মশা মারার ওষুধ নিয়ে দোটানায় চসিক, প্রশ্নবিদ্ধ ওষুধে দায়সারা কার্যক্রম

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : মশা নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) দীর্ঘদিন ধরে যে ওষুধ ব্যবহার করে আসছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। মশা মারার সেই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ আছে খোদ সিটি মেয়রেরও। তবুও কোটি টাকা খরচ করে কেনা হয়েছে সেই ওষুধ। পরে তা ছিটানো হয়। আবার সেই ওষুধ কেন কাজ করছে না তা জানতে চসিকের কর্মকর্তাদের ঢাকায় ‘প্রমোদ ভ্রমণ’ও করেন।

অন্যদিকে মশা মারার জন্য স্প্রে মেশিন নাকি ফগার মেশিন কোনটি বেশি কার্যকর সেটি নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে চসিক। মশা মারতে চসিকের এত আয়োজন থাকলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি, সুফল পায়নি নগরবাসী। বন্ধ হচ্ছে না মশার উপদ্রব।

চলতি মৌসুমের জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ৭ জন। সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। এর আগে ৭ জুন নগরের লালখান বাজার এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক তরুণীর মৃত্যু হয়। এভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু হলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় চসিককে। এরপরই নড়েচড়ে বসে সংস্থাটি, বাড়ায় নিজেদের চিরাচরিত তোড়জোড়।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে ডেঙ্গু মোকাবেলায় এডিস মশা মারতে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) গবেষক দলের দেখানো পথেই হাঁটতে যাচ্ছে চসিক। মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে চবির গবেষক দলের দেওয়া এক প্রতিবেদনে, মশা থেকে রক্ষা পেতে রাসায়নিক ওষুধের সঙ্গে জৈবিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে সুপারিশ করা হয়।

গবেষকরা বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে আমাদেরকে পাঁচ ধরনের মশা নিধক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। আমরা তা পরীক্ষা করে একটি কেমিক্যালে শতভাগ সফলতা পেয়েছি। হারবাল প্রোডাক্ট জাতীয় ওই কেমিক্যালের সাথে কেরোসিন ব্যবহার করলে শতভাগ লার্ভা ধ্বংস হচ্ছে। বাকি চার ধরনের কেমিক্যালে লার্ভা ধ্বংস হলেও মশার মৃত্যুহার কম।’ তবে কোন জৈবিক পদ্ধতির ওষুধ ব্যবহার করতে চবির গবেষক দল সুপারিশ করেছে তা জানায়নি চসিক।

নগরের ৯৯টি এলাকা পরিদর্শন করে ৫৭টি স্পট থেকে নমুনা নিয়ে তা পরীক্ষা করে ১৫টি স্পটে এডিস মশার শতভাগ লার্ভা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল।

এর আগে মশক নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় গত ১৪ মার্চ ব্যবহৃত ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষা করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারকে অনুরোধ করে চসিক। এরপর ২৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন চবি উপাচার্য। কিন্তু দুই দফা চসিকে বাজেট পেশ করেও পাশ না হওয়ায় কাজ শুরু করতে পারেনি চবির গবেষকরা। সর্বশেষ গত ২২ জুন বাজেট পাশ হলে ৫ জুলাই থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করে গবেষকরা।

চসিক সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘এখন আমরা আশ্বস্ত হতে পেরেছি কোন ওষুধ ব্যবহার করলে মশা মারতে পারবো। আগে বছরের পর বছর মশার ওষুধ ব্যবহার করেছি, কিন্তু সেটা আন্দাজে ব্যবহার করেছি। হয়তো কখনো বেশি ওষুধ ব্যবহার করেছি, কখনো কম ব্যবহার করেছি। পুরোপুরি সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।’

যদিও মেয়র পদে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই নগরবাসীর চাপে মশক নিধনে ওষুধ ছিটিয়ে ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি শুরু করেছিলেন এম রেজাউল করিম। সিটি মেয়রের এমন বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে অকার্যকর জেনেও ওষুধ ছিটানো নিয়ে কেন এতো হাঁকডাক, ফটোসেশান করেছেন মেয়র?

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে মশক নিধনের ওষুধ সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। গত বছর ঢাকায় ছিটানো ওষুধ পরীক্ষা করে ‘অকার্যকর’ বলেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি)। ‘অকার্যকর’ জেনেও সেই ওষুধ কয়েকমাস আগেও এনেছে চসিক।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মশক নিধনে এডালটিসাইড ও লার্ভিসাইড নামে দুই ধরনের ওষুধ ছিটানো হয়। গত দুই অর্থবছরে এক কোটি তিন লাখ টাকার কীটনাশক ‘এডালটিসাইড’ ও ৯৯ লাখ টাকা খরচ করে মশার লার্ভা ধ্বংসকারী ‘লার্ভিসাইড’ কিনেছে চসিক। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মশক নিধনে বরাদ্দ ছিল ছয় কোটি টাকা। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল এক কোটি ১০ লাখ টাকা।

জানা যায়, চলতি বছরেই ২৪ হাজার টাকা দরে ১০ টি ‘টু স্ট্রোক স্প্রে মেশিন’ ক্রয় করেছে সিটি করপোরেশন। দেখতে ও কার্যক্রম অনেকটা ফগার মেশিনের মত হলেও দাম কম থাকায় এই মেশিনের দিকে ঝুঁকেছে সংস্থাটি। তবে ক্রয়কৃত এসব মেশিনের কার্যকারিতা নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা না থাকায় এসব মেশিনের কার্যকারিতা দেখে আরো মেশিন ক্রয় করবে চসিক। মেয়রের ভরসাও এই স্প্রে মেশিনের ওপর।

আজকের সভায় মেয়র বলেন, ‘একটি স্প্রে মেশিনের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি দাম ফগার মেশিনের। ফগার মেশিনের পরিবর্তে স্প্রে মেশিন ব্যবহার করে তা নিয়ে এগিয়ে গেলে অনেক বেশি সুফল পাব। স্প্রে মেশিন সবচেয়ে উপযোগী বলে মনে করি। ফগার মেশিন দিয়ে যে ওষুধ ছিটানো হয় তার কার্যকারিতা নগন্য। লার্ভিসাইড এডাল্টিসাইড মেশিন দিয়ে ওষুধ স্প্রে করলে বেশি সুফল পাব।’

এদিকে, নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে বুধবার (৪ আগস্ট) থেকে মশক নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করতে যাচ্ছে চসিক। নগরের ২ নম্বর গেইট এলাকায় মেয়র এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন এই ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েও। কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে এই কার্যক্রম শুরু হবে? আগের ওষুধ নাকি চবির সুপারিশ করা নতুন ওষুধ কোনটি ব্যবহার করা হবে? ফগার মেশিন নাকি স্প্রে- কোনটি ব্যবহার করতে যাচ্ছে চসিক?

চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগ সূত্র জানায়, নতুন কোনো ওষুধ নয় আগামীকালের মশক নিধন কার্যক্রমে পদ্মা ওয়েল কোম্পানি থেকে কেনা লাইট ডিজেল ওয়েল (এলডিও) পূর্বের লার্ভিসাইড ওষুধের সাথে মিশিয়ে নতুন ক্রয়কৃত স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে ছিটানো হবে। এই ওষুধ বেশ কয়েকবছর ধরেই ব্যবহার করে আসছে চসিক। এডালটিসাইড না থাকায় লার্ভিসাইড ব্যবহারই শেষ ভরসা চসিকের। যদিও এক্ষেত্রে চবির দেওয়া রিপোর্টে ভিন্ন প্রণালীতে ভিন্ন ওষুধ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছিল।

জানতে চাইলে চসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘লার্ভিসাইড ওষুধের সাথে এলডিও মিশিয়ে তা স্প্রের মাধ্যমে ছিটানো হবে। ফগার মেশিনের মাধ্যমে এডালটিসাইড ব্যবহার কার্যকর না হওয়ায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। চবির গবেষক দলের সুপারিশ করা ওষুধ সংগ্রহ করতে আমাদের কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে।’

এদিকে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলমের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কার কোনো ধারণা দিতে পারেননি। কোন ধরনের ওষুধ ছিটানো হবে, কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, কী মেশিন ব্যবহার করা হবে তার কিছুই জানেন না এ কর্মকর্তা।

তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, কোন ওষুধ ছিটাতে হবে সেটা প্রতিবেদনে দেওয়া আছে। গবেষণা দল সভায় তা খোলাসা করেনি। এই বিষয়ে আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। চবি গবেষক দলের রিপোর্ট মাত্র হাতে পেয়েছি, সেটা এখনো দেখা হয়নি। তাদের সুপারিশ করা ওষুধের বিষয়ে মেয়র মহোদয়ের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হতে পারবো। আসলে তারা যেটা বলেছে সেভাবে যদি আমাদের ওষুধ থাকে তাহলে সে অনুযায়ী ওষুধ ছিটানো হবে, আর তারা যেভাবে বলেছে সেভাবে যদি না থাকে তাহলে আমরা ওষুধ সংগ্রহ করবো।’

এ বিষয়ে জানতে সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীর নাম্বারে একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।