বিভাগীয় মামলা: এখন থেকে পুলিশ ও নন-পুলিশের একই সাজা


মোহাম্মদ রফিক : একই অপরাধের দায়ে পুলিশ ও নন-পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের (মিনিস্ট্রিয়াল স্টাফ) দণ্ড প্রদানে বৈষম্য দূর করতে নতুন একটি গাইডলাইন তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজির আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ গাইডলাইন অনুমোদন হয়।

“ইকুয়ালিটি অব ট্রিটমেন্ট” নামে গাইডলাইন সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সেটির একটি কপি একুশে পত্রিকার হাতে এসেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা বৃদ্ধি ও দণ্ড আরোপে সমতা আনতে ওই গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। এখন থেকে বিভাগীয় মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ ও নন-পুলিশের একই সাজা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এডিশনাল ডিআইজি (ডিএন্ডপিএস-১) মো. রেজাউল হক স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পুলিশ ও নন-পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দণ্ড প্রদানে বৈষম্য দূরীকরণে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-সহ পুলিশ রেগুলেশনস ১৯৪৩ এর প্রবিধান ৮৫৭, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী গাইডলাইনটি তৈরি করা হয়েছে। এটি দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীতে বৈষম্য দূর করবে।

এতে আরও বলা হয়, প্রায়ই দেখা যায়-পুলিশ ও মিনিস্ট্রিয়াল স্টাফ কর্তৃক বিভাগীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি একই ধরণের অপরাধের জন্য পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কর্তৃক ভিন্ন ভিন্ন দণ্ড প্রদানে বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা ন্যায় বিচারের পরিপন্থি। এছাড়া একই ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক দণ্ড প্রদান পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য মোটেও কাম্য নয়।

ফলে একই প্রকৃতির অভিযোগে বিভিন্ন ইউনিট কর্তৃক ভিন্ন ভিন্ন দণ্ডারোপ সংক্রান্ত বৈষম্য দূরীকরণে “ইকুয়ালিটি অব ট্রিটমেন্ট” তথা দণ্ডারোপে সমতার লক্ষ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে।”

জানা গেছে, মামলা দায়ের, পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল, ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো, পেন্ডিং মামলায় চালান, অন্যায় আটকের জন্য উৎকোচ গ্রহণ, মাদক ব্যবসায়ী থেকে উৎকোচ গ্রহণ, পুলিশ ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের নামে টাকা আদায় এবং চাঁদাবাজি করলে, ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল নিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়ার অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, এএসআই, নায়েক ও কনস্টেবলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিধান আছে। এছাড়া একই অপরাধে চাকরি থেকে অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, পদাবনতিসহ নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার নিজের বিবেচনা বোধে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির আলোকে অন্য যে কোন সাজা দেয়া যায়। নতুন গাইডলাইনে সিভিল স্টাফকেও একই দণ্ড প্রদান করা হবে।

বিবাহবর্হিভূত সম্পর্ক, স্ত্রী সন্তানদের ভরণপোষণ না দেওয়া এবং যৌতুক দাবি করলে প্রথমবারের জন্য কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা বা সমমর্যাদাভুক্ত মিনিস্ট্রিরিয়াল কর্মকর্তা-কর্মচারী যে সাজা পাবেন তা হলো-
অনধিক এক মাসের বেতনভাতা কর্তন, নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা, এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ আর্থিক জরিমানা এবং বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার বিবেচনাবোধে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুয়ায়ী অন্য কোনো সাজা।

একই অপরাধে পুনরায় দণ্ডারোপের ক্ষেত্রে ইন্সপেক্টর বা সমমর্যাদাভুক্ত মিনিস্ট্রিয়াল কর্মকর্তাকে নিম্নপদে অবনমিতকরণ, এসআই, সার্জেন্ট ও এএসআই এর ক্ষেত্রে বিভাগীয় পর্যায়ে পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, চাকরি থেকে অপসারণ করা হবে। নায়েক, কনস্টেবল, সিভিল স্টাফ বা সমমর্যাদাভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও আলোচ্য সাজার (পদাবনতির সুযোগ নেই) মুখোমুখি হতে হবে।

জানা গেছে, মামলা তদন্তে, অনুসন্ধানে, ত্রুটি-বিচ্যুতি, গাফিলতি এবং এ সংক্রান্তে আদালত থেকে অর্ডারশিট প্রেরণ করলে ইন্সপেক্টর, এসআই, সার্জেন্ট ও এএসআই বা সমমর্যাদাভুক্ত কর্মকর্তাকে যেসব দণ্ড প্রদান করা হবে তা হলো- বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনমিতকরণ, পদাবনতি এবং বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার স্বীয় বিবেচনায় সাজা প্রদান করা হবে।

এছাড়া, থানায় আগত দর্শনার্থী বা ভুক্তভোগীর সাথে খারাপ আচরণ করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য ইন্সপেক্টর বা সমমর্যাদাভুক্ত কর্মকর্তাকে যে দণ্ড দেওয়া হবে তা হলো- তিরস্কার, বেতন গ্রেড কমানো, অনধিক একমাসের বেতনভাতা কর্তন করা হবে। একই ব্যক্তির একই অপরাধ দ্বিতীয়বার প্রমাণিত হলে বেতন গ্রেড অবনমিতকরণ, পদমর্যাদা বা গ্রেডের অবনমিতকরণের দণ্ড দেওয়া হবে।

প্রথমবার একই অপরাধ করলে এসআই, সার্জেন্ট ও এএসআইকে তিরস্কার/ব্লাকমার্ক, অনধিক এক মাসের বেতনভাতা কর্তন করা হবে। এসব ব্যক্তির দ্বিতীয়বার অপরাধ প্রমাণিত হলে-পদাবনতি (বিভাগীয়), ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করা হবে। নায়েক, কনস্টেবল, সিভিল স্টাফ কর্তৃক প্রথমবার অপরাধ করলে তিরস্কার/ব্লাকমার্ক, অনধিক এক মাসের বেতন ও ভাতা কর্তন করা হবে। দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে বেতন বৃদ্ধি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যথাসময়ে সঠিক ধারায় মামলা রুজু, আসামি গ্রেফতার, সুষ্ঠু তদন্ত বা অনুসন্ধান না করলে প্রথমবারের অপরাধের জন্য ইন্সপ্ক্টের বা সমমর্যাদাভুক্ত কর্মকর্তার বেতন গ্রেড নিম্নতর ধাপে অবনমিতকরণ, অনধিক এক মাসের বেতন ভাতা কর্তন করা হবে। দ্বিতীয়বারের অপরাধের জন্য নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ দণ্ড দেয়া হবে। প্রথমবার অপরাধের জন্য এসআই, সার্জেন্ট বা সমমর্যাদাভুক্ত কর্মকর্তাকে ব্লাকমার্ক, অনধিক এক মাসের বেতন ভাতা কর্তন। দ্বিতীয়বার অপরাধের জন্য পদাবনতি ও ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করার দণ্ড দেওয়া হবে।

এছাড়া পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের শর্তাবলী ভঙ্গ করে চাকরিতে যোগদান সংক্রান্ত অভিযোগে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্থ হলে ইন্সপেক্টর থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত বা সমমর্যাদাভুক্ত স্টাফকে চাকরি থেকে অপসারণ বা অব্যাহতি দেয়ার দণ্ড প্রদান করা হবে।

ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী বা পরকীয়ার অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্থ হলে আলোচ্য পুলিশ কর্মকর্তা, নায়েক, কনস্টেবল বা সমমর্যাদাভুক্ত সিভিল স্টাফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, চাকরি থেকে অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের দণ্ড দেওয়া হবে।

চাকরি দেয়ার নাম করে কারো সাথে প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ইন্সপেক্টর থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত বা সমমর্যাদাভুক্ত সিভিল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরি থেকে অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের দণ্ড প্রদান করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তা, সদস্য বা সিভিল স্টাফের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি বা মাদক ক্রয় বিক্রয়ে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে চাকরি থেকে বরখাস্ত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হবে।

বিভাগীয় পরীক্ষায় অনিয়ম করলে এসআই, সার্জেন্ট ও এএসআই বা সমমর্যাদাভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রথমবার তিরস্কার/ব্লাকমার্ক, অনধিক এক মাসের বেতন ভাতা কর্তন, অনুর্ধ এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানার দণ্ড প্রদান করা হবে। এছাড়া অন্য কোন অসদাচরণের জন্য আলোচ্য পুলিশ ও সিভিল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসরপ্রদান ও চাকরি থেকে অপসারণের দণ্ড দেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর আজ সোমবার একুশে পত্রিকাকে বলেন, “পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ ধরনের গাইডলাইন এখন পর্যন্ত আমার নজরে আসেনি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আমি খোঁজখবর নেব। জেনেছি, বিভাগীয় মামলায় পুলিশ বা নন-পুলিশের বিরুদ্ধে দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে গাইডলাইনটির মাধ্যমে সমতা ফিরে আসবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।”