
জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, গবেষণার জন্য সমাজে কেউ কেউ মরণোত্তর দেহ দান করে থাকেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগে মরণোত্তর দেহগ্রহণ ও সংরক্ষণ করতে গিয়ে এবার নিজের দেহটাই দিয়ে দিলেন দিলেন। ঘোষণা দিলেন মরণোত্তর দেহদানের। বলছিলাম, চমেক হাসপাতালের এনাটমি বিভাগের মরদেহ সংরক্ষণকার ও পাহারাদার দুলাল দাশের কথা; যিনি সম্প্রতি নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরণোত্তর দেহদানের ঘোষণা দিয়েছেন।
৫৭ বছর বয়সী দুলালের ইচ্ছা মৃত্যুর পর তার মরদেহটিকে দাহ্য পদার্থে পরিণত না করে, মানবকল্যাণে ব্যবহার হোক, চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ হোক। সে কারণেই এমন সিদ্ধান্ত। যে বিভাগের জন্য তিনি দিনরাত এক করে কাজ করছেন সেই বিভাগের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীরা তার দেহ ব্যবহার করে শল্যবিদ্যা আয়ত্ব করবেন, তারপর তাদেরই ছোঁয়ায় অসুস্থ মানুষ সুস্থ হবে, অন্ধকারে আলো জ্বলবে।
দুলাল চন্দ্র দাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) এনাটমি বিভাগে বিভিন্ন সময়ে সমাজের বিশিষ্টজনদের দান করা দেহগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি পাহারাদার হিসেবে কাজ করেন। তার চাকরির শুরুটা হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শাহ আলম বীরউত্তম মিলনায়তনে ঝাড়ুদার হিসেবে। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর সেবক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এরপর ২০০৭ সাল থেকে কাজ শুরু করেন এনাটমি বিভাগে। এনাটমি বিভাগে আসার পেছনেও রয়েছে একটি গল্প।
দুলালের দূর সম্পর্কের এক মামা কাজ করতেন চমেক হাসপাতালের এনাটমি বিভাগে। চাকরি শেষে অবসরে যাওয়ার সময় তৎকালীন চমেক অধ্যক্ষকে বলে তার স্থানে দুলালকে দিয়ে যান। যদিও সেসময় মরদেহ দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি। ছিল না এ বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা। শুরুতে এনাটমি বিভাগে নিজেকে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাকে। এমনও সময় পার করেছেন মরদেহ দেখে দিনের পর দিন ঘুমাতে পারেননি, খেতে পারেননি।
সময়ের পালাবদলে উল্টো এখন এনাটমি বিভাগেরই প্রতি অদৃশ্য টান অনুভব করেন দুলাল। চমেকের বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ সময় পার করার পর এখন তার ধ্যান-ধারণা ঘিরে রয়েছে এনাটমি বিভাগ। বিভাগের শিক্ষকদের কাছ থেকে দেখতে দেখতে প্রায় সকল কার্যক্রমই আয়ত্তে এনে ফেলেছেন তিনি। অনেকসময় একাই সেরে ফেলেন বিভাগের শিক্ষাসম্পৃক্ত খুঁটিনাটি কাজ। কখনো-সখনো বিভাগের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমেও শিক্ষা দেন তিনি। মূলত চমেক এনাটমি বিভাগই যেন এখন দুলালের নিজের ঘর।
এই বিভাগকে তিনি যেভাবে আপন করে নিয়েছেন তেমনি বিভাগটিরও সুজন, আপন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে একটি ছোট উদাহরণ টেনে দুলাল বলেন, আমার পান খাওয়ার অভ্যাস অনেকদিনের, একটু পানপাগালও। বিভাগের ল্যাবে আমি একদিন কাজ করছিলাম। চমেকের সাবেক প্রফেসর সাহারা খাতুন ম্যাডাম আমাকে নিজের হাতে পান খাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তুমি তো পান খাওয়া ছাড়া কাজে মনোযোগ দিতে পারো না। এই নাও পান খাও, মন দিয়ে কাজ করো। এমন ছোট ছোট জিনিস আমাকে অবাক করেছে। বার বার উপলব্ধি করিয়েছে এই বিভাগ, বিভাগের মানুষেরা আমাকে কতটা আপন করে নিয়েছে।
দুলালের চাকরির মেয়াদ আর সাড়ে তিন বছর। চাকরি শেষ করে সস্ত্রীক ভারতের গয়ায় তীর্থে যেতে চান তিনি। এরপর স্বশরীরে দেশে আসতে পারলে এবং জীবনের চূড়ান্ত অবসানে দেহ’রও অবসান ঘটাবেন মানবকল্যাণে। তার ইচ্ছা নিজের জন্মস্থান নোয়াখালীর মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগে দান করবেন নিজের দেহ, যে ঘোষণাটা এরইমধ্যে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।
স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েও তার এই সিদ্ধান্তে খুশি। সিদ্ধান্তটি জানার পর তারা দুলালকে কোনো ধরনের বাধা দেয়নি।
দুলাল জানান, তার এমন সিদ্ধান্তের কারণে বহু প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। বলেন, ‘আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছে তোমার ধর্মীয় বিশ্বাস ও নিয়মের বাইরে এ কাজ করা ঠিক হচ্ছে না। কেন তুমি এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে গেলে? তাদের বলেছি, নিজের ধর্মের প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আছে আমার। আমার এলাকায় আমি মন্দির কমিটির সদস্য হিসেবেও দীর্ঘ ৬ বছর দায়িত্ব পালন করেছি, এখনও করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘নিজের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমি মনে করি আমার মরদেহ পুড়িয়ে ফেললে তা কোনো কাজে আসবে না। এটা তো লোকদেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি লোকদেখানো কর্মকা-ের বিরুদ্ধে। পরিবারকে বলে রেখেছি, আমার মৃত্যুর পর ধর্মীয় সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দেহটা যেন মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘মরণোত্তর দেহদানের ইচ্ছে আমার আগে থেকেই ছিল। তবে এই ইচ্ছে আরো প্রবল হয়েছে নাট্যকার শান্তনু বিশ্বাসের মরদেহ মেডিকেলে দান করার পর। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা আমাকে স্তম্ভিত করেছে, তাক লাগিয়ে দিয়েছে। অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে নিজের দেহ দান করতে। ঘটনাটা এমন- শিল্পী শান্তনু বিশ্বাসের মরদেহ মেডিকেলে দান করার সময় তার এক ভক্ত এই এনাটমি বিভাগে আসেন। আমি যতদূর জানি, ভদ্রমহিলা ব্রিটিশ অ্যাম্বেসিতে কাজ করেন, বাড়ি রংপুর। তিনি একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। শান্তনু বিশ্বাসের মরদেহ দান করেছেন দেখে তিনিও নিজের দেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে দান করার জন্য চুক্তি করেছেন। এ ঘটনা জানার পর বিএমএ’র একজন সদস্য এই ভদ্রমহিলাকে স্যালুট করে বলেছেন, আমি ডাক্তার হয়ে যা পারিনি আপনি একজন ভক্ত হয়ে তা পেরেছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে দুলাল বলেন, ‘ চমেকে ৩৩ বছরের চাকরিজীবনে ১৪ বছর নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি এনাটমি বিভাগে। এই কলেজ, বিভাগের জন্য কতটুকু করতে পেরেছি জানি না। তবে চেষ্টা করছি। কিন্তু নিজের জন্মস্থান নোয়াখালীর জন্য এখন পর্যন্ত তেমন কিছু করতে পারিনি। যেহেতু আমি এনাটমি বিভাগে কাজ করেছি তাই চাকরি শেষে নোয়াখালীর আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগেও সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই, যেখানেই মরণোত্তর দেহ দান করতে চাই।’
দুলাল চন্দ্র দাশের ছেলে আকাশ দাশ বলেন, ‘প্রত্যেক সন্তানের মত আমারও ইচ্ছা- ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বাবার দেহ সৎকার করবো। তবে এটাও মনে করি যেহেতু বাবা দেহদানের ইচ্ছা পোষণ করেছেন তাই সেটি তার করা উচিৎ। যেদিন বাবা আমাদের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানিয়েছেন আমি তখন বাবাকে বলেছিলাম, এর মাধ্যমে যদি আপনি মানসিক তৃপ্তি পান তাহলে অবশ্যই করুন। সবার এমন সৎসাহস হয় না। আপনার এমন কাজ আমাদের জন্য গর্বের, অহংকারের।
