করোনা আপনার, দায়িত্ব মোস্তফা-হাকিম আইসোলেশন সেন্টারের


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : নবজাতকের জন্ম দিয়েই করোনা -শনাক্ত হয় পুষ্পা আকতারের। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮০-এর নিচে নেমে আসে। মুমূর্ষু অবস্থায় গত ১২ আগস্ট ‘মোস্তফা-হাকিম করোনা আইসোলেশন সেন্টারে’ নেওয়া হয় তাকে। ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সেবায় বর্তমানে তিনি অনেকটা সুস্থ। অক্সিজেন স্যাচুরেশনও আছে স্বাভাবিক পর্যায়ে।

পুষ্পা আকতার যখন আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হন সেসময় তার নবজাতককে দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। তাই নিজের শিশুকেও সাথে নিয়ে আসেন। কর্তব্যরত ডাক্তার-নার্সরা যে শুধু তার চিকিৎসা করছেন তা নয়, শিশুটিরও দেখাশোনা করছেন। দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় সকল পরামর্শ। এতদিন ধরে আইসোলেশন সেন্টারে থাকলেও বিনিময়ে পুষ্পাকে কোনো পয়সাই দিতে হচ্ছে না। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, ওষুধ ও খাবার পাচ্ছেন তিনি।

৮ আগস্ট করোনা পরীক্ষা করান আবু তাহের। ৯ আগস্ট রিপোর্ট হাতে আসার পর জানতে পারেন তিনি করোনা পজেটিভ। ভয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন আবু তাহের। পরিবারের সদস্যদের কপালেও পড়ে চিন্তার ভাঁজ। এমন সময় তিনি জানতে পারেন ‘মোস্তফা-হাকিম করোনা আইসোলেশন সেন্টার’ সম্পর্কে। দেরি না করে পরদিনই ভর্তি হয়ে যান। সেই থেকে বিনামূল্যে সেবা পাচ্ছেন এই আইসোলেশন সেন্টারে।

আবু তাহের একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আইসোলেশন সেন্টারে যেভাবে সেবা দেওয়া হচ্ছে তার কোনো তুলনা হয় না। ডাক্তার-নার্স আমাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। খাবার, ওষুধ- সবই বিনামূল্যে পাচ্ছি। টাকা দিলেও তো এরকম সেবা পাওয়া যায় না। আমার মনে হয় না চট্টগ্রামের কোথাও কোনো আইসোলেশন সেন্টার এ ধরনের সেবা দিয়েছে বা দিচ্ছে।’

মোস্তফা-হাকিম করোনা আইসোলেশন সেন্টারের পুরুষ ওয়ার্ডে সেবা নিচ্ছেন কাট্টলীর বাসিন্দা আবুল বশর। তিনি পেশায় দিনমজুর। ৭ আগস্ট করোনা-শনাক্ত হলেও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেননি। ১১ আগস্ট পর্যন্ত পড়েছিলেন ঘরের এক কোণে। পরবর্তীতে উক্ত আইসোলেশন সেন্টারের সকল রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা জানতে পেরে ১২ আগস্ট ভর্তি হন।

একুশে পত্রিকাকে আবুল বশর বলেন, ‘করোনার চিকিৎসার খরচ বহন করার ক্ষমতা না থাকায় ঘরেই আলাদা হয়ে পড়ে থাকতাম। পরে এখানের এক ভলান্টিয়ার আমার কথা জানতে পেরে আমাকে এনে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। গাড়িভাড়া দিয়ে যে এসেছি তা ছাড়া আমার একটা টাকাও খরচ হয়নি। সেবার মান অনেক ভালো, নামি-দামি হাসপাতালকেও হার মানাবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাদের এই সেবায় আমি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবো।’

করোনা রোগীদের জন্য এ উদ্যোগের আয়োজক মোস্তফা-হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। করোনা আক্রান্তদের ভর্তির জন্য যখন চট্টগ্রামের কোনো হাসপাতালে শয্যা পাওয়া যাচ্ছিল না, স্বজনেরা হাহাকার করছিলেন ঠিক সেই সময়ই এগিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। নগরের উত্তর কাট্টলী মোস্তফা-হাকিম ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে গড়ে তুলেছে ৫০ শয্যার করোনা আইসোলেশন সেন্টার। ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের নিজ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে আইসোলেশন সেন্টারটি।

গত ৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের মাধ্যমে যাত্রা শুরুর পর এই অল্প সময়েই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে আইসোলেশন সেন্টারটি। ৫০ শয্যার এই আইসোলেশন সেন্টারে পুরুষ ও মহিলার জন্য আলাদা ওয়ার্ড রয়েছে। পুরুষ ওয়ার্ডে ৩৫ শয্যা এবং মহিলা ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ১৫ টি। রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখার জন্য শয্যাপাশে রাখা হয়েছে একটি করে ড্রয়ার। প্রতিটি শয্যার সাথে রয়েছে ১৫ লিটারের একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার। রোগীর সুবিধার্থে শয্যাপ্রতি একটি করে ফ্যানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া পুরুষ ও মহিলার জন্য রয়েছে আলাদা শৌচাগার।

রোগীর খাবার ও ওষুধের যাবতীয় খরচ বহন করছে মোস্তফা হাকিম ফাউন্ডেশন। শুধু যে রোগীকে খাবার দেওয়া হয় তা নয়, রোগীর সাথে থাকা অভিভাবকের জন্যও একইভাবে খাবার দেওয়া হয়। বিনামূল্যে চার বেলা খাবারের পাশাপাশি রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে দুটি চুলা। যেখানে থেকে যখন ইচ্ছা তারা গরম পানি খাওয়া ও ব্যবহার করতে পারেন। রাখা হয়েছে সার্বক্ষণিক চায়ের ব্যবস্থা। এছাড়া রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল ইনজেকশন থেকে শুরু করে সকল ওষুধ সরবরাহ করছে এই আইসোলেশন সেন্টার।

শুধু যে রোগী নয় হাসপাতালে সেবাদাতা চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ সুব্যবস্থা। ডাক্তার ও নার্সের জন্য আলাদা চেম্বার রাখা হয়েছে। সাথে আছে তাদের রেস্ট রুম। চিকিৎসা দিয়ে সেখানেই বিশ্রাম করতে পারেন তারা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই রেস্ট রুমের মধ্যে খাট, মশারি ও শৌচাগারসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। তাদের খাবার-দাবারসহ প্রয়োজনীয় সকল জিনিসের ব্যবস্থাও করছে মোস্তফা-হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।

রোগীদের সেবায় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সার্বক্ষণিক থাকছেন আইসোলেশন সেন্টারে। পাশাপাশি সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকের একটি টিম এই আইসোলেশন সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা সেবা  দিচ্ছে। রয়েছে ডিপ্লোমাসম্পন্ন দুজন নার্স, যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা ইউনিটে কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালের নার্স, আয়া ও ওয়ার্ডবয়ের একটি টিম সেবা দেন এই আইসোলেশন সেন্টারে। বর্তমানে ১৩ জন চিকিৎসক, ৯ জন নার্স, ২৩ জন স্বেচ্ছাসেবক আছেন যারা প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এই আইসোলেশন সেন্টারটি ২৪ ঘন্টা মনিটরিং করা হচ্ছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে। এছাড়া আইসোলেশন সেন্টারের প্রবেশ ও বাহির হওয়ার মুখে, রিসেপশন, রান্নাঘর এবং সিঁড়িতেও স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। একজন স্বেচ্ছাসেবক এসব সিসিটিভি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিকভাবে মনিটর করেন হাসপাতালের সকল কার্যক্রম।

উদ্যোক্তারা জানান, সার্বক্ষণিক আউটডোর চিকিৎসা সেবাও দিয়ে যাচ্ছেন এই আইসোলেশন সেন্টারের চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। এছাড়া সেবা নিতে আগ্রহী যে কেউ চাইলে সরাসরি এসে এই আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হতে পারবেন। তাছাড়া ‘আলহাজ্ব মোস্তফা-হাকিম করোনা আইসোলেশন সেন্টার’ এই ফেইসবুক পেইজে কিংবা ০১৮৭৯ ৪৭০৭৭৭ নাম্বারে ফোন করে বা হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে যোগাযোগ করেও এই আইসোলেশন সেন্টার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। নিজে আসতে অপারগ রোগীর জন্য ২৪ ঘণ্টা একটি অ্যাম্বুলেন্স সেবা রয়েছে আইসোলেশন সেন্টারের পক্ষ থেকে।

জানতে চাইলে মোস্তফা-হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের পরিচালক সরওয়ার আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গতবছর চট্টগ্রামে আমরা বেশকিছু আইসোলেশন সেন্টারে স্থাপন করতে দেখেছি। কিন্তু এবার যখন কারোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসে তখন পর্যাপ্ত আইসোলেশন সেন্টার না থাকায় চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্তরা অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে। আমরা উপলব্ধি করি যে আসলেই আইসোলেশন সেন্টারের প্রয়োজন। সেই উপলব্ধি-তাগাদা থেকেই আমাদের এই প্রচেষ্টা।’

মোস্তফা-হাকিম আইসোলেশন সেন্টারের সমন্বয়ক ডা. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. মনজুর আলমের ইচ্ছাতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা। একটা আইসোলেশন সেন্টার করতে পরিবেশ কেমন হবে, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও আয়া পাওয়া যাচ্ছে কিনা, আইসোলেশন সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আছে কিনা তা মাথায় রেখে এসবের সমন্বয় করাটা খুবই কষ্টসাধ্য। কিন্তু আমাদের স্বার্থকতা এখানেই যে এসব আমরা গুছিয়ে মানুষকে সেবা দিতে পারছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে যখন শুরুতে এই আইসোলেশন সেন্টারের ধারণা দেওয়া হয় এবং তা করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তখন আমাদের পরিকল্পনা ছিল আমরা বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা প্রদানের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দিবো। পরবর্তীতে মোস্তফা হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন সিদ্ধান্ত নেয় যে রোগীর সমস্ত ওষুধের খরচ তারা বহন করবে। বর্তমানে রোগীপ্রতি আমরা প্রায় ১৪ হাজার টাকা ওষুধ বিনামূল্যে দিচ্ছি। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় যে রোগীর চারবেলা খাবারও ফাউন্ডেশন থেকে দেওয়া হবে। সেভাবেই এখন পর্যন্ত আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’

আইসোলেশন সেন্টারের পাশাপাশি প্রয়োজনে আইসিইউ স্থাপন করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। তিনি বলেন, ‘আইসোলেশন সেন্টার নিয়ে আমরা যেভাবে এগিয়ে এসেছি তেমনি প্রয়োজনে মোস্তফা-হাকিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে আইসিইউ স্থাপন করা হবে। আমার এই পরিকল্পনা আছে। ইতোমধ্যে আইসোলেশন সেন্টারের উপরের তলায় আমরা একটা সেটআপ করে রেখেছি। আমাদের নিজস্ব অক্সিজেনের ব্যবস্থাও আছে। প্রয়োজনে আইসিইউ স্থাপনে আমরা যে কোনো সময় ব্যবস্থা নিতে পারবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘একই জায়গায় মাতৃসদন হাসপাতালের সেবা, করোনার টিকাদান কার্যক্রম এবং আইসোলেশন সেন্টারের সমন্বয় চট্টগ্রামে অন্য কোথাও নেই। হাসপাতাল, টিকা কেন্দ্র ও আইসোলেশন সেন্টারের কার্যক্রম তদারকি করতে আমি প্রতিদিন সকালে ওখানে যাই, টিকা নিতে আসা মানুষের সাথে কথা বলি, রোগীর সাথে কথা বলি। তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা নিজে জানার চেষ্টা করি। এখন পর্যন্ত সকলের কাছে আমার এসব প্রচেষ্টার সুনামই পেয়েছি। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ভবিষ্যতেও মানুষের জন্য এভাবেই কাজ করে যেতে চাই।’