কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মালিকানা নিয়ে রশি টানাটানি

জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (সিবিআইইউ) হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম থেকে অনার্স পাশ করেছেন আরিফ সাইদ। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজার শহরের কলাতলীর পাঁচ তারকা হোটেল সায়মন বীচ রিসোর্টে ‘ফ্রন্ট অফিসার’ পদে চাকরির আবেদন করেন তিনি। কিন্তু মার্কশিট বা নম্বরফর্দ না থাকায় হোটেল কর্তৃপক্ষ তাকে ইন্টারভিউতে অংশ নিতে সুযোগ দেয়নি।

শাহেদুল হাসান ও তাসলিমা আক্তার একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাশ করেন চলতি বছর। পরে দুইজনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধ্যাকালীন এমবিএ’তে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু অনার্সের মার্কশিট না থাকায় তারা ভর্তির সুযোগ পাননি। এমন দুর্ভোগ এবং সমস্যা শুধু তাদের নয়, প্রায় ১৭শ’ শিক্ষার্থীর।

অভিযোগ রয়েছে, মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধসহ নানা অনিয়মের কারণে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া প্রায় ১৭শ’ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা কিংবা চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে রশি টানাটানি এবং দখল-বেদখলের কারণে অনেকটা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

এরমধ্যে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা মুজিবুর রহমানসহ ট্রাস্টি বোর্ডের সবাইকে বের করে দিয়ে ইউনিভার্সিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আহমেদ। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় সংঘর্ষের আশঙ্কাও রয়েছে।

এদিকে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির নানা অসঙ্গতি, অপূর্ণতা উল্লে­খপূর্বক ১৬টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। শর্তাদির বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রতি ৩ মাস অন্তর কমিশনে পাঠাতে হবে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. ওমর ফারুক এ সংক্রান্ত অফিস আদেশে সই করেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুপারিশগুলো হলো, আগামী এক বছরের মধ্যে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য কক্সবাজার এলাকায় ২ একর নিষ্কন্টক, অখণ্ড ও দায়মুক্ত জমি ক্রয় করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ক্যাম্পাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনাদির প্ল্যান অনুমোদনপূর্বক স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করতে হবে।

আবাসিক হোটেলে চলমান ক্যাম্পাসের নিচে বাসকাউন্টার, বাণিজ্যিক মার্কেট, বাসটার্মিনাল বিদ্যমান থাকায় এখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যাপক গোলযোগ ও শব্দদূষণ লেগেই থাকে। ফলে ক্যাম্পাসটি মোটেও শিক্ষাবান্ধব নয়। ‘ট্রাস্ট অ্যাক্ট ১৮৮২’ অনুযায়ী সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে চুক্তি এবং ‘সোসাইটিজ অ্যাক্ট ১৮৬০’ অনুযায়ী জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস কর্তৃক দ্রুত রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারার না থাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর ৩১ (৬) ধারা মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। তাই আগামী ১ মাসের মধ্যে উপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগের নিমিত্তে প্যানেল পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। যেসব কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োজিত আছেন দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের পূর্ণকালীন হিসেবে নিয়োগদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

আগামী ৩ মাসের মধ্যে বিগত বছরের সমস্ত অডিট সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়ে নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে সনদ বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত তহবিলের উত্তোলিত টাকা সুদাসল ফেরত দিতে হবে। ব্যর্থ হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর ৬ (৯) এর ধারা মতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগপূর্বক কমিশনকে অবহিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আইন অনুযায়ী, শতকরা ৩ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা, ৩ ভাগ দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বরাদ্দ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে কমিশন ও সরকার মনোনীত সদস্য এবং উপাচার্য মনোনীত ডীন ও বিভাগীয় প্রধান গঠন এবং কমিশনের সিন্ডিকেট পরিচালনার নিয়ম অনুযায়ী ‘সিন্ডিকেট সভা’ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামসমূহ নির্দেশ অনুযায়ী ২ সেমিস্টারভিত্তিক হলেও অধিকাংশ প্রোগ্রামের সিলেবাস হালনাগাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ক্লাসরুম, ল্যাব, সেমিনারকক্ষ ও লাইব্রেরী আধুনিকায়ন এবং শিক্ষা-উপযোগী করতে হবে। লাইব্রেরীতে বিষয়ভিত্তিক মৌলিক বই অন্তর্ভুক্ত, ইলেক্ট্রনিক জার্নাল সুবিধা, ইউডিএল এর সদস্যপদ গ্রহণ এবং ফটোকপি বই ও নোটবই অপসারণ করতে হবে। লাইব্রেরির ‘বঙ্গবন্ধু কর্নারে’ বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বই সংযোজনপূর্বক কমিশনে জানাতে হবে।

সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর ধারা ১১ অনুযায়ী কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাময়িক অনুমতির মেয়াদ ১ বছর বৃদ্ধি করতে পারে সরকার। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়টির সার্বিক শিক্ষার মান বিবেচনায় উক্ত সময়কালে নতুন ছাত্র ভর্তি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে এবং প্রতি ৩ মাস অন্তর শর্তাদির অগ্রগতি প্রতিবেদন কমিশনে প্রেরণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুপারিশসমূহ পালনে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক সনদের মেয়াদ বৃদ্ধি সমীচীন হবে না মনে করে কমিটি।

প্রসঙ্গত, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালে ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমদ ও সেক্রেটারি মুজিবুর রহমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়। দ্বন্দ্বের জেরে গত বছর বোর্ড অব ট্রাস্টি’র এক সভায় সালাহউদ্দিন আহমদকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরানোর পাশাপাশি সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী ও ছেলেকেও ট্রাস্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে সালাহউদ্দিন আহমদ সেক্রেটারি লায়ন মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান ও প্রতিষ্ঠাকালীন সব সদস্যকে বাদ দিয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানসহ তার আস্থাভাজনদের নিয়ে নতুন একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান দুটিই দাবি করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব অনিয়ম ও দ্বন্দ্বের জের ধরে বেসরকারি মঞ্জুরি কমিশন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি সরজমিনে তদন্ত করে অনিয়মের সত্যতা পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপরোক্ত সুপারিশ করেন।

এ প্রসঙ্গে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব লায়ন মোহাম্মদ মুজিবর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা সবকিছু সুচারুভাবে পরিচালনা করেছি বলেই কোনো ধরনের অভিযোগ ওঠেনি। প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমদ নির্লজ্জভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি দখল করে মামলাসহ নানা অপকর্ম চালাচ্ছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগে কোনো কিছুই নিয়মমতো চলেনি। আমরা ইউনিভার্সিটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে সবকিছু গুছিয়ে আনা হচ্ছে।