
এম কে মনির, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া এলাকায় সাগর থেকে বসুন্ধরা গ্রুপের বালু তোলার ফলে ঝাউবাগান বিলীন হওয়ার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত এক বছরে সেখানে কয়েক হাজার গাছ উপড়ে পড়েছে। গোড়ার মাটি সরে যাওয়ায় এখনো বহু ঝাউগাছ হুমকির মুখে।
এত দিন বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়ানোর পাশাপাশি সারি সারি এসব ঝাউগাছ সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে উপকূলবাসীকে বাঁচানোর প্রাকৃতিক প্রাচীরও ছিল। একের পর এক গাছ উপড়ে পড়ায় সমুদ্রসৈকত এখন গাছশূন্য প্রায়। ফলে পর্যটন সম্ভাবনা ম্লান হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছে প্রকৃতি।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশবাড়িয়ায় ১৯৬৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে ৩ হাজার ৫০৮ হেক্টর জমিতে গাছ লাগানো হয়েছিল। বর্তমানে অর্ধেকেরও বেশি জায়গায় গাছ বিলীন হয়েছে।
শনিবার (১৪ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সাগরের বিশাল ঢেউ ঝাউবাগানে আচড়ে পড়ছে। এতে সাগরতীরে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাটি ধসে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে আছে। যে গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোরও শেকড়ের মাটি সরে গেছে।
আবদুর রহিম, লিয়াকত আলীসহ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, বাঁশবাড়িয়া এলাকায় সাগরতীরে তেল ও গ্যাস প্ল্যান্ট করার জন্য প্রায় ১০০ একর জায়গা কিনেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এসব জায়গা ভরাট করার জন্য কয়েকবছর ড্রেজার দিয়ে সাগর থেকে বালু তোলে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছর এ কাজ তারা স্থগিত করেছে। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।
তারা আরও জানান, অপরিকল্পিতভাবে সাগরতীরের পাশ থেকে বালু তোলায় সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে বাঁশবাড়িয়া সৈকত। জোয়ারের সময় সমুদ্রে গোসল করতে নেমে এসব গর্তে পড়ে অনেকেই মারা গেছেন। এছাড়া পাড়ের মাটি সরে গিয়ে এসব গর্তে জমা হচ্ছে। যার কারণে চলতি বর্ষা মওসুমেই উত্তাল জোয়ারের ধাক্কায় দুই শতাধিক ঝাউগাছ উপড়ে পড়েছে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে। উপড়ে পড়া এসব গাছের বেশিরভাগই নিয়ে যাচ্ছে গাছচোর চক্র।

বাঁশবাড়িয়া সৈকতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, ‘সৈকতে আগে অনেক গাছ ছিল, এখন তার অর্ধেকও নেই। বাঁশবাড়িয়া সৈকতে একসময় পর্যটকরা ভিড় করলেও এখন পর্যটকরা তেমন আসছেন না। আগের মতো ব্যবসাও নেই।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, ‘ঝাউগাছগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে। বিগত সময়ে অনেক ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত হানলেও বাঁশবাড়িয়ায় এর তেমন প্রভাব পড়েনি। ঝাউগাছ উজাড় হয়ে যাওয়ায় এখন আমরা শঙ্কায় আছি।’
সীতাকুণ্ডের পরিবেশবাদী সংগঠক ইঞ্জিনিয়ার কামরুদ্দোজা, এম এ আরাফাত, ফখরুল ইসলাম জানান, ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে বিলীন হতে হতে ঝাউবাগানের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট রয়েছে। সৈকত এলাকা ভাঙতে ভাঙতে ছোট হয়ে গেছে। সামান্য যা আছে এটুকু ভেঙে গেলে পর্যটকরা আর আসবে না।
তারা আরও জানান, শিল্প গ্রুপগুলো শুধু বাঁশবাড়িয়া নয়, পুরো সীতাকুণ্ডকে গিলে খেয়েছে। বালু উত্তোলন ও কৃষিজমি গ্রাসের নেতিবাচক প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন শিল্পগ্রুপ যখন সাগর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছিল তখন আমরা অনেক প্রতিবাদ করেছি। পত্র-পত্রিকায় অনেক রিপোর্টও হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই চুপ ছিল।
সীতাকুণ্ড নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব গিয়াস উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্র থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এতো বেশি পরিমাণে বালু উত্তোলন আগে কখনো হয়নি। মাত্রাতিরিক্ত বালু উত্তোলন করায় সমুদ্র-পাড়ের গভীরতা বেড়েছে। জোয়ারের সময় এসব গর্তে পড়ে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে বেড়াতে এসে পর্যটকরা একের পর এক ডুবে মারা যাচ্ছেন। এখন ঝাউগুলো বিলীন হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সীতাকু-ের বেশিরভাগ শীপ ইয়ার্ড সাগর উপকূলের ঝাউগাছ উজাড় করে করা হয়েছে। এসব বালু উত্তোলনেরই ফল। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও শিল্প গ্রুপগুলোর পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা-ের খেসারত দিতে হচ্ছে প্রকৃতিকে। ঝাউগাছ উজাড় হওয়ায় পর্যটকরা বাঁশবাড়িয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’
মানবাধিকার সংগঠক শিবলু মির্জা বলেন, ‘বেড়িবাঁধের বাইরের ঝাউবাগান থেকে সাগর ছিল আরও অন্তত এক কিলোমিটার দূরে। ঝাউবাগানের বাইরের অংশে ছিল মাটির উপর ঘাস। তারপর বালুর স্তর। তারপর ছিল লোহার সেতুটি। এখন ওই এক কিলোমিটার এলাকায় হাঁটার অবস্থা আর নেই। তিন বছর আগে একটি শিল্পগ্রুপ সাগর থেকে বালু উত্তোলন করায় ভাঙন শুরু হয়। এখন ঝাউবাগানটিই নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।’
অথচ বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সমুদ্র উপকূলের তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারপরও কোনও কিছুরই তোয়াক্কা করছে না শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো।
- ড্রেজার দিয়ে সাগর থেকে বালু এনে এই জায়গাটি ভরাট করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
সাগরের বালু দিয়ে ভরাট করে বাঁশবাড়িয়ার যে স্থানে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রকল্প করা হচ্ছে, সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মীকে দেখা গেছে। বালু উত্তোলন নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তারা। বসুন্ধরা গ্রুপের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দায়িত্বশীল কোনও কর্মকর্তার মুঠোফোন নাম্বারও তাদের কাছে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বন বিভাগের সীতাকুণ্ড রেঞ্জের কর্মকর্তা কামাল হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জোয়ারের ধাক্কায় এসব গাছ উপড়ে পড়ছে। বাঁশবাড়িয়া সৈকতে একটি ম্যানগ্রোভ বন করার জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠনো হয়েছে। বর্ষা শেষ হলেই তার কাজ শুরু হবে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল হোসাইন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সমুদ্র থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে সমুদ্রের গভীরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে সাগরের পাড় ভাঙতে থাকে। সীতাকু-ে যা হচ্ছে তা সেরকমই একটি বিষয়। যারা অবৈধভাবে সাগর থেকে বেশি পরিমাণে বালু তুলেছে তারা সাগরের গভীরতা বাড়িয়েছে।’
‘ফলে উপকূলে ঝাউগাছ, কেওড়া গাছসহ সব ধরনের বৃক্ষ উজাড় হবে। কেননা সাগরপাড়ের মাটি সরে গিয়ে মাঝ সাগরে জমাট হচ্ছে। উপকূলীয় বন উজাড়ের ফলে একদিকে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির কবলে পড়বে সংশ্লিষ্ট এলাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় প্রকৃতি ধ্বংসের খেসারত আমাদেরকেই দিতে হবে।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক জমির উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাগর পাড়ের ঝাউগাছ না থাকলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যাবে। তবে সীতাকুণ্ডের এসব বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

