চট্টগ্রামে ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে প্রবাসীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর মামলা


চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে দুবাই প্রবাসী স্বামী সফিউল আলমের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন তার স্ত্রী সাজু আক্তার।

আজ বুধবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম শফি উদ্দিনের আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয় বলে জানান বাদী পক্ষের আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ।

তিনি বলেন, ভ্রূণ হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ আমাদের সমাজে হরহামেশাই ঘটার কথা শোনা যায়। এ নিয়ে মাঝে মাঝে অভিযানও চলে ক্লিনিকগুলোতে। তাতেও বন্ধ হয়নি ভ্রূণ হত্যার মতো গুরুতর অপরাপ। অপরাধীরা অপরাধ করেও বারবার পার পেয়ে যায়।

‘তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একজন ভুক্তভোগী নারীর মাধ্যমে আদালতের নজরে আনা হয়েছে, যেন এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর কেউ ঘটাতে সাহস না পায়। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে চান্দগাঁও থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।’

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সন্তান সম্ভবা হয়েও স্বামী আর শ্বশুর বাড়ির লোকজনের অসহযোগিতায় মাতৃত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হন রাঙ্গুনীয়ার উত্তর পদুয়া পশ্চিম খুরুশিয়ার সাজু আক্তার। কখনও জ্বর-সর্দির ওষুধ, কখনও ভিটামিন ওষুধের নাম করে ওই নারীকে ভ্রূণ হত্যার ওষুধ খাইয়ে গর্ভের সন্তান নষ্ট করতেন তারা।

চিকিৎসকের কাছে নিয়ে নিজেরা দায়িত্ব নিয়েও ওই নারীর গর্ভপাত করিয়েছেন। সর্বশেষ সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর আবারও ওই নারীকে গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য তার প্রবাসী স্বামী চাপ দিলে সন্তান নষ্ট করতে অস্বীকার করেন সাজু আক্তার। তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রীকে তালাকের হুমকি দেন স্বামী। করেন শারীরিক, মানসিক নির্যাতনও। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে মোবাইল ফোনও বন্ধ করে দেন সাজু আক্তারের স্বামী সফিউল আলম।

এটাই প্রথম ঘটনা নয়। মামলার বিবরণে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনীয়া থানাধীন খিলমোগল খামারিপাড়া হোসনাবাদ এলাকার কাজী সফিউল আলমের সাথে পারিবারিক পছন্দেই বিয়ে হয় উত্তর পদুয়া পশ্চিম খুরুশিয়ার সাজু আক্তারের। বিয়ের কিছু দিন পরেই জানা যায় স্বামী তার পাশের গ্রামের এক নারীর প্রেমে আসক্ত। বিয়ের একমাস পরে বিদেশ পাড়ি দেন স্বামী সফিউল আলম।

বিদেশ থেকে আসা-যাওয়ার মাঝে স্ত্রী সাজু সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে সফিউল আলমের পরামর্শে মা নুর আয়েশা এবং বোন তাসলিমা ও পারভিন মিলে চন্দ্রঘোনায় ডা. পাপড়ি দাশের কাছে নিয়ে যান সাজু আক্তারকে। সেখানে গিয়েই ডাক্তারকে গর্ভপাত করানোর ওষুধ দেওয়ার কথা বললে চিকিৎসক প্রথমে রাজী হননি। জানান, মানুষ কতো কষ্ট করে একটা সন্তান পাওয়ার জন্য। আর গর্ভে সন্তান আসার পর সেটা নষ্ট করতে গেলে প্রসূতি মায়ের অনেক সময় জীবন ঝুঁকিও থাকে। তারপরও পরিবারের লোকজন নিজেদের নাম লিখে দায়িত্ব নিয়ে ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ এনে রাতে সাজু আক্তারকে একটি ওষুধ খাওয়ালে তার শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে।

পরদিন থেকে বমি ও রক্তক্ষরণ শুরু হলে আবারো নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক দ্রুত ওই নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য বললেও পরিবারের লোকজন তাকে বাড়ি নিয়ে আসে। অসুস্থ অবস্থাতেই জ্বরের ওষুধের কথা বলে আবার সাজু আক্তারকে ভ্রূণ হত্যার ওষুধ খাওয়ানো হয়। এভাবে তার প্রথম সন্তান পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত হয়। এখানেই শেষ নয়। বিষয়টি পরিবারের কাউকে না জানানোর জন্য চাপ দিতে থাকে সফিউল আলমের পরিবার। এভাবে বারবার ভ্রূণ হত্যার ঘটনা ঘটায় সফিউলের পরিবারের লোকজন।

শশুর বাড়ির লোকজনের নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে সাজু আক্তার ২০২০ সালের জুলাই মাসে তার বোনের বাসা বহদ্দারহাটের ফরিদার পাড়ায় চলে আসেন। ইতোমধ্যে ২০২১ সালের ২৯ আগষ্ট সাজুর স্বামী সফিউল বিদেশ থেকে দেশে এসে সাজুর বোনের বাসায় এসে উঠে। সাজুকে আগের সব কিছু ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে সব শুরু করার জন্য বললে সাজুও সব ভুলে আবার নতুন জীবন শুরুর আশায় আগের সব ভুলে যায়।

এক পর্যায়ে আবার সন্তানসম্ভবা হয় সাজু। এবারও আগের মতোই সফিউল তার স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে ফেলার কথা বললে সাজু আর তাতে রাজী হয়নি। এতেই বাধে বিপত্তি। সাজুর উপর নেমে আসে আবার নির্যাতন। স্বামীর অত্যাচারে অসুস্থ হয়ে পড়া স্ত্রীকে তালাকের হুমকি দিয়ে স্বামী এবার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ।

অবশেষে বাধ্য হয়ে সাজু আক্তার আইনের আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ।