রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

গ্রাম-আদালতে বিধবা নারীকে মারধর, অপমানে আত্মহত্যার চেষ্টা!

প্রকাশিতঃ ২৫ জুন ২০২১ | ১:০৪ অপরাহ্ন

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি : সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছিলেন অসহায় ও হতদরিদ্র নারী খাদিজা বেগম। আসলের চেয়ে বেশি টাকা সুদ পরিশোধ করেও সুদি কারবারীর জাল থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছিলেন না তিনি। বারবার মিনতি করার পরও রেহাই মিলছিল না। অবশেষে ইউনিয়ন পরিষদের সালিশের মুখোমুখি হতে হয় খাদিজা বেগমকে।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) বিকালে সালিশের মুখোমুখি হয়ে ইউনিয়ন পরিষদেই হেনস্তা ও মারধরের শিকার হন দুই কন্যা সন্তানের জননী গৃহপরিচারিকা খাদিজা বেগম। চেয়ারম্যান ও নারী ইউপি সদস্যের নির্দেশে গ্রাম পুলিশরা তাকে মারধর করে কোমরে ও পিঠে গুরুতর জখম করে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, মারধরের পর অপমান সইতে না পেরে সীতাকুণ্ড বাজারের দক্ষিণ বাইপাস এলাকায় গাড়িতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যান খাদিজা। কিন্তু ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে নিবৃত্ত করেন। পরে কেঁদে কেঁদে নিজের উপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন খাদিজা।

খাদিজা অভিযোগ করে বলেন , দীর্ঘদিন ধরে তারা সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড নামার বাজার এলাকায় ইতালি কামালের ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন। কয়েক বছর আগে খাদিজা বেগমের স্বামী দুলাল মারা যান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে দুই মেয়ে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তিনি। জীবিকার তাগিদে কাজ নেন অন্যের বাড়িতে। কিন্তু মহামারী করোনার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সন্তানদের নিয়ে অনাহারে দিন কাটতে থাকে তাদের।

ক্ষুধার জালা সইতে না পেরে গত বছর একই এলাকার সাহাবউদ্দিন থেকে চড়া সুদে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন খাদিজা। একসময় বিয়ে বাড়িতে সামান্য মজুরির কাজ নিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সাহাবউদ্দিনকে মোট ২৬ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তুু কিছুতেই সাহাবউদ্দিনের সুদের জাল থেকে রেহাই পাচ্ছিলেন না তিনি। দিনের পর দিন সাহাবউদ্দিনের টাকার জন্য চাপ বাড়তে থাকে।

পরে সাহাবউদ্দিন সুদের টাকা উদ্ধারে বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজীর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। চেয়ারম্যানের নোটিশ পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে খাদিজা পরিষদে হাজির হলে চেয়ারম্যান টাকা পরিশোধ করার জন্য নির্দেশ দেন। টাকা দিতে সময় লাগবে বললে চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। পরে তার নির্দেশে নারী ইউপি সদস্য হাছিনা, চৌকিদার আমিন ও আবুল মুনছুর সন্তানদের সামনে লাঠি দিয়ে খাদিজাকে প্রহার করতে থাকে এবং কিল-ঘুষি মেরে মারাত্মক জখম করে। পরে স্থানীয়রা খাদিজাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সন্তানের সামনে মারধর ও অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি।

এদিকে খাদিজার আহাজারির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে চারদিকে সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় ওঠে।

তবে খাদিজাকে নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেন ৫ নং বাড়বকুণ্ড ইউপি চেয়ারম্যান ছাদাকাত উল্লাহ মিয়াজী; তিনি বলেন, আমি খাদিজার কাছে সাহাবউদ্দিনের পাওনা টাকা না দেওয়ার বিষয়টি তার মেয়ের কাছে জানতে চাই। মেয়ে ওই টাকা তার মা অন্যত্র সুদে লাগানোর কথা বললে খাদিজা গ্রাম আদালতে সবার সামনে নিজের মেয়েকে গলা চেপে ধরে। পরে তার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য নারী ইউপি সদস্য হাছিনা ও গ্রাম পুলিশরা ছুটে গেলে খাদিজা তাদেরকেও মারধর শুরু করে। এক পর্যায়এ খাদিজার প্রেশারের সমস্যা দেখা দিলে তাকে একজন ইউপি সদস্য ও কয়েকজন গ্রাম পুলিশ দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন বণিক একুশে পত্রিকাকে জানান, এ ঘটনায় খাদিজা বেগম মারধরের অভিযোগ এনে ৩ জনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। পরবর্তীতে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য হাছিনা। দুটি অভিযোগই আমরা খতিয়ে দেখছি।