রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

জন্মনিবন্ধনের নতুন নিয়ম, বিপাকে হাজারও অভিভাবক

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুন ১৮, ২০২১, ১০:০২ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ রফিক : স্কুলপড়ুয়া সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ পেতে চরম বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রামের হাজারও অভিভাবক। ২০০১ সাল এবং এর পরে জন্ম নেওয়া সন্তানের জন্মনিবন্ধনের জন্য তাদের বাবা-মায়ের জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন সনদ পেতে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে নতুন নিয়ম চালু করেছে সরকার। নিয়ম অনুযায়ী, সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ পেতে আগে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন করতে হবে। যদিও এর আগে মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়েই যে কারও জন্মনিবন্ধন করা যেত।

বাচ্চার জন্ম নিবন্ধন করাতে গিয়ে বিপাকে পড়ার কথা জানিয়ে নগরের ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, ‘ছেলের জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য ওয়ার্ড অফিসে গেলে আমার জন্মনিবন্ধন চায় তারা। আমার জন্মনিবন্ধনের জন্য যখন আবেদন করছি, তখন আমার বাবা-মার জন্মনিবন্ধন নম্বর চায়। এছাড়া আবেদন নিচ্ছেই না। আমার বাবা-মা মারা গেছেন ১০ বছর আগে, তাদের তো জন্মনিবন্ধন নাই।’

ভুক্তভোগীরা একদিকে জন্মনিবন্ধনের নতুন নিয়মের গ্যাড়াকলে পড়েছেন, অন্যদিকে ভুলেভরা জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট অফিসে দিনের পর দিন ঘুরেও সেই জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে পারছেন না।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় দেশের নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম করে থাকে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে- ভোগান্তি নয়, জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুনিবন্ধনে শৃঙ্খলার জন্যই এমন নিয়ম করা হয়েছে।

জন্মনিবন্ধনের ভোগান্তির বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল মানিক লাল বণিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘২০০১ সাল এবং তার পর থেকে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্ম সনদ পেতে হলে আগে তার মা-বাবার জন্মনিবন্ধন করতে হবে। ২০০১ সালের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিলেই হয়।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘পাসপোর্ট করা, বিবাহ নিবন্ধন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, জমি রেজিস্ট্রেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজের জন্য জন্মসনদ প্রয়োজন। এজন্য নিবন্ধনের আবেদনে কিছু বিষয় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার।’

জানা গেছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী ২০০১ সাল এবং তার পরে জন্ম নেওয়া শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হলে তাতে মা-বাবার জন্ম নিবন্ধনের নম্বর দিতে হয়। এ কারণে বর্তমানে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য মা-বাবার জন্ম নিবন্ধন থাকাটা আবশ্যক।
মেয়েকে স্কুলে ভর্তি নিয়ে বিপাকে পড়া চসিক ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার জন্মনিবন্ধন বাংলায়, আর স্ত্রীরটা ইংরেজিতে। একারণে আবেদন করতে পারছি না। নতুন নিয়মে মহাবিপদে পড়েছি। বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করব কেমনে।’

ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে জন্ম নিবন্ধনের জন্য বিপাকে পড়েছেন চকবাজার সিএনজি অটোরিকশা চালক আহমেদ আলী। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘স্কুলে ভর্তির জন্য গতকাল ছেলের জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়েছি ওয়ার্ড অফিসে। সেখান থেকে বলা হচ্ছে, বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন সনদ লাগবে। আমরা দুজনের জন্মনিবন্ধন নেই। ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। কীভাবে কী করব বুঝতে পারছি না।’

এদিকে উপবৃত্তি পেতে শিক্ষার্থীদের জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। তাই অনেক শিশুর বাবা-মা ওয়ার্ড অফিসে গিয়ে নিজেদের জন্মসনদ না থাকায় কষ্টে পড়েছেন। পাচ্ছেন না সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ।

পেশাগত দক্ষতার অভাব ও উদাসীনতার কারণে চট্টগ্রামের অন্তত ৬০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধনে ভুল তথ্য থাকার অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর নাম, বয়স ও বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে জন্মসনদে থাকা তথ্যের মিল নেই।

জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে মা-বাবারা ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শহীদুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভুলেভরা জাতীয় পরিচয়পত্রের কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের জন্মনিবন্ধন করতে পারছেন না। সন্তানের উপবৃত্তির জন্য বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। গতকাল আমার অফিসের দুই কর্মচারী সিটি করপোরেশন অফিসে গিয়ে জন্মনিবন্ধন না করে ফেরত এসেছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের জন্মনিবন্ধন নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ার কথা আমরাও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’

সূত্রটি জানায়, চলতি বছর চট্টগ্রামের অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীর তথ্য যাচাইকালে তাদের জন্মনিবন্ধনে ভুলের ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে। ফলে জেএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণ করতে গিয়ে অনেক অভিভাবক বিপাকে পড়েছেন।

জানা গেছে, অনলাইনে ডাটাবেজ তৈরির জন্য ইউনিয়ন ও পৌরসভা এবং চসিকের ওয়ার্ডে আলাদা কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কম্পিপউটার অপারেটরদের অদক্ষতা ও গাফিলতির কারণে ভুল তথ্যে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এর খেসারত দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

ভুক্তভোগী হালিশহর এলাকার আবদুল কাদের জানান, জন্মসনদ অনুযায়ী তার ভাগ্নির বাবার নাম ‘মহিম উদ্দিন’। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে এসেছে ‘মোহা উদ্দিন’। তার ভাতিজির জন্মসনদে মায়ের নাম শাহেদা, কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে এসেছে ‘সাজেদা’।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শহীদুল ইসলাম বলেন, শিশুর ভর্তির সময় অভিভাবকরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ডাক নাম ব্যবহার করেন। কিন্তু আইডি কার্ডে তাদের পুরো নাম রয়েছে। আইডি কার্ডের সঙ্গে শিশুর জন্মসনদের মিল নেই। যাচাইকালে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্মসনদে এসব ভুল ধরা পড়েছে।’

এদিকে ইউনিয়ন অফিস বা চসিক’র ওয়ার্ডগুলোয় ইস্যু করা ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ ভুলেভরা হলেও এ ভুলের দায় কেউ নিচ্ছেন না। আবার সমাধানের পথও দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, নিজেদের ও সন্তানের জন্য ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদপত্র সংগ্রহ করতে পৌরসভা, ইউনিয়ন কার্যালয় ও চসিকের ওয়ার্ড অফিসে ভিড় করছেন অনেক নারী পুরুষ। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও সার্ভারে ত্রুটির কারণে একদিকে জন্মনিবন্ধন সনদ সরবরাহে বিঘœ ঘটছে, অন্যদিকে যে কয়টি জন্মনিবন্ধন সনদ দিতে পারছেন, তাতেও ভুলেভরা। কারো কারো ক্ষেত্রে জন্মতারিখ, নারীর ক্ষেত্রে পুরুষ, পুরুষের ক্ষেত্রে নারীর নাম, কারো বাবার চেয়ে ছেলের বয়স বেশি, আবার জন্মনিবন্ধন নম্বরে ১৭টি ডিজিট থাকার কথা থাকলেও কোনো ক্ষেত্রে ১৩, ১৪ ও ১৫ টি কোড রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জন্মনিবন্ধন সনদের ভুল সংশোধনের এখতিয়ার তাদের নেই। অনেকে সংশোধনী ফরম পূরণ করে ই-মেইলে বা ডাকযোগে পাঠাচ্ছে জন্মনিবন্ধন কার্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক বরাবর। কিন্তু এসব সংশোধনী কতদিনে সম্পন্ন হবে তার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন না কেউ।

গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে নিজের জন্মনিবন্ধন সনদে ভুল ধরা পড়ে সীতাকু- উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা ইমরুল হোসেনের। তিনি বলেন, ‘জন্মনিবন্ধন সনদে ভুল থাকায় তিনি ভোটার হতে পারেননি। ভুলেভরা সেই সনদ সংশোধন করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা তাকে জানান, ওই ভুল সংশোধনের এখতিয়ার তাদের নেই।’

চসিকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধন ফরম পূরণের সময় অদক্ষ তথ্য সংগ্রহকারীদের অস্পষ্ট লেখা, ইংরেজি বানানে ভুল এবং কম্পিউটারে সংযোজন করার সময় ভুলের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
জানা গেছে, পিএসসি, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, দাখিল, এইচএসসি ও আলিমে পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীও জন্মনিবন্ধন সনদে ভুল থাকার কারণে চরম বেকায়দায় পড়েছে। কিন্তু এর দায় নিচ্ছেন না কেউ।