স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দোষী, দুদকে নির্দোষ

শরীফুল রুকন : ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভান্ডার) পদে ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে কোকেন মামলার আসামি নূর মোহাম্মদকে অবৈধভাবে ৮ মাস ২৩ দিন চমেক হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে অবস্থানের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধেও। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও উঠে আসে ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীর সম্পৃক্ততা। ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তার বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন চমেক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চার বছর তদন্তের পর দুদক আদালতকে জানিয়েছে, ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরী নির্দোষ।

এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে কোকেন উদ্ধারের ঘটনায় ২০১৫ সালের ২২ জুন চট্টগ্রামের বন্দর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের হয়। এতে প্রধান আসামি করা হয় খান জাহান আলী গ্রুপের মালিক নূর মোহাম্মদকে। মামলার পর পুলিশ নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে। পরে ২০১৬ সালের ১৪ মে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। সেদিনই তাকে ভিআইপি মর্যাদায় ২৯ নং ওয়ার্ডের ২২ নং কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। কেবিনে থাকাকালে সেখানে তার ব্যবসায়িক কাজকর্ম চলা, আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন স্তরের লোকজন অবাধে যাতায়াত শুরু করে বলে অভিযোগ উঠে। দিনে তিন শিফটে আট ঘণ্টা করে দুজন কনস্টেবল কেবিনের বাইরে ডিউটি করলেও তারা ভেতরে যান না বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

এভাবে দুই মাস চলার পর নূর মোহাম্মদকে ছাড়পত্র দিতে ২০ জুলাই চিঠি দেয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাল্টা চিঠি পাঠিয়ে জানায়, নূর মোহাম্মদের চিকিৎসা শেষ হয়নি। অথচ কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে খবর ছিল, নূর মোহাম্মদ সুস্থ। ২০১৭ সালের শুরুতে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানায় চট্টগ্রাম কারাগার কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় থেকে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হলে ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নূর মোহাম্মদকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চমেক হাসপাতালের পরিচালক বরাবর পাঠানো ২০১৭ সালের ১০ জুলাই স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (পার-২) এ কে এম ফজলুল হক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, ‘চাঞ্চল্যকর কোকেন চোরাচালান মামলার আসামি নূর মোহাম্মদকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চমেক হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি এবং অপ্রয়োজনে অবস্থানের সুযোগ প্রদান করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটন করেছেন মর্মে হাসপাতালের প্রাক্তন সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভান্ডার) ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীর (পিআরএল ভোগরত) সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য। এমতাবস্থায়, এরূপ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটনের দায়ে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।’

উক্ত অফিস আদেশ পাওয়ার পর একই বছরের ২৬ জুলাই চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রণব কুমার হাওলাদারকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় মামলা রেকর্ড করেন পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ। এরপর মামলাটি তদন্তের জন্য দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এ পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। পরে মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাক্ষ্য-স্মারক দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম। এ প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১৫ মে প্রধান কার্যালয় কর্তৃক ‘কোয়ারি’ করা হলে পরদিন ২৪ জুন মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল ইসলামকে। তদন্ত শেষে গত ১২ আগস্ট উক্ত মামলায় ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি। গত ২৪ আগস্ট আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি ‘সিন’ করেন বলে দুদকের চট্টগ্রামের কোর্ট পরিদর্শক এমরান হোসেন জানিয়েছেন।

চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, “রোগীকে (নূর মোহাম্মদ) হাসপাতালে তথা হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি এবং হাসপাতালে অবস্থান করার অনুমতি দেওয়ার কোনও প্রক্রিয়ার মধ্যে দায়িত্ব পালন করা তার (ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরী) কর্মপরিধির মধ্যে ছিল না এবং তিনি এরূপ কোনও দায়িত্ব পালন করেছেন মর্মে রেকর্ড ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়নি। বিধায়, অত্র মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে অত্র মামলার দায় হতে অব্যাহতি প্রদানপূর্বক এফআরটি (চূড়ান্ত রিপোর্ট সত্য) দাখিলের সুপারিশ করে সাক্ষ্য-স্মারক দাখিল করা হয়। গত ১৯ জুলাই এফআরটি দাখিলের অনুমোদন দেয় দুদকের প্রধান কার্যালয়।”

দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল ইসলাম জানান, আসামি নূর মোহাম্মদের কেবিন প্রয়োজন বলে প্রথমে সুপারিশ করেন সার্জারি ওয়ার্ড-২৪ এর সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মুহাম্মদ এনামুল হাসান। পরে নিউরো মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. জামান আহমেদ কেবিনের জন্য সুপারিশ করেন। এরপর মেডিসিন বহির্বিভাগ আর.পি ডা. রাজিবুল ইসলাম কেবিন বরাদ্দের অনুমতি প্রদান করেন। এরপর ২০১৬ সালের ২০ জুলাই চট্টগ্রাম কারাগার কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে জানায়, চিকিৎসা কার্যক্রম শেষ হয়ে থাকলে নূর মোহাম্মদকে যেন ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শওকত হোসেন ২৬ জুলাই ও ২০ সেপ্টেম্বর পৃথক দুটি প্রতিবেদনে জানান, নূর মোহাম্মদের আরও চিকিৎসা প্রয়োজন, তাকে এখনই ছাড়পত্র দেয়া যাচ্ছে না। ভর্তিপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যন্ত কোথাও ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলেও জানান দুদকের সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল ইসলাম।

মামলার বাদী চমেক হাসপাতালের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রণব কুমার হাওলাদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, অফিসিয়াল সিদ্ধান্তের কারণে আমি মামলার বাদী হয়েছিলাম। আমি এখন চমেক হাসপাতালে কর্মরত নেই, জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছি। মামলাটির প্রতিবেদন কী দেয়া হয়েছে তা জানি না।’ চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কিছু করার থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।’

চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একটা ঘটনা যেহেতু ঘটে গিয়েছিল, সবাইকে ঢালাও অভিযুক্ত করা হয়েছিল, আমাকেও করা হয়। তবে রেকর্ডপত্র অনুযায়ী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ নেই। যার কারণে আমাকে দুদক অব্যাহতি দিয়েছে।’ অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দোষী সাব্যস্ত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেলের তৎকালীন পরিচালকের ইচ্ছায় আমাকে এ ঘটনায় সম্পৃক্ত করা হয়েছিল।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরী।

এদিকে কোকেন মামলার আসামি নূর মোহাম্মদকে অবৈধভাবে ভিআইপি কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় দুদকের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নাম আসা তিন চিকিৎসকসহ চারজনকে ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তারা হলেন মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম, মুহাম্মদ এনামুল হাসান, রাজিবুল ইসলাম ও জামান আহমেদ। এর মধ্যে তৎকালীন উপপরিচালক মোহাম্মদ দিদারুল ইসলামের বেতন কমিয়ে লঘুদণ্ড দিয়ে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। বাকি তিন চিকিৎসকের বেলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানেন না বলে জানান ডা. শেখ মো. জামাল মোস্তফা চৌধুরী।