সিসিসির টিকা কার্যক্রমে অর্থআদায়, অনিয়ম ও নৈরাজ্যের অভিযোগ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : বিগত সময়ে চট্টগ্রামে করোনার টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে অহরহ অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বেশিরভাগই ছিল ভোগান্তির শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের। তবে এবার টিকা কার্যক্রম নিয়ে আর্থিক বাণিজ্য, অনিয়ম ও সরকারি নিয়মনীতির লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় স্বেচ্ছায় সেবাদানকারী যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবকেরা।

অভিযোগ আছে, লাইনের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের টিকা সংকটের কথা জানিয়ে ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকার বিনিময়ে লাইনের সামনে এনে রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়মবহির্ভূতভাবে নাম এন্ট্রি করতে বাধ্য করছে হাসপাতাল কর্মচারীরা। কখনও হাসপাতালের ক্ষমতা দেখিয়ে, কখনও প্রভাবশালীদের আত্মীয় পরিচয়ে আবার কখনও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভয় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত চলছে এমন অনিয়ম।

ম্যাসেজ পাঠানো নিয়েও অসদুপায় অবলম্বন করে অর্থ হাতানোর অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালে টিকাপ্রাপ্তির উপর ভিত্তি করে নিবন্ধিত মানুষের কাছে টিকা নেওয়ার তারিখ জানিয়ে ম্যাসেজ পাঠানোর কথা থাকলেও বেশ কিছু কেন্দ্রে টাকার বিনিময়ে তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে। এজন্য মানুষ ভেদে ২০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এসকল কর্মকা-ের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন হাসপাতালের কম্পিউটার অপারেটরা।

অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, নিয়ম লঙ্ঘন ও অবৈধ উপায়ে টিকা লুটপাটের মত ঘটনার নিরব সাক্ষী এসব স্বেচ্ছাসেবকেরা মুখ খোলার পর একের পর এক সামনে আসছে টিকা-কার্যক্রমের আসল চিত্র। তাদের অভিযোগ, এসব অবৈধ কর্মকা- তাদের দিয়ে অনেকটা জোর করেই করাচ্ছে হাসপাতালে কর্মচারী ও স্থানীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তরা। আর এসব অসঙ্গতির সাথে যুক্ত না থেকেও সাধারণ জনগণের রোষানলে পড়তে হচ্ছে তাদের।

যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রামের এক স্বেচ্ছাসেবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘টিকা নিতে প্রতিদিন হাজারখানেক মানুষ লাইন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকেরা সিরিয়াল অনুযায়ী সকলের নাম খাতায় লিপিবদ্ধ করে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য বুথে পাঠান। কিন্তু গত ১ মাস ধরে টাকার বিনিময়ে টিকা নিতে সাহায্য করছেন হাসপাতালে কর্মচারীরা। এতে অপেক্ষমান বাকি মানুষেরা আমাদের উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মেমন হাস্পাতালের কর্মচারীদের এমন অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকা-ের কারণে কয়েকদিন আগে টিকা নিতে আসা সাধারণ মানুষেরা আমাদের বন্দী করে রাখে। অথচ এসবের পেছনে জড়িত হাস্পাতালের কর্মচারীরা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা ৯৯৯ কল করে পুলিশের সাহায্য নিয়ে ওই স্থান থেকে বের হয়ে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘এমন অনিয়ম সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বুধবার (১৮ আগস্ট) আমরা মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল থেকে আমাদের যুব রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকদের প্রত্যাহার করেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এমন অনিয়ম চলতে থাকলে আমরা আর সেবা দিবো না। জানতে পেরেছি আমরা চলে যাওয়ার পর ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কাছের লোক পরিচয় দিয়ে খোকন নামের এক ব্যক্তি জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে তুলেছে।’

না প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ছাফা মোতালেব মাতৃসদন হাসপাতালে টিকা প্রদান কার্যক্রমে যুক্ত থাকা যুব রেডক্রিসেন্টের এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ‘ছাফা মোতালেব মাতৃসদন হাসপাতালের কম্পিউটার অপারেটর আবদুল্লাহ আল মামুন টাকার বিনিময়ে টিকা নেওয়ার ম্যাসেজ পাঠানোর কাজ করছে। এমনও হচ্ছে ম্যাসেজ ছাড়া টিকা নিতে এসে তাকে ৫০০ টাকা দিলে তিনি তখনই ম্যাসেজ পেয়ে যান। পরে তার সাহায্যে টিকা দিয়ে চলে যান।’

যুব রেডক্রিসেন্টের আরেক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন জেনারেল হাসপাতালে টিকা প্রদান কার্যক্রমে মাসখানেক ধরে দায়িত্ব পালন করছি। এখানে মহিউদ্দিন ও চন্দন নামে দুজন ব্যক্তি টিকা-কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জনপ্রতি ৫০০-৮০০ টাকার বিনিময়ে তারা গেট থেকে মানুষ ঢুকিয়ে আমাদের কাছে এনে নাম এন্ট্রি দিতে বলে। আমরা অপারগতা জানালে নানারকম হুমকি দেয়। আমরা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে গিয়ে তাদের হুমকি কেন শুনবো?’

সরেজমিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতাল, সিটি কর্পোরেশন ছাফা মোতালেব মাতৃসদন হাসপাতাল এবং সিটি কর্পোরেশন মেমন মাতৃসদন হাসপাতালে গিয়ে টিকা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, ম্যাসেজ না থাকলেও টাকা দিলে টিকা পাওয়া যাচ্ছে। আবার মেসেজ থাকা সত্ত্বেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে অনেককে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের যারা ৫শ’-১ হাজার টাকা ধরিয়ে দিচ্ছেন মুহূর্তেই তাদের লাইন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে। কিংবা লাইনবিচ্যুত হয়ে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় টিকা গ্রহণ করে চলে যাচ্ছেন।

সিটি কর্পোরেশন মেমন মাতৃসদন হাসপাতালে ২য় ডোজের টিকা নিতে এসেছেন গীতা কুমারী। টিকা কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমরা সকল নিয়ম অনুসরণ করে টিকা নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এখানের কর্মচারীরা টাকা দিলে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে। আমরা এর প্রতিবাদ করলে টিকা পাবো না বলে ভয় দেখায়। মাইকিং করে সরাসরি বলে দিলেই তো হয় যে টাকা দিলে টিকা পাবো, না দিলে পাবো না!’

সিটি কর্পোরেশন ছাফা মোতালেব মাতৃসদন হাসপাতালে টিকা নিতে আসা এহতেশাম হারুন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছি। একজন লোক মানুষের কাছে গিয়ে টাকা তুলছেন। তাকে একজন বললো আমার ম্যাসেজ নেই টিকা নিতে পারবো। উনি বলেন, ৫০০ টাকা বের করেন এখনই ম্যাসেজ পেয়ে যাবেন, সাথে টিকাও। আমি খেটে খাওয়া মানুষ। সারাদিনে ইনকাম ৩০০ টাকাও হয়না তাদের ৫০০ টাকা দিবো কীভাবে? এখন মনে হচ্ছে টিকা না নিয়েই চলে যেতে হবে।’

একাধিক টিকা কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে কথা বললে তারাও একই অভিযোগ জানান। তবে সঙ্গতকারণে কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তারা জানান, প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকা বরাদ্দ থাকে। কিন্তু বরাদ্দকৃত এসব টিকা নিতে আসা মানুষেরা ঠিকমত টিকা পাচ্ছেন না। হাসপাতালের কর্মচারী থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি এই টিকা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে চক্রটি টিকা বাণিজ্য করছে। শুধুমাত্র টিকা প্রদানের সাথে সম্পৃক্ততা থাকায় এবিষয়ে কিছুই করতে পারছেন না তারা।

তাদের মতে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত এসব হাসপাতালে সংস্থাটির কোনো তদারকি না থাকার সুযোগ নিয়ে হাসপাতাল কর্মচারীরা নিজের ইচ্ছেমতো এসব অনিয়ম করে যাচ্ছেন। হাসপাতালের কর্মচারীরা টিকার কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে লাইনে দাঁড়ানো মানুষকে টাকার বিনিময়ে টিকা নিতে অনেকটা বাধ্য করছেন। কিন্তু এমন অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকা- নিয়ে চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

টিকা কার্যক্রমে এমন অনিয়মের বিষয়ে হাসপাতালের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও তেমন কোনো সমাধান পাননি রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকেরা। উল্টো তারাই এসব অনিয়ম নিয়ে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ জানাতে অনুরোধ করেন। যদিও সিটি করপোরেশন মেয়র, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানিয়েও এর কোনও সুরাহা পাননি যুব রেডক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকেরা। বার বার জানানোর পর স্বেচ্ছাসেবকদের কেবল আশ্বাস ও দায়সারা বক্তব্য দিয়েছেন তারা।

যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল একজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে টিকাদান কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্যের বিষয়ে মেয়রের কাছে গত দুই সপ্তাহ ধরে অভিযোগ জানিয়ে আসছি। শেষমেশ তিনি আমাদের জানালেন এখানে উনার (মেয়র) কিছুই করার নেই। অন্যদিকে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অভিযোগ জানালে তিনি আমাদের বলেন, অনিয়ম হচ্ছে এখন আমরা কী করবো? বেশ কয়েকবার অনুরোধের পর তিনি বলেন, আচ্ছা দেখি কিছু করা যায় কিনা।’

জানা গেছে, যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবকেরা এসব বিষয়ে নিজেদের মধ্যে একটি বৈঠকের আয়োজন করে। রেডক্রিসেন্ট ও যুব রেডক্রিসেন্টের নীতিনির্ধারকেরা ওইসব কেন্দ্রে সেবা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতাল ও মেমন হাসপাতাল এবং বৃহস্পতিবার সিটি কর্পোরেশন ছাফা মোতালেব মাতৃসদন হাসপাতাল থেকে স্বেচ্ছাসেবক সরিয়ে নিয়েছে যুবক রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রাম। আগামী সোমবার জেলা প্রশাসকের কাছে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জানাবেন তারা।

এদিকে যুবক রেডক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবক সরিয়ে নেওয়ার ৩ দিন পার হয়ে গেলেও এবিষয়ে কিছুই জানেন না সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি জহর লাল হাজারী। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘টিকা কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। আর রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকেরা যে কেন্দ্র ত্যাগ করেছে এই ধরনের কোনো খবরও আমার কাছে আসেনি। যেহেতু এখন জানতে পেরেছি আজই মেয়র মহোদয়ের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরীর মোবাইল ফোন নাম্বারে একাধিকবার ফোন করলে প্রত্যেকবারই তিনি ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে বিষয়টি জানিয়ে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের পর তিনি ফোন ধরেন। টিকা বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো যুব রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানান তিনি।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রাম স্বেচ্ছাসেবকদের বলেন প্রমাণ দিতে। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধে আমি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করবো। সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে এমন ঘটনায় দুটি মামলা করেছে। কারণ ভুয়া অভিযোগ দিয়ে মানুষকে হয়রানি করার বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে তাদের সোজা করার দরকার।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের কোনো অভিযোগই জানায়নি। যুব রেডক্রিসেন্টের কেউ আমাদের মৌখিক বা লিখিত কোনওভাবেই অভিযোগ জানায়নি। আর তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগ হয়? আপনি তাদের বলেন তথ্যপ্রমাণ নিয়ে আমাদের লিখিত অভিযোগ জানাতে। প্রমাণ দিতে পারলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিবো।’

এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেশ কয়েকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।