ে গেলে আমার মেয়ে গায়ত্রীর উপহার দেয়া ‘তালেবান’ ও বেস্ট কিপ্ট সিক্রেট’ নামক দুটি বই খুঁজে পায়। উক্ত দুটি বইয়ের তালেবান নামক বইয়ের তৃতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, “05/10/13, Coxs Bazar, Bangladesh.” hope the memory of m offering you this personal gift, shall eterrnalizeour wonderful bond, love you, Gaitree.”

একই বইয়ের শেষ পৃষ্টা ২৭৬ এর পরের পাতায় বাবুল আক্তারের নিজের হাতে ইংরেজিতে গায়ত্রীর সাথে সাক্ষাতের কথা লেখা আছে। তিনি লিখেছেন, “First meet: 11 sept, 2013, First PR in Cox. 07 oct 2013. G Birth Day, 10 Octobar, First kissed 05, Oct 2013; First beach walk: 8th Oct 2013, 11 Oct 2013, Marmaid with family, 12 oct 2013, Temple Ramu prayed togather, 13 oct 2013; Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk.

এছাড়া বেস্ট কিপ্ট সিক্রেট নামক বইয়ের প্রথম দিকের দ্বিতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, “5/10/2013 with my sincere Love” Yours Gaitree.

এজাহারের শেষের দিকে আরও লেখা হয়েছে, উল্রেখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে উভয়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি চরমে পৌঁছে। বাবুল আক্তারের এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে আমার মেয়ে মিতু প্রতিবাদ করলে তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের বিষয়টি আমার মেয়ে মিতু আমাদেরকে জানায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, আমার মেয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার বাদী বাবুল আক্তারসহ ৮ আসামি জড়িত আছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তার তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়ায় উক্ত মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এমতাবস্থায় আমার মেয়ে মিতু হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের নিমিত্তে ৮ বিবাদীর বিরুদ্ধে আমি নিজে এজাহার দায়ের করলাম।

এর আগে আজ সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি, তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি মহোদয়কে বিষয়টি জানালে ওনারা বলেছেন, তদন্তে যা আসবে, তাই করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমরা তাই করছি। নড়াইল ও ঢাকা থেকে তার দুই বন্ধুকে আটক করে তাদের জবানবন্দি নেয়া হয়েছে।

পিবিআই প্রধান বলেন, আগে করা মিতু হত্যা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হচ্ছে। কারণ এই মামলার ডকেটে কোথাও বাবুল আক্তারের বিষয়ে কিছুই নেই। তাই নতুন করে হত্যা মামলা হবে। এই মামলায় বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার (১১ মে) সকালে চট্টগ্রাম নগরীর ডিটি রোডে পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ে যান বাবুল আক্তার। সেখানে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

এর আগে গতকাল পিবিআইয়ের ঢাকা অফিসে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন কর্মকর্তারা। মোশাররফ হোসেন মেয়ে হত্যার জন্য বাবুল আক্তারকে দায়ী করে আসছিলেন।

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে ২০১৬ সালের ৫ মে চট্টগ্রাম নগরের জিইসিতে তাদের বাসার কাছে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন বাবুল আক্তার। এরপর চট্টগ্রামের ডিবি পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। ২০১৬ সালের ২৪ জুন বাবুল আক্তারকে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে এনে প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হয়।

এর ফলে বাবুলের দিকে সন্দেহের তীর যায়। হত্যায় বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাবুল আক্তার স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন।

এদিকে প্রায় তিন বছর তদন্ত করেও অভিযোগপত্র দিতে ব্যর্থ হয় ডিবি পুলিশ। পরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত মামলাটির তদন্তের ভার পিবিআইকে দেয়।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা দমনে অভিযানের জন্য আলোচিত ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার।