জামিন পেয়েও কারাগারে থাকছেন রাঙ্গুনিয়ার সিরাজ খাতুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : আদালত থেকে জামিন পেয়েও উপজেলা চেয়ারম্যান স্বাক্ষর না করায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না রোহিঙ্গা যুবকের বৈবাহিক প্রতারণার শিকার রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা সিরাজ খাতুন (৩৩)। দুগ্ধপোষ্য ৯ মাসের শিশুকে নিয়ে গত ২০ দিন ধরে কারাগারে দিন কাটছে এ নারীর। গত ১৬ জুন সিরাজ খাতুনকে জামিন দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৬ষ্ঠ আদালতের বিচারক মেহনাজ রহমান।

বিনাখরচে এই নারীকে আইনি সহায়তা দিচ্ছে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইট ফাউন্ডেশন বিএইচআরএফ। মানবাধিকার আইনজীবী এডভোকেট এ এম জিয়া হাবীব আহসান জানান, জামিননামায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বার স্বাক্ষর করলেও উপজেলা চেয়ারম্যান স্বজন কুমার তালুকদার স্বাক্ষর করতে সম্মত না হওয়ায় জামিন পাওয়ার ৮ দিন পরেও কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না অসহায় সিরাজ খাতুন ও তার দুগ্ধপোষ্য ৯ মাসের শিশুটি।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা যুবকের বৈবাহিক প্রতারণার শিকার হয়ে গত ২০ দিন ধরে কারাবন্দী সিরাজ খাতুন (৩৩)। গত ১৬ জুন স্থানীয় এমপি ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের জিম্মায় সিরাজ খাতুনের জামিন মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম শফি উদ্দিনের আদালত। কিন্তু সংসদ অধিবেশনে অংশ নেওয়ায় সিরাজ খাতুনের জামিননামায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে বিষয়টি অবহিত করলে আদালত সিরাজ খাতুনের জামিনের শর্ত পরিবর্তন করে স্থানীয় এমপির স্থলে উপজেলা চেয়ারম্যান স্বজন কুমার তালুকদারের জিম্মায় জামিননামা দাখিলের নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহনাজ রহমান।

‘কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান জামিননামায় স্বাক্ষর করতে নানা টালবাহানা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। জামিননামায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার স্বাক্ষর করলেও উপজেলা চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করতে নারাজ। স্বাক্ষর পাওয়া গেলে অসহায় নারীটি তার শিশু সন্তান নিয়ে কারাগার থেকে আজই মুক্তি পেতেন।’ বলেন জিয়া হাবীব আহসান।

জামিননামায় সাক্ষর না প্রসঙ্গে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান স্বজন কুমার তালুকদার শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জামিননামায় আমাকে সাক্ষর করার জন্য আদালত থেকে বলা হলে আমি অবশ্যই করব। কিন্তু একজন আইনজীবীর কথায় তো আমি সই করতে পারি না। তাদেরকে (আইনজীবী) বলুন আমাকে আদালতের নির্দেশনা দেখাতে।’

জানা গেছে, ১০ বছর আগে ভালোবেসে রোহিঙ্গা যুবক সিদ্দিকের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন সিরাজ খাতুন। কিন্তু যখন স্বামীর আসল পরিচয় জানতে পারেন, ততদিনে পানি গড়িয়েছে অনেক দূর। পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন নানা জায়গায়। একপর্যায়ে ঠাঁই হয় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে পড়লে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে সিরাজ খাতুন ছুটে আসেন গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার পদুয়ায়। রোহিঙ্গা যুবকের প্রতারণার খবর শুনে হতবাক সিরাজ খাতুনের পরিবার।

এরপর জীবিকার তাগিদে সন্তানসহ সিরাজ খাতুনকে ওমান পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে তার পরিবার। পাসপোর্ট বানাতে গত ৩ জুন যান চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানাধীন মনসুরাবাদ অফিসে। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়েন সিরাজ খাতুন। মিল ছিল না নামের। তার ফিঙ্গার প্রিন্টে দেখা যায়, তিনি একজন “রোহিঙ্গা”। গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সিরাজ খাতুন।

আদালত সূত্র জানায়, ১০ বছর আগে রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়া এলাকায় একটি মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত ছিলেন রোহিঙ্গা যুবক সিদ্দিকী। পাশাপাশি অন্যের ফসলি জমিতে কাজ করতেন তিনি। এক সময় সিরাজ খাতুনের সাথে পরিচয় হয় তার। প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। নানা জায়গায় ঘুরেও যেন স্থির হতে পারছিলেন না তারা। একপর্যায়ে আটক হন পুলিশের কাছে। পুলিশ তাদের পাঠিয়ে দেয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

সেখানে নতুন করে পথচলা শুরু করেন দুজনে। এর মধ্যে ত্রাণের আশায় সিরাজ খাতুনকে রোহিঙ্গা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। পালিয়ে বিয়ে করার পরপরই সিরাজ খাতুন জানতে পারেন তার স্বামী একজন রোহিঙ্গা। কিন্তু তখন তার আর কিছু করার ছিল না। ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে যায় সিদ্দীক। এরপর থেকে সিরাজ খাতুন তার ২ সন্তানকে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অসহায় হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে তাকে ছুটে আসতে হয় রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়ার সেই গ্রামে।

জানা গেছে, সিরাজ খাতুনের প্রকৃত বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়া এলাকার পূর্ব খুরুশিয়া গ্রামে। বাবার নাম মৃত নুর আলম।