চট্টগ্রামের বাসিন্দা পুলিশ কর্মকর্তাদের গণবদলি

মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সিএমপি থেকে ‘চাঁটগাইয়্যা খেদাও’ থামছেই না। গত ছয় মাসে বিভিন্ন পদমর্যাদার অর্ধশতাধিক চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট নগরের পাহাড়তলী থানার ওসি হাসান ইমাম এবং ইপিজেড থানার ওসি উৎপল বড়ুয়ার বদলির আদেশ এসেছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। পুলিশের এ দুই কর্মকর্তা জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা।

এর আগে সিএমপির চকবাজার থানার আলোচিত ওসি মোহাম্মদ আলমগীরকে প্রথমে রাজশাহী ও পরে ঢাকা রেঞ্জে বদলি করা হয়। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা ওসি আলমগীরকে জাতিসংঘ মিশন থেকে ফেরার পর মাত্র ৩ মাস আগে চকবাজার থানায় পদায়ন করা হয়েছিল।

চট্টগ্রামের বাসিন্দারা সিএমপিতে চাকরি করতে পারবেন না, পুলিশ সদর দপ্তররের অলিখিত এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি পৌঁছেছে চট্টগ্রামের মন্ত্রী-এমপিদের কানেও। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সিএমপিতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতংক এবং অস্বস্তি।

বিষয়টি নিয়ে শনিবার (২১ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে একুশে পত্রিকার এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এর সাথে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটা সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তের অংশ, সেহেতু সরকারের নির্বাহী পদে থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সঠিক হবে না। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি বৈষম্যের স্বীকার হয়ে থাকেন, আর রুলসটা যদি বৈষম্যমূলক হয় তাহলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব। এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে কেউ আমার কাছে এলে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করব।’

একই বিষয়ে শনিবার দুপুরে জানতে চাইলে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দারা সিএমপিতে চাকরি করতে পারবেন না, এমন কোনো বিধান পুলিশ প্রবিধান ও সিএমপি অধ্যাদেশে নেই। গত ছয়মাসে অর্ধশতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বদলির বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, এটা স্বাভাবিক কার্যক্রমেরই অংশ।

সিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাদের সিএমপি থেকে বদলির আদেশ দিয়েছে সদর দপ্তর, তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম বা অদক্ষতার অভিযোগ নেই। শুধু চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় তাদের বদলিকে ‘শাস্তিমূলক’ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি নিয়ে কিছুদিন একুশে পত্রিকায় কথা বলেন নগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি বলেছিলেন, ‘পুলিশ প্রবিধানে আছে, যার বাড়ি যে জেলায়, তিনি সেখানে চাকরি করতে পারেন না। অপর একটি নীতিমালায় বলা হয়েছে, যে জেলার বাসিন্দা, সে জেলার মেট্রোপলিটন ইউনিটেও চাকরি করা যাবে না। এর কারণ নিজ জেলায় বা মেট্রোপলিটনে চাকরি করলে সংশ্লিষ্টদের ওপর তদবিরের চাপ থাকে। শুধু চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের নয়, ধারাবাহিকভাবে যারা দীর্ঘদিন ধরে সিএমপিতে চাকরি করছেন, তাদেরও বদলি করা হচ্ছে, হবে। বদলির এ প্রক্রিয়া পুলিশ বিভাগে স্বাভাবিক কার্যক্রমেরই অংশ।’

অবশ্য শনিবার সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত নতুন করে তার (পুলিশ কমিশনার) বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

বদলির শিকার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, ‘দেশের পুলিশ বিভাগের অন্যান্য ইউনিটগুলোয় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না। শুধু চট্টগ্রামেই এ নীতিমালা বাস্তবায়ন হচ্ছে। যা বৈষম্যমূলক।’

সিএমপিতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের গণবদলির বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পিপি এডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আনোয়ারা উপজেলায় সংঘটিত পুলিশের একটি ঘটনার জের ধরেই সিএমপি থেকে চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের গণবদলি করা হচ্ছে। ওই ঘটনায় বদলি করা পুলিশ সদস্যের মধ্যে আমার একজন গানম্যানও ছিল। যার বাড়ি জন্মসূত্রে চট্টগ্রাম। সে অনেক ভালো ছেলে। অনেক চেষ্টা করেও আমি তাকে রাখতে পারিনি। সেই ঘটনার পর থেকে পুলিশ প্রবিধান বা নীতিমালার ধোয়া তুলে এসব করছেন সংশ্লিষ্টরা।’

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন ‘পুলিশ প্রবিধান বা সিএমপি অধ্যাদেশ কোথাও সুনির্দিষ্টভাবে এ ধরনের আইন নেই। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ এবং সিএমপি তো আলাদা ইউনিট। পুলিশের সব ইউনিটে বদলির নীতিমালা অভিন্ন। এক জেলায় এক নিয়ম, অন্য জেলার ক্ষেত্রে আরেক নিয়ম হলে পুলিশ প্রবিধান ও সিএমপি অধ্যাদেশ পরিবর্তন আনা দরকার।’

জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৩৬ জন পুলিশ কনস্টেবলকে একযোগে আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়নে বদলি করা হয়। যাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামে। গত ২৭ মে সিএমপিতে কর্মরত আটজন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও তিনজন সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার ১১ জন কর্মকর্তাকে দেশের অন্য ইউনিটে বদল করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯ জন জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা। বাকি দুজনের বাড়ি পার্বত্য জেলায়।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সদর দপ্তরের নির্দেশে সিএমপিতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের তালিকা প্রণয়ন শুরু করে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনায় আসায় বদলির সিদ্ধান্ত কয়েকমাস থমকে ছিল। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে সিএমপি থেকে একের পর এক চট্টগ্রামের বাসিন্দা পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি শুরু হয়। এর আগে ২০২০ সালেও শতাধিক পুলিশ সদস্যকে সিএমপি থেকে বদলি করা হয়েছিল।

জানা গেছে, সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০১৯ সাল থেকে সিএমপিতে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে তালিকা করা শুরু হয়। সিএমপিতে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার পাশাপাশি বিতর্কিতদের নিয়েও এ তালিকার তৈরির কাজ চলে। নাম প্রকাশ না করে চট্টগ্রামের কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘শুধু চট্টগ্রামকে টার্গেট করে বদলি আদেশ দেওয়া হয়রানি ও বৈষম্যমূলক।’

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একটা নিয়ম সব জায়গায় হওয়া উচিত। নিজ জেলায় কর্মরত কোনও পুলিশ কর্মকর্তা পেশাগত দায়িত্ব পালনে সততা নিষ্ঠার পরিচয় না দেন, শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজ বা অনিয়ম করেন, তাহলে বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলারক্ষার ক্ষেত্রে বদলির বিষয়টি ঠিক আছে। কিন্তু সে নিয়ম সব জায়গায় একই হওয়া উচিত, কারণ এটা যেন চট্টগ্রাম থেকে যাদেরকে জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা বলে বদলি করা হচ্ছে তাদের মধ্যে যেন ক্ষোভ জন্ম না নেয়।’