গায়ত্রীকে আইনের আওতায় আনতে ইউএনএইচসিআর এ পুলিশের চিঠি

মোহাম্মদ রফিক : মিতু হত্যা মামলায় বাবুল আখতারের কথিত প্রেমিকা ভারতীয় নাগরিক গায়ত্রী অমর সিংকেও জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনে আইনের আওতায় আনার কথা ভাবছে পুলিশ।

এক্ষেত্রে সহযোগিতা চেয়ে গত রোববার (২৩ মে) ঢাকা এবং কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান বরাবর চিঠি দিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে বৃহস্পতিবার (২৭ মে) পর্যন্ত ইউএনএইচসিআর থেকে এব্যাপারে কোনো সাড়া মেলেনি বলে একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই মেট্রোর পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা।

জানা গেছে, গায়ত্রী জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক ইউএনএইচসিআর প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে প্রতিরোধ শাখার একজন কর্মকর্তা হিসেবে কক্সবাজারে কর্মরত ছিলেন। ওই সময়ে (২০১৩ সাল) বাবুল আক্তার কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

পিবিআই মেট্রো’র পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা জানান, বাবুল আকতারকে কথিত প্রেমিকা গায়ত্রীর দেওয়া বই দুটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোর জন্য শিগগির আদালতে আবেদন করা হবে। পাশাপাশি বাবুল আক্তারের দুই সন্তানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

মিতু হত্যার নতুন মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কর্মরত থাকার সময় ২০১৩ সালে ইউএনসিসিআর এর কর্মী গায়ত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গে পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়েন বাবুল। এ নিয়ে বাবুলের সঙ্গে মিতুর দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। মিতুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন বাবুল। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিমিশনে সুদানে ছিলেন বাবুল আক্তার। এসময় বাবুল আক্তারের মোবাইল ফোনটি চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের বাসায় ছিল। ওই মোবাইল ফোনে ২৯ বার ‘ম্যাসেজ’ দেন গায়ত্রী অমর শিং।

বাবুল আকতারকে কথিত প্রেমিকা গায়ত্রীর দেওয়া বই দুটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোর জন্য শিগগির আদালতে আবেদন করা হবে। পাশাপাশি বাবুল আক্তারের দুই সন্তানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সর্বশেষ মিতু হত্যার কয়েকমাস আগে বাবুল একটি ট্রেনিংয়ে থাকা অবস্থায় গায়ত্রী তার বাসায় দুটি বই উপহার পাঠান। বই দুটির নাম- ‘তালিবান’ ও ‘বেস্ট কেপ্ট সিক্রেট’। তালিবান বইটির ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় গায়ত্রী নিজ হাতে একটি বার্তা লিখে দেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমাদের ভালো স্মৃতিগুলো অটুট রাখতে তোমার জন্য এই উপহার। আশা করি এই উপহার আমাদের বন্ধনকে চিরস্থায়ী করবে। ভালোবাসি তোমাকে। ’

ব্যক্তিগত জীবনে গায়ত্রী বিবাহিত এবং তার একটি ছেলে রয়েছে। বর্তমানে সুইজারল্যান্ড বা পূর্ব আফ্রিকার কোনো দেশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা-ইউএনএইচসিআরের প্রটেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত গায়ত্রী। তবে তার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত নয় পুলিশ।

স্ত্রী মিতুকে হত্যার অভিযোগে বাবুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে গত ১২ মে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করা হয়। মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। সেদিনই বাবুল আক্তারকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর মোশাররফ হোসেনের মামলায় তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার কথা বললেও পরে জবানবন্দি দেননি বাবুল আক্তার।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন বাবুল আক্তারের পরিকল্পনাতেই মিতু খুনের ঘটনা ঘটেছিল। এটি ছিল একটি ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’। সম্প্রতি, আদালতে সাইফুল হক ও মোকলেসুর রহমান ইরাদ নামে দুজনের দেওয়া জবানবন্দিতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ইরাদ বাবুল আক্তারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল হকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাইফুল হকের সাথে বাবুল আক্তারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। পাবনায় তাদের ‘মাল্টি লেয়ার প্রিন্ট এন্ড প্যাড’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ইরাদ পাবনার বাসিন্দা এবং সাইফুল হকের স্টাফ।

জানা গেছে, মিতু হত্যাকা-ের পর টাকা লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পরই পিবিআই নিশ্চিত হয়, মিতুকে খুনের জন্যই তিন লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আর বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় এটি ছিল ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’। মূলত বাবুল আক্তারই টাকা পাঠানোর জন্য সাইফুলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাইফুল ও মামুনের জবানবন্দির পরই মিতু হত্যায় তার স্বামী বাবুল আক্তার জড়িত থাকার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হয় পিবিআই।

কীভাবে ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’?- এর বর্ণনা দিয়ে পিবিআই জানায়, মিতু খুনের পাঁচদিন পর ‘কিলিং মিশনের প্রধান’ অভিযুক্ত মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুছার দেওয়া বিকাশ নম্বরে তিন লাখ টাকা পাঠানোর কথা জবানবন্দিতে স্বীকার করেন মোকলেসুর রহমান ইরাদ। গত ২৫ মে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মো. শফী উদ্দিনের আদালতে এ জবানবন্দি দেন মোকলেসুর রহমান ইরাদ।

জানা গেছে, গত ১১ মে বাবুল আক্তারের ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল হক এবং গাজী আল মামুন নামে দুইজন মিতু হত্যায় দায়ের হওয়া আগের মামলায় আদালতে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে সাইফুল হক জানান, মিতু হত্যার তিনদিন পর তিনি বাবুল আক্তারের নির্দেশে গাজী আল মামুনের মাধ্যমে মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসার কাছে তিন লাখ টাকা পাঠান। গাজী আল মামুন বাবুল আক্তারের সোর্স মুছার ভাগ্নি জামাই। মামুনও জবানবন্দি দিয়ে ৩ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেন।

সাইফুল মুছার আত্মীয় গাজী আল মামুনের মাধ্যমে এ বিষয়ে মুছার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিকাশের মাধ্যমে ওই টাকা লেনদেন হয়। বিকাশে লেনদেনের স্লিপ উদ্ধারও করেছে বলে জানিয়েছেন পিবিআই, চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরের জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় সড়কে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদরদফতরে যোগ দিতে ও ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বাবুল। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। হত্যাকা-ের পর নগরের পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন বাবুল। তবে পুলিশে তদন্তে তার সম্পৃক্ততার গুঞ্জন ছিল আগে থেকেই।