
মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম আদালত ভবনখ্যাত পরীর পাহাড়ে আইনজীবীদের নতুন দুটি ভবন নির্মাণ নিয়ে জেলা প্রশাসন ও আইনজীবী সমিতি মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। ভবন দুটির নির্মাণ ঘিরে বর্তমানে উত্তপ্ত আদালতপাড়া।
জেলা প্রশাসন চায়, পরীর পাহাড়কে প্রত্নতত্ত্ব এলাকা ঘোষণা দিতে। কিন্তু বিদ্যমান পাঁচটি ভবনের পাশাপাশি আরও দুটি ভবন নির্মাণ করতে চায় আইনজীবীরা। সেই লক্ষ্যে তারা তোড়জোর শুরু করেছে।
তবে নিরাপত্তা, ঐতিহ্য রক্ষায় সেখানে নতুন করে কোনো স্থাপনা করতে দিতে চায় না চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এই প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হলে এখানে হাজার হাজার সেবাপ্রত্যাশী মানুষ এবং এখানে যারা রয়েছেন তাদের জীবনের উপর মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি হবে। এ সমস্ত অবৈধ স্থাপনা আমরা এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’
তবে আইনজীবীদের দাবি, লিজ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ভবন দুটি নির্মাণ করছেন তারা। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের বাধা দেওয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচ এম জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘সমিতিকে হেয়প্রতিপন্ন করতে ডিসি সাহেব ভবন দুটি নির্মাণের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এটার বিরুদ্ধে আইনজীবী সমাজ অবস্থান নেবে।’
এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পরীর পাহাড়ের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনায় নতুন করে আর কোনো ভবন নির্মাণ উচিত হবে না। নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইনজীবীদের দপ্তর কোর্ট বিল্ডিংয়ে হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বিশেষ করে রাতের বেলায় তো সেখানে মানুষ যায় না। যে কোনো জনপদে আইনজীবী সমিতির নিজস্ব ভবন হতে পারে, অথবা তারা ব্যক্তি উদ্যোগে যে কোনো ভবন ভাড়া নিতে পারে।’
এদিকে নির্মিতব্য নতুন দুটি ভবন নিয়ে জেলা প্রশাসন ও আইনজীবীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তো আছেই। এ অবস্থার মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) আদালতের আশপাশের ভবনের ত্রুটি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। অবশ্য আইনজীবীদের বিদ্যমান চারটি ভবন অবৈধ এবং নিরাপত্তার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন চিঠি দেওয়ার প্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নিয়েছে সিডিএ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘২০০৭ সালে আইনজীবী ভবন নির্মাণের প্রথম অনুমোদন দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে সবকটি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এখন সেসব ফাইল যাচাই-বাছাই করছি। মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হলে সিডিএ আইন (ইমারত নির্মাণ আইন) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, পরীর পাহাড়ে বিদ্যমান পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং নতুন করে আরও দুটি ভবন নির্মাণের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ৮ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি দিয়েছেন। এছাড়াও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসার কাছেও চিঠি দিয়ে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় সংযোগ না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। এ নিয়ে জেলা প্রশাসন ও আইনজীবীদের মধ্যে চলছে বিতর্ক।
জেলা প্রশাসনের অভিযোগ, সিডিএ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই পরীর পাহাড়ে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন দিয়েছে।
‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। ফাইল যাচাই-বাছাই করছি। জেলা প্রশাসনের চিঠিতে ভবনের নকশা ও জায়গার অবস্থানের বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে।’ – বলেন সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে রোববার (১৯ সেপ্টেম্বর) সমিতির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়া উদ্দিন একুশে পত্রিকা বলেন, নিয়ম মেনে তারা ভবন নির্মাণ করবে। তার দাবি, বিদ্যমান পাঁচটি ভবনও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন এসব ভবন উচ্ছেদ করতে গেলে তারা আন্দোলন করবেন।
ইতিহাস বলছে, ১৮৯৩-৯৪ সালে পরীর পাহাড়ে দুতলা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম আদালত ভবন নির্মাণ করা হয় কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের আদলে। পরে আদালত ভবনটি বিভিন্ন সময় সংস্কার করা হয়। বর্তমানে সেই ভবনটিতে রয়েছে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসনের কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারী দফতর। আর নতুন আদালত ভবন এবং চিফ জুডিসিয়াল আদালত ভবনটিতে সকল বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, পরীর পাহাড় তথা কোর্টহিল এলাকায় যত্রতত্র অপরিকল্পিত অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণের ফলে মৃদু ভূমিকম্প, পাহাড়ধস কিংবা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মতো দুর্ঘটনা থেকে অগ্নিকাণ্ড ও ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দিতে পারে। এছাড়া নিকটস্থ কোনো স্থানে পানির সংস্থান না থাকায় মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাউকে কিছু করতে দেওয়া হবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ ২০০৮ অনুযায়ী পাহাড় কিংবা টিলা শ্রেণীর জমির কোনো ধরনের পরিবর্তন করা যাবে না।’
জানা গেছে, আইনজীবীদের চেম্বার বরাদ্দের জন্য নতুন দুটি ভবন নির্মাণের জন্য সম্প্রতি পদক্ষেপ নেয় জেলা আইনজীবী সমিতি। নতুন ভবনে চেম্বার বরাদ্দ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি পত্রিকা প্রকাশের পরই সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংল্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর তা পরিবেশ অধিদফতরও পরিদর্শন করে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির বর্তমান সদস্য পাঁচ হাজার। এরমধ্যে পাঁচটি ভবনে মোট সাড়ে তিন হাজার আইনজীবীর চেম্বার রয়েছে। বাকিদের চেম্বার চাহিদা পূরণে আইনজীবী ভবন ও শাপলা ভবনের পাশে নতুন দুটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সমিতি। এ ভবন নির্মাণ ঘিরেই বর্তমানে উত্তপ্ত আদালতপাড়া।
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচ এম জিয়া উদ্দিন জানিয়েছেন, যেখানে ভবন নির্মাণ হবে সেই জায়গাটির সীমানা চিহ্নিত করা আছে এবং জমিও আইনজীবী সমিতির। এটির অনুমোদন চউক থেকে নেওয়া আছে। এ নিয়ে কোনো ধরনের মুখোমুখি অবস্থান তারা চান না।
পরীর পাহাড়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পরিকল্পনাহীন বেশকিছু অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা ইতোমধ্যে হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে মানবিক বিপর্যয় হতে পারে এবং ঐতিহাসিক পাহাড়টি রক্ষাও সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকারি খাস জমিতে এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে এ নিয়ে পরিবেশ অধিদফতর (মহানগর) এর উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম।
এদিকে সম্প্রতি মাঠ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা পরীর পাহাড় সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীও অনুমোদন দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ফলে শিগগিরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইন ও বিচার বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এ সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, নগরের কেন্দ্রস্থলে পাহাড়ের চূড়ায় প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং অবস্থিত। এ অংশে রয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ মোট ৭১টি আদালত।
জেলা প্রশাসকের নামে এখানে সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ১১ দশমিক ৭২ একর জায়গা রয়েছে। সরকারি ভবনের বাইরে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গায় পাহাড় ও টিলা কেটে অবৈধভাবে পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষও স্থাপনাগুলো পাহাড়ধস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি দুর্যোগের ক্ষেত্রে অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে চিহ্নিত করেছে।
ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি আবারো সরকারের কোনো সংস্থার অনুমোদন না নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু আইনজীবী ভবন’ ও ‘একুশে আইনজীবী ভবন’ নামে দুটি ১২ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ভবন দুটির ৬০০টি চেম্বার বরাদ্দের জন্য এরই মধ্যে আইনজীবীদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা করে ১২ কোটি টাকা আদায়ও করা হয়েছে।
এছাড়া কোর্ট বিল্ডিংয়ের চারপাশে আইনজীবীদের অর্ধশতাধিক অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ দোকানপাট, হোটেল, ছাত্রাবাস, বস্তি ও মুদি দোকান তৈরি করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্থাপনাটিকে একটি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে। এখানকার অরাজকতার সুযোগ নিয়ে ২০১ সালে কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় জঙ্গি হামলা হয়েছিল। সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিরাপত্তা রক্ষার্থে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোও আইনজীবী নেতারা অপসারণ করেছেন, যার কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইনজীবীদের এসব স্থাপনার অনেক বিদ্যুৎলাইন ও পানির লাইনের সংযোগও অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়া উদ্দিন বলেন, আইনজীবী সমিতি বৈধভাবে খাস জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে। নতুন নির্মীয়মাণ ভবন দুটির জন্যও সিডিএসহ সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। কোর্টবিল্ডিং আদালত ও আইনজীবীদের জন্যই। আগের জেলা প্রশাসকদের নির্ধারিত করে দেয়া সীমানার মধ্যেই আমরা ভবন নির্মাণ করছি। যে বাধাই আসুক, আমরা ভবন নির্মাণে পিছপা হবো না।
