বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

পরীর পাহাড়ের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হবে

প্রকাশিতঃ বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২১, ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরের কেন্দ্রস্থল পরীর পাহাড়ে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পাঁচটি ভবনসহ অননুমোদিত স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন।

বর্তমানে পরীর পাহাড়ে থাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং ৭১টি আদালত ছাড়া বাদবাকি সব স্থাপনাই উচ্ছেদ করা হবে। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, ‘পরীর পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা যাতে না হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আইন ও বিচার বিভাগকে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়গুলোকে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়, চট্টগ্রাম নগরের কেন্দ্রস্থলে পাহাড়ের চূড়ায় প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে অবস্থিত। এ অংশে রয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ সর্বমোট ৭১ টি আদালত। জেলা প্রশাসকের নামে এখানে সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ১১.৭২ একর জায়গা রয়েছে।

সরকারি ভবনের বাইরে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গায় ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি পাহাড় এবং টিলা কেটে অবৈধভাবে ৫ টি ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ সকল স্থাপনাকে পাহাড় ধস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদির জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি আবারও সরকারের কোনো সংস্থার অনুমোদন ব্যতিরেকে ‘বঙ্গবন্ধু আইনজীবী ভবন’ ও ‘একুশে আইনজীবী ভবন’ নামক দুইটি ১২ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে এবং ৬০০ টি চেম্বার বরাদ্দের জন্য আইনজীবীদের নিকট থেকে ২ লক্ষ টাকা করে ১২ কোটি টাকা আদায় করেছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এছাড়াও কোর্ট বিল্ডিংয়ের চারপাশে আইনজীবীগণ অর্ধশতাধিক অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ দোকানপাট, খাবার হোটেল, ছাত্রাবাস, বস্তি ও মুদি দোকান তৈরি করে ভাড়া আদায় করছে এবং এই স্থাপনাটিকে একটি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। এখানকার অরাজকতার সুযোগ নিয়ে ২০১২ সালে এই কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় জঙ্গি হামলাও হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিরাপত্তা রক্ষার্থে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাসমূহও আইনজীবী নেতৃবৃন্দ অপসারণ করেছেন বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনজীবীগণ কর্তৃক সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণ করে ফেলার কারণে অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনজীবীদের এ সকল স্থাপনার অনেক বিদ্যুৎ লাইন ও পানির লাইনের সংযোগও অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছে বলে গোপনীয় প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়। এতে আইনজীবীদেরকে উশৃংখল আচরণের জন্য দায়ী করে বলা হয়, ইতোপূর্বে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ২ টি বড় কক্ষও দখল করে নিয়েছেন।

প্রতিবেদনটিতে প্রস্তাবনা প্রদান করা হয় যে, চট্টগ্রাম কোর্ট হিল এলাকায় সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড় শ্রেণির জমিতে ইতোমধ্যে স্থাপিত সম্পূর্ণ অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল স্থাপনাসমূহ অপসারণ করা এবং চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি যেন আবারও অবৈধভাবে খাস জমি দখল করে কোর্ট বিল্ডিংয়ের সম্মুখস্থ একমাত্র ফাঁকা জায়গাটিতে কোন অবকাঠামো নির্মাণ করতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা গ্রহণপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন ও বিচার বিভাগকে নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। উপরোক্ত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হলে তাতে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামের পরিবেশ এবং প্রকৃতির অন্যতম এই সম্পদটিকে ধ্বংস করা হয়েছে। ইট পাথরের জঞ্জাল বানানো হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে পরীর পাহাড়কে পঞ্চাশ বছর আগেকার পরীর পাহাড় বানানো হবে।

তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী কোন পাহাড় বা টিলার উপর কোনরূপ স্থাপনা করা যাবে না সরকারের পূর্বানুমতি ব্যাতিত। সিডিএ অনুমোদন দিলেও করা যাবে না। পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারটি হচ্ছে আইন আর সিডিএর হচ্ছে নীতিমালা। নীতিমালা থেকে আইন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

‘পরীর পাহাড়ের পাদদেশের বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান। কেপিআই নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের পঞ্চাশ মিটারের মধ্যে স্থাপনা করতে পূর্বানুমতির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই অনুমতি নেয়া হয়নি। কেপিআই ডিফেন্স কমিটির অনুমোদন ছাড়া এখানে কোন স্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ নেই।’ বলেন জেলা প্রশাসক।

পরীর পাহাড়ের ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে আইনজীবীরা তা কখনও মানবে না। আইনজীবীরা আদালতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি এমনটা হয় আমরা আইনের আশ্রয় নিব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।