
একুশে প্রতিবেদক : হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাইসহ ১৩ মামলার আসামি মো. আলাউদ্দিন ওরফে চটপটি আলাউদ্দিন। এর মধ্যে দশটি মামলায় এজাহারে তার নাম আছে। তিনটি মামলায় ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসে আলাউদ্দিনের নাম৷ এছাড়া ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সদরঘাট থানায় র্যাবের করা মাদকের একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করতে সাক্ষ্য স্মারকে অনুমোদন দেন র্যাবের তৎকালীন ডিজি ও বর্তমানে আইজিপি ড. বেনজির আহমেদ।
ডবলমুরিং থানার একটি মাদকের মামলায় আদালতে দেওয়া এক আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতেও উঠে আসে চটপটি আলাউদ্দিন ও তার এক ভাগ্নের নাম৷ এরপরও তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর ডিবি পুলিশের (পশ্চিম) তৎকালীন এসআই বদরুদোজা তাদেরকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছেন।
তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা বদরুদোজার ভাষ্য, ‘আদালতে আসামির দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং মামলার এজাহারে গড়মিল পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনার সাথে আসামির ভাষ্যের যথেষ্ট অমিল পাওয়ায় চটপটি আলাউদ্দিন ও তার ভাগ্নেকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে ২০২০ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে ডবলমুরিং থানাধীন ঈদগাহ কাঁচা রাস্তা এলাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ ইয়াবাসহ মো. আরিফ নামে এক ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করে মহানগর ডিবির (পশ্চিম) এসআই দস্তগীর হোসেন। এ ঘটনায় তিনি বাদি হয়ে ডবলমুরিং থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেন৷ এরপর আসামি আরিফ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে আরিফ বলেন, “আমার ভাইরা আব্দুল জলিলের মাধ্যমে আলাউদ্দিন ও ফোরকান ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। তারা ইয়াবা ব্যবসা করে। আলাউদ্দিনকে এলাকায় সবাই চটপটি আলাউদ্দিন ভাই বলে। তার বাবার নাম শেখ আহমদ। থাকেন সিটি গেইট এলাকায়। ফোরকান ভাই থাকেন আকবর শাহ উত্তর কাট্টলি ইনার গাজীর বাড়িতে। তার বাবার নাম খোরশেদ আলম। আলাউদ্দিন ও ফোরকান মামা-ভাগ্নে। তারা দুজন একসাথে ইয়াবা ব্যবসা করে। আমার ভায়রা জলিল ও আমি তাদের থেকে চালান নিতাম। তারা বলে- তাদের সাথে কাজ করতে৷ যদি এক ট্রিপ মাল (ইয়াবা) পৌঁছে দিতে পারি তাহলে আমাকে ১০ হাজার টাকা দেবে। আমি টাকার কথা চিন্তা করে রাজি হই। ১৩ জুলাই ফোরকান ভাই আমার সাথে যোগাযোগ করে উত্তর কাট্টলি এলাকায় আলাউদ্দিন ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে আলাউদ্দিন আমাকে নীল রংয়ের ইয়াবার একটি প্যাকেট দেয়।”
আরিফের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে চটপটি আলাউদ্দিন ও তার ভাগ্নে ফোরকান নাম এলেও অভিযোগপত্রে তাদের বাদ দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর ডিবির (পশ্চিম) এসআই মো. বদরুদোজা। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে গত ৫ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তিনি। চার্জশিটে ইয়াবা বহনকারী আরিফ ও তার ভায়রা ফটিকছড়ির বাসিন্দা আব্দুল জলিলকে অন্তর্ভুক্ত করেন এসআই বদরুদোজা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদকের মামলায় ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উঠে আসা কোন ব্যক্তিকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত কর্মকর্তা কাজটা ঠিক করেননি। কারণ আসামির জবানবন্দিতে আসা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার উপাদান নিশ্চয় ছিল। আমার মনে হয় মামলাটির তদন্ত সঠিকভাবে হয়নি।’
এদিকে মাদক মামলার অভিযোগপত্র থেকে বাদ যাওয়া আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তার বিরুদ্ধে নগরের সদরঘাট, কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, কর্ণফুলী ও ডবলমুরিং থানা এবং জেলার পটিয়া ও আনোয়ারা থানায় মোট ১৩টি মামলা এবং ৭টি জিডি রয়েছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে দায়ের হওয়া ১৩টি মামলার মধ্যে ৮টিতে তিনি চার্জশিটভুক্ত আসামি। এছাড়া তিনটি পৃথক মামলায় আসামিদের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে তার নাম। মামলাগুলো হল- ২০১৯ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সদরঘাট থানায় র্যাবের করা মামলা ৪(৮)২০১৯, পটিয়া থানার হত্যা মামলা ১(৯)২০১৭ এবং কর্ণফুলী থানার হত্যা মামলা ১৬(৬)২০১৯। বাকি ১০ মামলায় আলাউদ্দিন এজাহারভুক্ত আসামি।
আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ১ অক্টোবর পাহাড়তলী থানায় জিডি করেন তৎকালীন এএসআই হারুন অর রশিদ। আলাউদ্দিনকে পাহাড়তলী থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী রহমত উল্লাহ ডন গ্রুপের অস্ত্রধারী সদস্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর আগে আলাউদ্দিন ছিলেন উত্তর কাট্টলির ডাকাত মামুন গ্রুপের অস্ত্রধারী ক্যাডার। আলাউদ্দিনের পেশা জমি দখল, মাদক ব্যবসা বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়।
আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কোতোয়ালী থানায় জিডি করেন তৎকালীন এসআই মনোজ দে। এর আগে একই থানায় একইবছরের ২৫ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে জিডি করেন তৎকালীন এসআই ইশতিয়াক আহমেদ। ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে জিডি করেন আকবরশাহ থানার এসআই মোস্তাফিজুর রহমান। ২০০৮ সালের ১৩ অক্টোবর পাহাড়তলী থানায় আলাউদ্দিনে বিরুদ্ধে জিডি করেন তৎকালীন এসআই মফিজুল ইসলাম এবং একই থানায় তার বিরুদ্ধে জিডি (নং-৩৮) করেন তৎকালীন এএসআই হারুন অর রশিদ।
আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে করা জিডিগুলোর অভিযোগ প্রায় অভিন্ন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জিডিতে উল্লেখ করেন, আলাউদ্দিন পেশাদার একজন অপরাধী৷ মাদক ব্যবসা, ডাকাতি, ছিনতাই করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করে। তার ভাই ডাকাত মামুন অস্ত্রধারী ক্যাডার হিসেবে ক্রসফায়ারে নিহত হয়। আলাউদ্দিন খুলশী ও পাহাড়তলী থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। নিউমার্কেট এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি করে ভূমি জবরদখল করা তার পেশা।
আলাউদ্দিনের অপরাধ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দেন পাহাড়তলী থানার তৎকালীন এসআই সত্যজিৎ বড়ুয়া, এসআই বিজন বড়ুয়া, এসআই মফিজুল ইসলাম, কোতোয়ালী থানার এসআই গোলাম মোস্তাফা এবং ডবলমুরিং জোনের তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার তোফায়েল আহমেদ।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১ আগস্ট সকালে সদরঘাট থানাধীন শাহ বদর হোটেলের সামনে থেকে ৭ হাজার ৫৪৫ পিস ইয়াবাসহ মো. ফয়সাল নামে একজনকে আটক করে র্যাব-৭। পরে তার বিরুদ্ধে সদরঘাট থানায় মামলা করেন র্যাব-৭ এর তৎকালীন ডিএডি মো. ফজলুল হক। আদালতে আসামি ফয়সাল ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আব্দুল খালেক, চটপটি আলাউদ্দিনসহ আরও তিনজনের নাম বলেন৷ ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র দেন র্যাব-৭ এর তৎকালীন এসআই হায়দার আলী। চার্জশিটে চটপটি আলাউদ্দিনসহ চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
এদিকে আলাউদ্দিনকে একের পর এক ‘মিথ্যা’ মামলায় জড়ানোর অভিযোগ তুলে তার স্ত্রী বিবি মরিয়ম প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা জাকির হোসেন ও তার ছেলেদের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে লিখিত অভিযোগ দেন৷ সদর দপ্তরের নির্দেশে বিবি মরিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেন সিএমপি’র ডবলমুরিং জোনের তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার শ্রীমান চাকমা। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সিএমপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দেন তিনি। এতে উল্লেখ করা হয়, “আমার সার্বিক অনুসন্ধানে বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
তদন্ত প্রতিবেদনে শ্রীমান চাকমা আরও উল্লেখ করেন, “থানার রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়- ইতিপূর্বে অভিযোগকারীর স্বামী মো. আলাউদ্দিনের নাম আকবরশাহ থানায় সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত হলেও বর্তমানে তার নামে আকবরশাহ থানায় কোন মামলা নেই। তবে আকবরশাহ থানায় তার নামে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, পটিয়া থানার একটি হত্যা মামলা এবং সদরঘাট থানার একটি মাদক মামলা মূলতবি আছে। অভিযোগকারী বিবি মরিয়ম লিখিত আবেদনে ন্যায়বিচারের স্বার্থে তার স্বামী আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার হয়রানি বন্ধে বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানালেও আমার সার্বিক অনুসন্ধানে বিবাদীগণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
এদিকে বিবি মরিয়মের একই অভিযোগ তদন্ত করেন নগর পুলিশ উত্তর জোনের এডিসি আবু বকর সিদ্দিকও। সিএমপি কমিশনার বরাবর গত ১ জুন এ পুলিশ কর্মকর্তার দেয়া অনুসন্ধান প্রতিবেদনেও একইরকম মন্তব্য করেন এডিসি মো. আবু বকর সিদ্দিক।
চটপটি আলাউদ্দিনের বিষয়টি অবগত আছেন বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডবলমুরিং থানার ওই মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামির জবানবন্দিতে চটপটি আলাউদ্দিনের নাম এলেও সে ওই ঘটনায় জড়িত কিনা তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে।’
পরে ফোন করে আলাউদ্দিন প্রসঙ্গে পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখবো। হুট করে একটা লোকের নাম জবানবন্দিতে আসলো, অথচ আগে-পিছে ওই ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা নেই, বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তবু আমরা সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে বলবো সতর্কতার সাথে মামলা তদন্ত করতে।’
এর আগে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের একটি ইয়াবা উদ্ধারের মামলার অভিযোগপত্র থেকে এভাবে আসামি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের হওয়া মাদকের মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামি গফুর। এতে মীর কাশেম, শরীফ নামে আরও দুজনের নাম প্রকাশ করেন তিনি। জবানবন্দিতে আসা দুজনের মুঠোফোনের “সিডিআর” পাওয়া না যাওয়ার অজুহাতে চার্জশিট থেকে তাদের বাদ দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উৎফল চক্রবতী৷
বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উৎফল চক্রবতীকে বায়েজিদ বোস্তামী থানা থেকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করেন। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। অন্যদিকে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করে পুলিশ। আদালত আবেদন মঞ্জুর করলে পুনরায় মামলা তদন্ত করে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ।
