বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

‘বিনা দোষে আনসার সদস্যরা গুলি করেছে, এখন পঙ্গু হয়ে গেলাম’

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১, ১০:২৫ অপরাহ্ণ


এম কে মনির, মিরসরাই থেকে ফিরে : ‘আমি চোর নই। আমাকে চোর বানানো হয়েছে। তারা (আনসার সদস্যরা) আমাকে বিনা দোষে গুলি করেছে। আমার দু’পায়ে এখন শতাধিক ছররা গুলি বিদ্ধ হয়ে রয়েছে। যা আর বের করা যাবে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এখন সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলাম।’

ছল ছল চোখে এভাবেই পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বলছিলেন আরিফুল ইসলাম। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট পৌরসভার খিলমুরালী গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে তিনি।

বিএসআরএমের (বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস) কারখানায় দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের গুলিতে পা হারাতে বসেছেন আরিফুল ইসলাম। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গত ৬ সেপ্টেম্বর বারইয়ারহাটের খিলমুরালীস্থ বিএসআরএম কারখানার উত্তর-পূর্ব পাশে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন আরিফুল ইসলাম। করোনা সংকট শুরুর পর তার চাকরি চলে যায়। অন্য কোথাও কাজ না পেয়ে শেষমেশ মিরসরাই এলাকার পাহাড়ে মাল্টা বাগান গড়ে তোলেন তিনি। এই বাগানকে ঘিরে জীবন সংগ্রামের সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন আরিফুল।

গত ৬ সেপ্টেম্বর সারাদিন রোদে পুড়ে পাহাড়ের মাল্টা বাগানের পরিচর্যা শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরছিলেন আরিফ। পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে অন্ধকার তখন ঘনিয়ে আসে। সন্ধ্যা ৭টায় খিলমুরালীস্থ বিএসআরএম কারখানার উত্তর-পূর্ব সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে যাওয়া রাস্তা অতিক্রমকালে বিএসআরএম কারখানার নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যের জেরার মুখে পড়ে আরিফ ও তার ভাগ্নে। চোর সন্দেহে আরিফকে জেরার একপর্যায়ে ডান ও পা বায়ে গুলি করে ওই আনসার সদস্যরা। এসময় আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান আরিফ।

ভাগ্যক্রমে আরিফের ভাগ্নে কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে ঝোপে লুকিয়ে পড়ে। পরে আনসার সদস্যরা স্থান ত্যাগ করলে আরিফের ভাগ্নে তার (আরিফ) বাবাকে ডেকে তাকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে আরিফের অবস্থা শঙ্কটাপন্ন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন চিকিৎসকরা।

ওইদিন থেকে ১১ সেপ্টেম্বর রোববার পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নেন আরিফ। এরপর চট্টগ্রাম নগরে এক আত্মীয়ের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। বর্তমানে তার দু’পায়ের অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। যেকোন সময় পঙ্গু হতে পারেন আরিফ- এমন শঙ্কা তার পরিবারের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বিএসআরএম কারখানায় ৩৫-৪০ জনের একটি চোর চক্র স্ক্র্যাপ চুরির উদ্দেশ্যে হানা দেয়। ওইসময় চোর ও বিএসআরএম কারখানার আনসার সদস্যদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চোর চক্রকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে বিএসআরএমের কারখানায় থাকা আনসাররা। ঘটনার একপর্যায়ে পাহাড় থেকে কাজ শেষ করে ফেরার পথে চোর সন্দেহ করে আরিফকেও গুলি করা হয়। আনসার সদস্যদের ছোঁড়া ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয় আরিফের উভয় পা। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে তাকে চমেকে প্রেরণ করা হয়।

প্রায় ৬ দিন চিকিৎসা শেষে ১১ সেপ্টেম্বর রাতে আরিফের বাবা মো. বাবুল মিয়া বাদী হয়ে বিএসআরএম কারখানার ম্যানেজার (এডমিন) দেলোয়ার মোল্লা ও সহকারী সিকিউরিটি ইনচার্জ ফয়েজ উল্লাহকে অভিযুক্ত করে জোরারগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন। তবে ওই অভিযোগ গ্রহণের কপি আরিফের বাবাকে থানা কর্তৃপক্ষ দেয়নি। কিন্তু অফিসার ইনচার্জ বরাবর লেখা ওই অভিযোগের একটি কপি আরিফের বাবা একুশে পত্রিকার এ প্রতিবেদককে সরবরাহ করেছেন।

এদিকে খিলমুরালী গ্রামের স্থানীয়রা বলছেন, গুলিবিদ্ধ আরিফ চোর নয়, একজন খেটে-খাওয়া নিরীহ যুবক। তারা জানান, আরিফ আগে দোকান করতো। কিছুদিন চাকরি করে৷ এখন পাহাড়ে তার মাল্টা বাগান আছে। কাজ শেষে ফেরার পথে বিএসআরএম কারখানার সিকিউরিটি গার্ডরা তাকে গুলি করে। তার বিরুদ্ধে চুরির কোন রেকর্ড নেই।

জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও খিলামুরালীর বাসিন্দা মো. হানিফ বলেন, আরিফ চুরি করেছে, এমন কোন রেকর্ড নেই। সে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল।

জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, আরিফের চুরির রেকর্ড থাকলে আমি জানতাম। আমাদের এলাকায় বেশ কিছু মাল্টা বাগান রয়েছে। সে বাগানের কাজ করে আসতে পারে। আমি অসুস্থ থাকায় ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত খবর নিতে পারিনি।

এ বিষয়ে আরিফের বাবা মো. বাবুল মিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, কী অন্যায় করেছে আমার ছেলেটা। চাকুরিচ্যুত হয়ে বেকার হয়ে পড়েছিল। নিজ থেকেই সে মাল্টা বাগান করে পাহাড়ে। আমার ছেলে চোর নয়, চোর ছেলে আমি জন্ম দেইনি। আমরা গরীব, কাজ করে ভাত খাই। চুরি করলে মানুষের দোকানে কাজ করতাম না। তারা আমাদের অপবাদ দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এসময় কান্নায় ভেঙে পড়ে মো. বাবুল মিয়া বলেন, আমার ছেলেটার জীবন শেষ করে দিয়েছে বিএসআরএম। সে আর সুস্থ হবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ৷ এখন এই বয়সে তাকে আমার বসিয়ে খাওয়াতে হবে। বিএসআরএম কি পারবে আমাদের পাতের ভাত জুটাতে? তাতো পারবে না। বরং এক দূর্বিষহ জীবনে ফেলেছে আমার ছেলেকে।

শয্যাশায়ী আরিফুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, মাল্টা বাগান করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়েছিলাম। আমি চোর নই। আমাকে চোর বানানো হয়েছে। তারা আমাকে বিনা দোষে গুলি করেছে। আমার দু’পায়ে এখন শতাধিক ছোররা গুলি রয়েছে। যা আর বের করা যাবেনা বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

এ ঘটনার বিচার চেয়ে আরিফ বলেন, আমার বাগানটা কে দেখাশোনা করবে? বন্যপ্রাণীরা তা নষ্ট করবে। আমার জীবনের কোন ভালো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। পা জোড়ার দিকে তাকালে গুমরে কেঁদে ওঠে ভেতরটা। সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলাম।

এ বিষয়ে জানতে ঘটনায় অভিযুক্ত বিএসআরএম কারখানার সিকিউরিটি সহকারী ইনচার্জ ফয়েজ উল্লাহর মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

আরিফুলের বাবার অভিযোগটি রেকর্ড করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে জোরারগঞ্জ থানার ওসি নুর হোসেন মামুন একুশে পত্রিকাকে বলেন, কোন অভিযোগ দেয়া হয়েছে কিনা সেটি দেখে বলতে পারবো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিস্থিতি যদি খারাপ হয় তাহলে তো গুলি করতেই পারে, এটাই হচ্ছে আইনের ব্যাখ্যা। বিএসআরএম তো গুলি করেনি, গুলি করেছে আনসার বা নিরাপত্তা কর্মীরা।

এসময় ওসি মামুন তার বক্তব্যের একপর্যায়ে খিলমুরালী এলাকায় কোন মাল্টা বাগান নেই এবং আহত যুবক চোর চক্রের সদস্য বলে জানান।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসআরএমের ডিপুটি ডিরেক্টর তপন সেন গুপ্ত একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না এবং শুনিও নাই। আপনাকে কে বলেছে এ কথা।

গুলি ছোঁড়ার ঘটনাকে ভুল তথ্য দাবি করে তপন সেন গুপ্ত বলেন, আমাদের গার্ডরা কাউকে গুলি করেনি। করার কথাও না। তবে আমি এসব বিষয়ে জানি না। জেনে জানাতে হবে আপনাকে।

তপন সেন গুপ্ত প্রথমে কিছু না জানার কথা বললেও পরে পত্রিকার মাধ্যমে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি জেনেছেন বলে জানান। এসময় তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আপনি খবর নেন তার বাগান আছে কি না? এতো রাতে সে সেখানে কেন গিয়েছে? গুলির ঘটনা তো কারখানার বাইরে রাস্তায়। এটার জন্য বিএসআরএম কেন দোষী হবে।

থানায় আরিফুলের বাবার অভিযোগ করার বিষয়ে তপন সেন গুপ্ত বলেন, কেউ যদি ইচ্ছে করে ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ করে তাহলে আমাদের কী করার আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিকিউরিটি গার্ডরাই জানে কীভাবে কারখানায় তারা নিরাপত্তা দিবে। সেটি তাদের বিষয়। আমি জানি না। যেভাবে নিরাপত্তার দরকার সেভাবে দিয়েছে নিশ্চয়। এটি তারা ভালো জানে। আমি এসব বিষয়ে অবগত নই।