শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

রাঙামাটিতে সাইবার অপরাধের ভয়ঙ্কর রূপ, অতীষ্ঠ সাংবাদিক-পত্নীর মামলা

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১, ৯:৪৪ অপরাহ্ণ

একুশে প্রতিবেদক : রাঙামাটিতে এক সাংবাদিক পত্নী এবং তার স্বামী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে সাংবাদিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছেন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তিনি এই মামলা দায়ের করেন।

এর আগে গত ১১ আগস্ট একই অভিযোগে তার স্বামী জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি অবজারভার’ এর রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধি ইমতিয়াজ কামাল ওই সাংবাদিকসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন- পিবিআইকে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।

সাংবাদিক-পত্নী আর্জিয়া আলম আঁখির করা মামলার আসামিরা হলেন-রাঙামাটি পৌরসভা এলাকার মোত্তল হোসেনের মেয়ে বিটিভি’র রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধি জাহেদা বেগম (৩৫), পুলিশ সুপার বাসভবন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মৃত নুর মোহাম্মদ পাটোয়ারির ছেলে বার্তা২৪ এর রাঙামাটি প্রতিনিধি আলমগীর মানিক (৩৮), শহীদ আব্দুল আলী একাডেমি সংলগ্ন এলাকার মো. জসিমের ছেলে মাসুদ পারভেজ নির্জন (১৯), স্থানীয় বাবুল সওদাগরের ছেলে শহীদুল ইসলাম হ্রদয় (২৫)।

চট্টগ্রামে সাইবার ট্রাইব্যুনালে ইমতিয়াজ কামালের করা অভিযোগে তার স্ত্রীর মামলায় এজাহারভুক্ত আলোচ্য চার আসামিসহ আরও দুইজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, স্থানীয় বাসিন্দা জালাল উদ্দিনের ছেলে সোলায়মান (৪০) এবং কোতোয়ালী থানাধীন রিজার্ভ মুখ এলাকার হাসান আলীর ছেলে সোহরাওয়ার্দী সাব্বির (২২)।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে থানায় মামলা এবং সাইবার ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়েরকারী স্বামী-স্ত্রী দুজনই থাকেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কোতোয়ালী থানাধীন রিজার্ভ বাজার এলাকায়।

জানা গেছে, সাইবার ট্রাইব্যুনালে অভিযোগকারী শেখ ইমতিয়াজ কামাল ইমন ‘ডেইলি অবজারভার’ এর রাঙামাটি প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। এদিকে অভিযুক্ত জাহেদা বেগম বিটিভি রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধি ও আলমগীর মানিক দৈনিক মানবজমিন ও এশিয়ান টিভি রাঙামাটি প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

মামলা দায়ের হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতোয়ালী থানায় ওসি কবীর হোসেন রোববার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে একুশে পত্রিকাকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে।

মামলার বাদি আঁখির অভিযোগ, আসামিরা একাধিক ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে তাকে এবং তার স্বামীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তারা তাকে এবং তার স্বামীকে পাহাড়ি সন্ত্রাসী দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাদীর শ্লীলতাহানীরও হুমকি দিয়েছে তারা।”

মামলার বাদী আর্জিয়া আলম আঁখির অভিযোগ, রাঙামাটিতে সাইবার ক্রাইম অপরাধীদের সংখ্যা ও উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর রাঙামাটিতে সাইবার ক্রাইমের সাথে জড়িতদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র আছে। যারা প্রতিনিয়ত অনেকের সাথে সাইবার অপরাধ সংঘটিত করে পার পেয়ে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আইনগত ব্যবস্থা নিতেও ভয় পায়। আমি, আমার বাবা ও সাংবাদিক স্বামীকে নিয়ে অনেক জঘন্য অপরাধ করেছে আসামিরা। আমাকে এবং আমার স্বামীকে পাহাড়ি সন্ত্রাসী দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা এবং আমার শ্লীলতাহানীর হুমকি দিয়েছে। এসব কিছু উপেক্ষা করে আমি আদালত এবং থানার দ্বারস্থ হয়েছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি এবং তাদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি করছি। যাতে আমার মত আর কোনো নিরীহ নারী ও পরিবার সাইবার অপরাধের শিকার ও ও ভিকটিম না হয়। আমি প্রশাসনের কাছে অনতিবিলম্বে আসামিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”

মামলার বাদীর স্বামী ইমতিয়াজ কামাল বলেন, “মামলা দায়ের করার আগে গত ৩ আগস্ট একই থানায় তার স্ত্রী আলোচ্য আসামিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু শুরু থেকেই আসামিদের রক্ষার জন্য নানাভাবে আমাদের অসহযোগিতা করছেন। শনিবার মামলা দায়েরের পর তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের গ্রেফতার এবং তাদের কাছ থেকে মুঠোফোন, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এখন উল্টো আমি এবং আমার স্ত্রীর মুঠোফোন জব্দ করার কথা বলছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নয়ন।”

এই প্রসঙ্গে কোতোয়ালী থানার ওসি কবীর হোসেন আজ রোববার বেলা ৩ টার দিকে একুশে পত্রিকাকে বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত করতে হয়। আসামি বা বাদির মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ডিভাইস জব্দ করে এক্সপার্ট দ্বারা পরীক্ষা করতে হয়। এখানে আসামিদের পক্ষাবলম্বনের বাদির স্বামীর যে অভিযোগ তা সঠিক নয়।”

বাদী মামলার এজাহারে অভিযোগ করে বলেন, “আসামিরা একাধিক ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে তিনি এবং তার স্বামীর উদ্দেশ্যে বার বার কুরুচিপূর্ণ, অশালীন পোস্ট দিচ্ছেন। মামলার ২ নং আসামি আলমগীর মানিক নিজেকে এক নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে রাঙামাটিতে সাইবার অপরাধ সংঘটিত করে আসছেন।”

এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা “রোকসানা আকতার আরজু”, “ঝরা পাতার মুকুল”, “Monipuri”, “Nipa akther”, Arindam Nil” নামের ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে গত ২ আগস্ট বিকাল ৫টা ১৮ মিনিটে তার (বাদীর) স্বামী ইমতিয়াজ কামালের “Emtiaj Emon” নামে ফেসবুক আইডি থেকে ২ নং আসামির ফেসবুক আইডিতে “Alamgir Manik” রাঙামাটি প্রেসক্লাবের নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে দেওয়া একটি পোস্টে যোগ্যতাহীন কিছু ব্যক্তিকে সদস্য করায় মন্তব্য করেন।

এরপর আসামিদের উল্লেখিত ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে বাদি এবং তার স্বামীর ফেসবুক আইডিতে ১ ও ২ নং আসামি নিজেদের পাকা হ্যাকার বলে স্বীকার করেন। তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না বলে উল্লেখ করে বলেন, “আমার হ্যাকিং জগতে কেউ মাফ নেই। আমি ডেম সিউর আমার কাছে ৫০+ ছবি আছে, আরেকটা শর্ট ভিডিও আছে। আমি যদি আপনাকে দুইটা শব্দ বলি আপনি রাতে ঘুম যেতে পারবেন না। আমার স্টকের জিনিস খুব মূল্যবান। আপনার বউকে বলেন কোনো স্পেশালিস্ট এর কাছে সিকিউরিটি স্ট্রং করতে, কারণ আমার কালেকশন যা করার হয়ে গেছে। কোনো আইডিতে টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন থাকলে কীভাবে হ্যাক করতে হয় জানেন???,

আপনি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা যোগ করেন। দেখি তবুও আটকিয়ে রাখতে পারেন কিনা। আপনার আইডি থেকেই দিব এবার। তাই বিদায় আমার কাজ আছে। ঘুম যান টেনশনে আপনার স্বাস্থের খুব বাজে অবস্থা। আমি টেনশন দিলে বউয়ের সাথে মিলনেও বীর্য বের হবে না। আমার স্বভাব গোপন জিনিস স্টক করার। সেটা রাঙামাটির যেই হোক না কেন, সে যদি ফেসবুক আর জিমেইল ব্যবহার করে তার সব কিছু আয়ত্তে আনা ত্বরিত ব্যাপার। ডেমো দেখতে চোখ রাখেন এই আইডি আর মনিপুরি আইডিতে।” মামলার ৩ ও ৪ নং আসামি বাদীর ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে সম্মানহানি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন।

“রোকসানা আকতার আরজু” ও “ঝরা পাতার মুকুল” নামের ভুয়া আইডি থেকে ম্যাসেঞ্জারে বাদির স্বামীকে বলেন, “ক্ষমা চেয়ে স্টাটাস ডিলিট করবে। অন্যথায় আপনিসহ তার চাঁদাবাজির অডিও ক্লিপসহ অন্যান্য আরও বেশ কিছু ডকুমেন্ট আমার টাইমলাইনে তুলে দেওয়া হবে। সেগুলো ডিসি এসপিসহ ভোরের কাগজ, বাংলাভিশন, অবজারভার, আলোকিত রাঙামাটি পত্রিকা অফিসে পাঠানো হবে। বেয়াদবির চরম শাস্তি নিশ্চিত করা পর্যন্ত এটা চলতে থাকবে।”

অভিযোগ, আসামিরা এভাবে বাদী এবং তার স্বামীকে হুমকি দিচ্ছেন। মিথ্যা ডকুমেন্ট সৃষ্টি করে তার স্বামীর প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র করছেন। প্রতিনিয়ত ফেক আইডি সৃজন করে আসামিরা তাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছেন। মামলায় ১, ২ নং আসামির নির্দেশে ৩ নং আসামি মাসুদ পারভেজ নির্জন ফেসবুক আইডিতে (Masud parbes Nirjon) কমেন্ট করে বলেন, “Mahadi Bin Sultan ফাইট”৷ আসামিরা বাদি ও তার স্বামীকে হত্যার নকশা তৈরি করছেন। ফেক আইডি দ্বারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজকেও বিতর্কিত করা হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাদি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পাশাপাশি জীবন হারানোর আশংকায় আছেন।

বাদির আইনী সহায়তাদানকারী অ্যাডভোকেট আয়েশা সোনিয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, “ভিকটিম ও মামলার বাদী আর্জিয়া আলম আখি যার বয়স ১৯ বছর, পেশায় একজন কলেজ ছাত্রী সাইবার অপরাধে ভিকটিম হয়ে যখন আমার কাছে আইনি সহায়তা ও পরামর্শ নিতে আসে আমি তখন উপলদ্ধি করেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ করার পর বাংলাদেশে এর সুফলও যেমন পাচ্ছে তথাপি এর অপব্যবহার ও অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এই অপরাধে দিন দিন জড়িয়ে যাচ্ছে। এটা দেশের সমাজ ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত। যারা এইসব ঘৃণিত অপরাধের সাথে জড়িত তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একজন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এটাই আমার প্রত্যাশা।”

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার ২ নং আসামি এশিয়ান টিভির রাঙামাটি প্রতিনিধি মো. আলমগীর মানিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমি, জাহেদা বেগমসহ ৭জন স্থানীয় সাংবাদিক রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করি। এ নিয়ে আমি আমার ফেসবুক পেইজে প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি পোস্ট দিই। এতে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করে আমি, জাহেদা বেগম এবং প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অশালীন এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে বসেন ইমতিয়াজ কামাল। তার এহেন কর্মকাণ্ডে আমি শুধু প্রতিবাদ করেছি।

তবে ইমতিয়াজ কামাল বিষয়টি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলেন, এধরনের কোনো পোস্ট আমি দিইনি। এটা তাদের কারসাজি। তারা পারে না এমন কাজ নেই। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে এখন তারা কতকিছুই বলে বেড়াবে।