৬ দিনের নবজাতক কোলে জেলখানার অদূরে ঠাই দাঁড়িয়ে রুমা!

আবছার রাফি : ভালোবাসাবাসির জন্যে অনন্তকালের প্রয়োজন নেই, একটি মুহূর্তই যথেষ্ট’- বলেছিলেন কিংবদন্তি লেখক হূমায়ুন আহমেদ। সেরকম কোনো ‘একটি মুহূর্তেই’ দু’বছর আগে হৃদয়ের টানে শহীদুল ইসলাম মনা ও রুমা আকতারের মাঝে গড়ে উঠে প্রেম, সময়ের আবর্তনে তা পরিণত হয় পরিণয়ে।

প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় অর্থবৈভবই সুখ-সফলতার মাপকাঠি। কিন্তু রিক্সাচালক শীহদুল ইসলাম মনার এমন অর্থবৈভব না থাকলেও ক্ষুদ্র উপার্জনে যথারীতি সুখ-শান্তির কমতি ছিলো না এই দম্পতির। দুটো মন যেখানে এক সামিয়ানার নিচে একাকার, সেখানে অবশ্যই অর্থবৈভব গৌণ বিষয়। এমনিভাবেই দুজনের প্রেমানুরাগ-হৃদ্যতাপূর্ণ মেলবন্ধনে কেটে যায় দুটি বছর।

হঠাৎই সেই সুখের সংসারে ছেদ পড়ে ছোট্ট একটি ঘটনায়। ঘটনার আকস্মিকতায় স্ত্রী রুমা এখন ৬ দিন বয়সী প্রথম কন্যা সন্তান নিয়ে চট্টগ্রাম জেল গেটের অদূরে অপলক নয়নে ঠাঁই দাঁড়িয়ে শুক্রবার সকাল থেকে।

শুক্রবার (২৫ জুন) বিকেলে এমন এক দৃশ্যের অবতারণা হয় শাহ আমানত (র.)- এর মাজারের সামনে দিয়ে যাওয়া জেল রোডের ফুটপাতে। সেখানে ২শ’ গজ এলাকাজুড়ে বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছে শতাধিক মানুষ। তাদেরই একজন শহীদুল ইসলাম মনার স্ত্রী রুমা আকতার। কোলে ৬ দিন বয়সের এক ফুটফুটে কন্যাশিশু। আগত মানুষজনের ভিড় ঠেলে দিকবিদিক ছুঁটছে রুমা। উদ্দেশ্য, এক পলক যেন তার কোলে থাকা কন্যাসন্তানকে কারাবন্দি স্বামী শহীদুল হক মনাকে দেখাতে পারেন।

অপরদিকে হয়তো জেলখানার বহুতল ভবনের জানালার ফাঁকে চিত্রার্পিত ভঙ্গিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন স্বামী শহীদুল। এদিকে নবজাতক কোলে কখনো বসে, কখনো দু’ হাতে উঁচু করে বাচ্চাটি দেখানোর নিরন্তর চেষ্টা, তাদের সুতীব্র আকর্ষণ দাগ কেটে যায় আশপাশে থাকা শ’খানেক মানুষের মনে।

সচরাচর কারো ঘরে সন্তান জন্ম নিলে স্বাস্থ্যহানির শঙ্কায় অন্তত ৪০ দিন পর্যন্ত জন্মদাত্রী মাকে ঘরে অবস্থান করতে হয়; জরুরি চিকিৎসা বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া কোনওভাবেই ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এতসব বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে জেলখানার সুউচ্চ-প্রাচীরবেষ্টিত সীমানাকে তুচ্ছ প্রমাণ করে দেওয়া রুমার এ কাণ্ড দেখে হতবাক অনেকেই। অবাক হয়, প্রেম থেকে পরিণয়ে জড়ানো এ সম্পর্কের অতল গভীরতা; প্রেমঘটিত গল্প সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হওয়ার ঘটনা বাস্তবে অনুধাবনে মতো ভালোবাসা-ভালোলাগার স্নিগ্ধ সমীরণে।

এ সময় কারাবন্দি স্বজনকে দেখতে আসা ফারুক হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘ সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হলেও আজকে বৃষ্টি নেই, পড়ছে তীব্র গরম। তার উপর এ রোডে যানজট লেগেই আছে। এমন হ য ব র ল অবস্থায় আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখছি, একেবারে ছোট্ট একটা বাচ্চাকে নিয়ে এই মহিলা অনেকক্ষণ ছুটোছুটি করছে এদিক-সেদিক। বিষয়টি দাগ কেটেছে অনেকের।

রুমা আকতার বলছেন, ‘করোনার কারণে কারাবন্দি স্বজনদের সাথে সাক্ষাতের উপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে জেল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে কারাবন্দী বাবাকে নবজাতক কন্যার মুখ দেখাতে এখানে সকাল থেকে অপেক্ষা করছি। আমার ৬ দিনের কন্যাকে তার বাবা দেখতে পাবে না, তা তো হতে পারে না; তাই বাচ্চাকে নিয়ে এসেছি। আমার মন মানছে না তাই ৪০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে এখানে চলে এসেছি। ‘২শ’ ৩শ’ গজ দূরত্বের চারতলা ভবন থেকে বাবা তার মেয়েকে আবছা দেখতে পেয়ে তাতেই খুশি বলে জানান রুমা।

জানা যায়, নগরীর জিইসি মোড়ের নার্সারী এলাকার এক কলোনিতে থাকেন শহীদুল ইসলাম মুনা (২৫)- রুমা আকতার (২০) দম্পতি। গত মাসে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে (বাওয়া) ঘটে যাওয়া চুরির ঘটনায় শহীদুল ইসলাম মনাকে গ্রেপ্তার করে চকবাজার থানা পুলিশ।

স্ত্রী রুমা আকতার একুশে পত্রিকাকে জানান, ‘ তার স্বামী চুরির ঘটনায় জড়িত নন, অন্য কেউ চুরি করে তার স্বামীকে ফাঁসিয়েছে। চকবাজার থানায় করা মামলায় তাঁর নাম নেই।’

কান্নাজড়ির কণ্ঠে রুমা বলেন, ‘ আমার স্বামী সংসারের বাতি, এ বাতি ছাড়া আমার ঘর এখন অন্ধকারে ভরা। আমার টাকা পয়সা নেই, তাই কিছু করতে পারছি না। করোনার এই দিনে খুব কষ্টে আছি। ঘরে নেই দানাপানি, নেই ওষুধ।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর মাহমুদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, বাওয়া স্কুলে ঘটে যাওয়া চুরির ঘটনায় কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শহিদুল ইসলাম মনাকে আমরা সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করেছি। তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।