
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : করোনায় মারা গেছেন এক ব্যক্তি। স্বজনরা হাসপাতালে মৃতদেহ রেখেই চলে যান। সেখানেই পড়ে থাকে নিথর দেহটি। হাসপাতালের ফাইলে থাকা মোবাইল নম্বারে কল করা হলেও দেহ গ্রহণ করতেও আসেনি কোনো আত্মীয়স্বজন- সেই মৃতদেহের দাফনে অন্যতম ভরসা আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। গত বছর থেকে করোনা আক্রান্ত রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া, অক্সিজেন সরবরাহ থেকে শুরু করে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন ও সৎকার করে আসছে আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।
শুধু তাই নয়, চিকিৎসা নৈরাজ্যের বিপরীতে সংগঠনটি গড়ে তোলে ‘আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতাল’; চট্টগ্রামের উত্তর হালিশহর বি-ব্লকের ফুল চৌধুরী পাড়া এলাকায় স্থাপিত এই সেবামূলক হাসপাতালে গত এক বছরে চিকিৎসা নিয়েছেন এক হাজারের বেশি করোনা রোগী। এভাবে মানবসেবায় অনন্য নজির স্থাপন করা এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি অর্জন করেছে মানুষের আস্থা এবং ভালোবাসা।
এদিকে বর্তমানে একটি আইসিইউ বেডের জন্য স্বজনরা রোগী নিয়ে ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। কিন্তু কোথাও খালি নেই আইসিইউ। আইসিইউ না পেয়ে প্রতিদিনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অনেকেই। এমন অবস্থায় নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমে আশার আলো ছড়ানো এই সংগঠনটি আবারও এগিয়ে এসেছে। আটটি আইসিইউ বেড স্থাপন করছে আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সরকারি সুযোগ-সুবিধায় সেবা পেতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ১০টি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ১৮টি এবং ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৫ টি আইসিইউ বেড যেখানে অভাবগ্রস্থ, প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা। এমন অবস্থায় আল মানাহিলের এই ৮টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হলে নতুন করে বাঁচার আশা পাবেন আরো অনেকে। আইসিইউর সহযোগিতা পেয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে হয়তো সুস্থও হয়ে উঠবেন অনেকেই।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সংগঠন কিংবা সাধারণ মানুষের অনুদানে নগরে বিভিন্ন করোনা হাসপাতাল, আসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হলেও কোনো সংগঠনের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের নজির এই প্রথম। সবচেয়ে অবাক করা ও আশা জাগানিয়া বিষয় হলো- সরকারি হাসপাতালের মতোই খরচে, অনেকটা নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এই আইসিইউ সেবা পাবেন নগরবাসী।
- আইসিইউ ইউনিট চালুর প্রস্তুতি চলছে।
গত বছরের জুনে পথচলা শুরু করা ছয়তলা বিশিষ্ট আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতালে ১০ টি আইসিইউ বেড স্থাপন করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা করা সম্ভব হয়নি কর্তৃপক্ষের। যদিও অন্য দশটি হাসপাতালের মত এই হাসপাতালেও সব ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া নারী-পুরুষের জন্য আলাদাভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি আছে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড। সাথে সীমিত পরিসরে রাখা হয়েছে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে চারটি আইসিইউ স্থাপনের কাজ শেষ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে হাসপাতালের এই আটটি আইসিইউ বেড চালু করা হবে। হাসপাতালটিতে অফিসিয়ালি ৪৩ শয্যা থাকলেও এর বাইরে আরো ৩২টি শয্যা রয়েছে, যার মাধ্যমে করোনা আক্রান্তরা আইসোলেশনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে নতুন করে এই আইসিইউ বেড স্থাপনের কারণে কিছু সাধারণ শয্যা কমছে। সবমিলিয়ে আইসিইউ বেডসহ সাধারণ শয্যা সংখ্যা হচ্ছে ৬০টি।
হাসপাতালে আইসিইউ বেড স্থাপন প্রসঙ্গে সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বিন জমির একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে সেবা নিতে আসা অর্ধেকের বেশি ক্রিটিক্যাল রোগী যাদের অনেকের আইসিইউ খুব প্রয়োজন হতো। এছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে রোগীরা আমাদের অনুরোধ করতেন একটা আইসিইউ বেড যোগাড় করে দেওয়ার জন্য। আমরা দেখছিলাম সবখানেই আইসিইউ বেডের অভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীরা খুব কষ্ট পাচ্ছেন। চমেক হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা যোগাযোগ করে আইসিইউ পেতাম না।’
‘আমরা বুঝতে পারছিলাম যে চারিদিকে আইসিইউ সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। আইসিইউর জন্য মানুষের আহাজারি দেখে আমাদের সংগঠনের চেয়ারম্যান সাহেব উদ্যোগ নেন যে হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করবেন। সর্বোচ্চ এক মাস হচ্ছে আমরা এই পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়ন হতে চলেছে। আমরা আমাদের নিজেদের সংস্থা থেকে এগিয়ে যাচ্ছি, আশা করি চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার আইসিইউ স্থাপনের কাজ শেষ হবে।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু সবগুলো আইসিইউ স্থাপনের কাজ এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি তাই বেড প্রতি আমাদের কত খরচ হয়েছে তার হিসেব এখনো আমরা করিনি। তবে আনুমানিক বলতে গেলে বেড প্রতি কমপক্ষে ২০-২৫ লাখ টাকা করে আমাদের খরচ হতে পারে। যদি ইউরোপীয়ান টেকনোলজি ব্যবহার করতে চাই তাহলে বেডপ্রতি কোটি টাকার বেশিও চলে যেতে পারে। তবে এসবের পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলাসহ একটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট।’
হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালুর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে উল্লেখ করে আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা হেলাল উদ্দিন বিন জমির বলেন, ‘৮ শয্যার আইসিইউ স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথমত অনেক বড় অংকের টাকা আমাদের খরচ করতে হচ্ছে। প্রতিটি আইসিইউ বেডের সরঞ্জাম, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীর পরিচর্যায় সার্বক্ষণিক নার্সসহ সবকিছু মিলে বড় ধরনের একটা মেইনটেইনেন্সের ব্যবস্থা আমাদের করতে হচ্ছে। তবে আমাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল, যেভাবে হোক কাজটা করতে হবে। প্রবল ইচ্ছা আর দৃঢ় সংকল্প সকলকে এমন কঠিন কিছু বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্থান সংকুলান করতে না পারায় আমরা ৮টি আইসিইউ বেড স্থাপন করছি। আর শুধু জায়গা থাকলেই হবে না, যে আইসিইউ বেড আমরা স্থাপন করছি সেগুলো তো মানসম্মত হতে হবে। একটা আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর মেশিনের পিছনে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। আবার যদি হাইকোয়ালিটি বা ইউরোপীয়ান ভেন্টিলেটর মেশিন লাগাতে চাই খরচটা আরো অনেক বেশি হবে। সবকিছু মিলে আপাতদৃষ্টিতে আমরা মনে করেছি আইসিইউ’র এই সংখ্যা আমাদের হাসপাতালের জন্য যথাযথ হবে।’
আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা হেলাল উদ্দিন বিন জমির বলেন, ‘আইসিইউ পরিচালনার জন্য আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্স প্রয়োজন হবে। তাদের চার্জও একটু বেশি। সেক্ষেত্রে অন্যান্য খরচ বাদ দিলেও তাদের বেতনটা আমাদের নিয়মিত দিতেই হবে। সেক্ষেত্রে যে খরচটা না নিলেই নয় সেই খরচটাই আমরা রোগীর কাছ থেকে নিবো। তবে এতটুকু বলতে পারি অন্যান্য সকল হাসপাতাল থেকে অনেক কম টাকায় সেবাটা আমরা দিতে পারবো।’
এর আগে করোনা মহামারিকালীন সময়ের শুরুর দিকে আল মানাহিল ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকেরা রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পৌঁছে দিতেন। এই সেবা দিতে গিয়ে রোগীদের বিভিন্ন রকম কষ্ট ও দুর্ভোগ চোখে পড়ে ফাউন্ডেশনের সদস্যদের। কখনো রোগী ভর্তি করার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে আল মানাহিলের স্বেচ্ছাসেবকদের। তখন অনেক হাসপাতাল করোনা রোগীদের ভর্তি নিচ্ছিল না।
এমন অবস্থায় রোগী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্সেই অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক দিন। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার করুণ দৃশ্যও আল মানাহিলের স্বেচ্ছাসেবকদের দেখতে হয়েছে। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই হাসপাতাল চালু করে আল মানাহিলের নীতিনির্ধারকরা।

ওই হাসপাতালে প্রদান করা হচ্ছে গাইনি ও প্রসূতি চিকিৎসা সেবাও। এছাড়া সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরিচালনায় মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি, গাইনি চেকআপসহ আউটডোর চিকিৎসা সেবা রয়েছে হাসপাতালটিতে। সার্বক্ষণিক ডাক্তারের উপস্থিতিতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা সেবাও মিলছে। বিশেষজ্ঞ দন্ত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ডেন্টাল আউটডোর ইউনিটসহ নানা চিকিৎসা সেবা নেওয়া যায় হাসপাতালটি থেকে।
আল মানাহিল নার্চার জেনারেল হাসপাতালের বহিঃবিভাগ, জরুরি, ডেন্টাল এবং গাইনি ও প্রসূতি বিভাগে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। গত বছরের ৭ জুলাই থেকে উদ্বোধনের পর গত এক বছরে এ হাসপাতালে ৬২১ জন করোনা রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন। রেসকিউ টিমের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স সেবা পেয়েছেন কয়েক হাজার মুমূর্ষু রোগী। মুসলিম-অমুসলিম সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার লাশের দাফন কাফন ও সৎকার কাজ করেছে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা।
এসবের পাশাপাশি গত ২২ বছর ধরে মানবতার সেবায় নানাভাবে কাজ করে আসছে আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। সারাদেশে কয়েক হাজার মসজিদ, প্রায় অর্ধলক্ষ গভীর-অগভীর নলকূপ, অসংখ্য অজুখানা, মাদ্রাসা-মক্তব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা হয়েছে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আল্লামা জমির উদ্দিন নানুপরী ‘আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ২০১১ সালে মারা যান। এরপর তাঁর তিন সন্তান মাওলানা হেলাল উদ্দিন বিন জমির, মাওলানা শিহাব উদ্দিন বিন জমির ও মাওলানা ফরিদ উদ্দিন বিন জমির ফাউন্ডেশনটি পরিচালনা করে আসছেন। বর্তমানে মানবসেবাকে ব্রত হিসেবে নিয়ে এগিয়ে চলেছে মানবতার ফেরিওয়ালা খ্যাত সংগঠনটি।

