
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : জাতির পিতা বা জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের নামে সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান করতে গেলে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। অনুমোদন ছাড়া নাম ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। অথচ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম যুক্ত করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন।
যদিও এ ধরনের সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা আছে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও। তারপরও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ‘বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ’ নামের এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মনির খানের ফেসবুক আইডিতে গিয়ে দেখা গেছে, অদ্ভুত সব পদের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন তিনি।
কর্মক্ষেত্রের পরিচিতি তুলে ধরে ফেসবুকে মনির খান লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধুকে কটুক্তিকারী তারেক জিয়ার মামলার বাদী।”-এই পদে চলতি বছরের ১৮ জুন থেকে এখনো কর্মরত আছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ঢাকা-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি পদপ্রার্থী- এই পদবীও তিনি ফেসবুকে যুক্ত করেছেন। কর্মক্ষেত্রের তথ্য তুলে ধরে ফেসবুকে মনির খান আরও লিখেছেন, “২০১৮ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের এমপি প্রার্থী হয়ে ঢাকা-২ আসনের মনোনয়ন কিনেছিলাম।”
মনির খান নিজেকে আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সদস্য পরিচয় দিয়েছেন ফেসবুকে; যদিও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেই উপ কমিটি এখনো অনুমোদন পায়নি। ফেসবুকে কর্মক্ষেত্রের তথ্য তুলে ধরে মনির খান আরও লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তি করে বক্তব্যের প্রতিবাদে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছি”, “আমি আল্লাহুর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি, আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন”, “আমি সাধারণ একজন মানুষ তাই সাধারণ জনগণের সাথে থাকতে বেশি ভালোবাসি”, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে চাই”
এছাড়া বাংলাদেশ সময় প্রতিদিন পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা, বাংলার রুপসী গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক পরিচালক, অটিজম বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস সোসাইটির চেয়ারম্যান, পোশাক মেলা ফ্যাশন হাউজ প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান, গ্লোবাল ৪১ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবেও ফেসবুকে পরিচয় দিয়েছেন মনির খান।

‘বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ’ নাম ব্যবহার করে মাঝে মধ্যেই নানা ইস্যুতে আলোচনা সভা করেন মনির খান এবং এসব অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাও যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম দিয়ে সংগঠন খোলার জন্য বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বা আওয়ামী লীগ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মনির খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন না, একটি পেশাজীবী সংগঠন। আওয়ামী লীগ পরিবারের সকল পেশাজীবিদের নিয়ে আমরা কাজ করি। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ড. মাহামুদুর রহমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মহাপরিচালক ছিলেন, সাবেক সচিব, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ অনেক অভিজ্ঞ লোক নিয়ে আমাদের এই সংগঠন। আর আমাদের সংগঠনে বিভিন্ন মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা নিজেদের স্বাক্ষরিত বাণীও দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সংগঠনের এখনো অনুমোদন হয়নি। যখন প্রধানমন্ত্রী মনে করবেন এই সংগঠনটি ভালো কাজ করছে তখন তিনি হয়তো খুশি হয়ে আমাদের অনুমোদন দিবেন। যেহেতু এই সংগঠন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন নয় তার এর অনুমোদন আওয়ামী লীগ দিবে না, দিবে বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট। তবে আমরা আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি, আশা করছি শীঘ্রই অনুমোদন পেয়ে যাবে।’
ফেসবুক আইডিতে কর্মক্ষেত্র লেখার অংশে “বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তিকারী তারেক জিয়ার মামলার বাদী।”-এসব তথ্য উল্লেখ করার বিষয়ে জানতে চাইলে মনির খান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তিকারী তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে আমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মামলা করেছিলাম এবং এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আমার উপর হামলাও হয়েছে। আর এই বিষয়টি আমি ফেইসবুকে প্রকাশ্যে লেখার মাধ্যমে আমি বুঝাতে চেয়েছি, আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্য, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের জন্য আমি জীবনবাজি রাখতে পারি। আমি প্রমাণ করতে চেয়েছি যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কটূক্তির প্রতিবাদ করার সাহস রাখি। আমি চাই এটা দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হোক।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মনির খান নিজেকে আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়েছেন। তবে ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এবং সদস্য সচিব ছাড়া অন্য কোনো পদে এখন পর্যন্ত কাউকে পদবী দেয়া হয়নি। উপকমিটির মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সদস্যদের নাম প্রস্তুত করার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা পূর্ণাঙ্গ হয়নি। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও এর অনুমোদন হয়নি তাই চাইলেই নিজেকে কেউ এই উপকমিটির সদস্য দাবি করতে পারেন না।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল মোস্তফা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এবং সদস্য সচিব একটি তালিকা তৈরি করেছেন, তবে এখনো সেটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। পূর্ণাঙ্গ হলে আমার স্বাক্ষরসহ সেই প্রস্তাবিত কমিটি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেবের কাছে পাঠানো হবে। তিনি সন্তুষ্ট হলে সেখানে অনুমোদন দিবেন। এখন পর্যন্ত এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। এর আগে কেউ নিজেকে এই উপকমিটির সদস্য দাবি করতেই পারে না।’
বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ- গঠন করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুমোদন ছাড়া বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে সংগঠন করা বেআইনি। প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে ভুঁইফোড় সংগঠন করার অধিকার আওয়ামী লীগের উপকমিটির সদস্য কিংবা মূল নেতা কারো নেই। এসবের তোয়াক্কা না করে কেউ যদি নিজের ইচ্ছেমতো কোনো সংগঠন করে তাহলে সেটা হেলেনা জাহাঙ্গীরের মত কাজ হয়ে যাবে। তবে আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি উপকমিটির তালিকায় যদি এমন কোন হাইব্রিড নেতার নাম থাকে তাহলে সেটা যাচাই-বাছাইয়ে অবশ্যই বাদ যাবে।’
উল্লেখ্য, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলটির সহযোগী সংগঠনের সংখ্যা সাতটি। এগুলো হলো মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ ও যুব মহিলা লীগ। এর বাইরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।
কিন্তু আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র বলছে, ‘এ দুটি সংগঠন তাদের স্ব স্ব সংগঠনের গঠনতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হবে’। কিন্তু বাস্তবতা হলো এসব সংগঠনের বাইরে অসংখ্য সংগঠন আওয়ামী বা লীগ শব্দ যুক্ত করে নানা সংগঠন তৈরি করেছে গত এক দশকে। দল বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু নেতা মূলত পেছন থেকে এসব সংগঠন তৈরি করেন নিজেদের প্রচারের স্বার্থে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে এমন কয়েকটি সংগঠনের কার্যকলাপ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জের ধরে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এক সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে দলটির ছয় সহযোগী সংগঠন ছাড়া কেউ নামের সাথে ‘লীগ’ শব্দটি যোগ করতে পারবেনা।
আওয়ামী লীগ থেকে বারবার শক্ত ব্যবস্থার কথা বলা হলেও আওয়ামী, বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী, কিংবা লীগ শব্দ ব্যবহার করে সংগঠনের সংখ্যা খুব বেশি কমানো যায়নি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাসিম তাঁর ফেসবুকে এক পোস্টে বলেছেন, ‘ময়ূরের পেখম লাগালেই কাক কখনো ময়ূর হয় না। তেমনি নামের সঙ্গে “লীগ” শব্দ ব্যবহার করলেই আওয়ামী লীগ হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগ একটা আদর্শ। এটাকে ধারণ করতে হয়। দলের গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো সংগঠনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নেই।’
এদিকে ভুঁইফোড় ও নামসর্বস্ব সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরের ‘চাকরিজীবী লীগ’ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল হার্ড-লাইনে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এর মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশানের বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। প্রায় সোয়া চার ঘণ্টার অভিযানে ওই বাসা থেকে বিদেশি মদ, বিদেশি মুদ্রা, হরিণ ও ক্যাঙারুর চামড়া, ক্যাসিনোর সরঞ্জাম ও ওয়াকিটকি সেট উদ্ধার করা হয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আটক করে র্যাবের সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। এরপর দিবাগত রাত দুইটার দিকে র্যাবের একটি দল মিরপুরে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা টেলিভিশন ও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনে অভিযান চালায়। রাতভর ওই অভিযান চলে।
এরপর আজ শুক্রবার হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আদালতে হাজির করে গুলশান থানায় করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় পাঁচ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন করে পুলিশ। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত তিন দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
