মানসিক অবসাদের জের, আত্মঘাতি হচ্ছে পুলিশ

মোহাম্মদ রফিক : মানসিক অবসাদের জেরে পুলিশে আত্মঘাতির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, ছুটি না পাওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দুর্ব্যবহার, অতিরিক্ত ডিউটি, ছুটি কিংবা পদোন্নতি না পাওয়া, স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের জটিলতা, কাজের চাপে মানসিক অবসাদ থেকে এসব ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যায় উদ্বেগ বাড়ছে সহকর্মীদের মধ্যে। এ অবস্থায় অনেক পুলিশ সদস্য আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকে স্বেচ্ছায় চাকুরি ছাড়ার আবেদন করেও রেহায় পাচ্ছেন না। সিএমপি’র একটি সূত্রের দাবি, গত ৬-৭ বছরে অন্তত দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের জন্য আবেদন করলেও তা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে কনস্টেবলদের নানা সমস্যা নিয়ে ২০২০ সালের জুলাই মাসে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ পুলিশ কনস্টেবল সময়মতো ছুটি না পাওয়াকে তাদের চাকরিতে বড় সমস্যা মনে করেন। ১২ দশমিক ৮২ শতাংশ পুলিশ কনস্টেবল বলেন, তারা পরিবারকে সময় দিতে পারছেন না। থানায় রাজনৈতিক নেতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহারকে সমস্যা বলেছেন ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। আরআইকে ঘুষ না দিলে ছুটি হয় না বলে অভিযোগ করেছেন ২৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। শতভাগ পুলিশ সদস্য মনে করেন, তাদের প্রতি ডিউটি শিফট আট ঘণ্টা হওয়া উচিত।

পুলিশের বড় একটি অংশ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগলেও এর গ্রাস থেকে বা মানসিক চাপ কমাতে বাহিনীর কর্মীদের বাঁচাতে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না পুলিশ কর্তৃপক্ষের। নেই কোনো কাউন্সিলিংয়ের পরিকল্পনা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে অন্তত ২৬ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলার আছে ৫ জন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা বন্ধে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

সেগুলো হলো-থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে পরিবার নিয়ে থাকার ব্যবস্থা, ব্যাচেলর থাকলেও থাকা ও খাওয়ার উন্নত পরিবেশ তৈরি করা, পর্যাপ্ত খেলাধূলাসহ বিনোদনের ব্যবস্থা করা, বিবাহিত ও অবিবাহিতদের আলাদা আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ছুটি কাটানোর ব্যবস্থা করা, পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতার সময়ে পাশে থাকা ও রাখার ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, জেলায় জেলায় পুলিশ হাসপাতালের শাখা খোলা, অধস্তন সদস্যদের নিয়মিত রেশন, ভাতা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। পেশাগত কাউন্সেলিং করা, পাশাপাশি সাইকোলজি ইউনিট স্থাপন করা। এসব উদ্যোগ নিলে পুলিশের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসবে।

তবে চট্টগ্রামে পুলিশের আত্মহত্যার ঘটনা নেই বলে দাবি করে মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার জানা মতে চট্টগ্রামে এখনো এমন কিছু হয়নি। আমরা ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা পেয়েছি। আমাদের সীমিত জনবলের মধ্যে ছুটি সর্বোচ্চ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ প্রক্রিয়াটি চলমান। পুলিশবাহিনীর মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশ বজায় রাখতে বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ইনডোর গেমস, ফুটবল প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। চেষ্টা করছি পুলিশের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে।’

গত ১৫ জুলাই রাঙামাটি জেলায় নিজের বন্দুকের গুলিতে আত্মহনন করেন পুলিশ সদস্য কাইয়ুম সরকার। তিনি পারিবারিক অশান্তিতে ভুগছিলেন দাবি পুলিশ কর্মকর্তাদের। ২০২০ সালে ছুটি না পাওয়ার হতাশা থেকে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান সিএমপির আলোচিত এক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারের গাড়িচালক। ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি দামপাড়া পুলিশ লাইনের ঘটনা। ছুটি না পেয়ে মানসিক অবসাদ থেকে আত্মহত্যা করেন কালন চাকমা নামে পুলিশের এক নায়েক।

২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দর পুলিশ লাইনের ঘটনা। ছুটি না পেয়ে মানসিক কষ্ট থেকে নিজের বন্দুক দিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান কনস্টেবল আনন্দ বড়ুয়া। গুলিতে তার নাক পুরোটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বর্তমানে ওই পুলিশ কনস্টেবল সিএমপির মোটরযান শাখায় কর্মরত আছেন।

২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি গলায় ফাঁস খেয়ে আত্মহত্যা করেন পটিয়া উপজেলার এয়াকুবদ-ী এলাকায় ইশরাত জাহান (১৯) নামে এক নারী পুলিশ সদস্য। ইশরাত চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি পটিয়া উপজেলার এয়াকুবদ-ী এলাকায়। পারিবারিক অশান্তি থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে দাবি পুলিশের।

২০১৬ সালের ঘটনা। চট্টগ্রাম নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনে আকরাম হোসেন ব্যারাকে সহকর্মীদের নিয়ে তাস খেলছিলেন কনস্টেবল রাজিব। এসময় সিএমপির তৎকালীন একজন অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার এবং একজন ইন্সপেক্টর তাদের আটক করতে গেলে দৌঁড়ে পালানোর সময় ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন কনস্টেবল রাজিব। পড়ে নগরের ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাজিব।

২০১৬ সালের ২৭ জুন চট্টগ্রাম নগরের লাভলেইন এলাকার বাসায় আত্মহত্যা করেন পুলিশ কর্মকর্তা (বর্তমানে খুলশি থানার ওসি তদন্ত) আফতাব আহমেদের স্ত্রী। সিএমপির কর্মকর্তারা জানান, মানসিক অবসাদ থেকে আত্মহত্যা করেছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী। একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পর্যায়ে মানসিক অবসাদে ভোগার সংখ্যা বেশি। তবে অনেক পুলিশ সদস্য পারিবারিক অশান্তির কথা কাউকে বলেন না। ফলে দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে পুলিশের আত্মহননের ঘটনা।

সিএমপি’র একটি থানার গাড়িচালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘প্রতিদিন টানা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। ঘুম আর খাওয়া সময় মতো হয় না। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। ছুটি চাইলেও পাই না। একটু বেশকম হলেই ঊর্ধ্বতনদের গালমন্দ শুনতে হয়। জীবনটা বিষিয়ে উঠেছে।’

২০১৯ সালে ৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। আত্মহত্যার চেষ্টা চালান বগুড়ার ধুনট থানার এএসআই রোজিনা খাতুন (৩২)। পরে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ধুনট থানা ভবনের পাশে ভাড়া বাসায় তিনি এক ধরনের কীটনাশক সেবন করেছিলেন।

রোজিনা খাতুন এএসআই পদে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ধুনট থানায় যোগদান করেন। ছেলে-মেয়েকে নিয়ে থানা ভবনের পাশে একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। স্বামী হাসান আলী চাকরির সুবাদে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। দাম্পত্য কলহের কারণে রোজিনা খাতুন আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছর গত ১৩ সেপ্টেম্বর র‌্যাব সদর দফতরে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল শুভ মল্ল নিজের অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলিতে আত্মহত্যা করেন। এর আগে গত ৬ আগস্ট দুপুরে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী মারুফ হোসেন সরদারের বেইলি রোডের সরকারি বাংলোতে দায়িত্বপালন অবস্থায় মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন কনস্টেবল মেহেদী হাসান।

গত ২১ জুলাই সকালে মেহেরপুরে নিজের রাইফেলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন পুলিশ সদস্য সাইফুল ইসলাম। তার স্ত্রী ফরিদা খাতুন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কর্মব্যস্ততার কারণে দীর্ঘদিন পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় ও সাক্ষাৎ না হওয়ায় তার স্বামী হতাশায় ভুগছিলেন। চলতি বছর ২১ মার্চ পাবনার আতাইকুল্লা থানার এসআই হাসান আলী পারিবারিক অস্বচ্ছলতার জন্য মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে থানার ছাদে উঠে গুলি করেন নিজের মাথায়। এতে তার মৃত্যু হয়।

২০২০ সালের ৪ মে বিকালে ঢাকার আদাবরের ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন আদাবর থানার এএসআই আফরিন আক্তার মুন্নী। মুন্নীর স্বামী নজরুল ইসলাম রবিন পুলিশের এএসআই পদে আদাবর থানায় কর্মরত।
স্বামী নজরুলের দাবি, তাদের সন্তান অসুস্থ থাকায় ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’ ছিলেন তার স্ত্রী। এই কারণে আত্মহত্যা করেন মুন্নী। ২০২০ সালের ৬ মার্চ। বরিশাল জেলা পুলিশ লাইনসের ব্যারাকের ছাদে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন পুলিশ কনস্টেবল হৃদয় দাস।

এসবের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা আছেন নানা বিপদে। দীর্ঘসময় পরিবার থেকে দূরে থাকায়, পারিবারিক অশান্তি, প্রতিবেশির সঙ্গে বিরোধসহ নানা কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ‘সাঝানো’ মামলা পরবর্তী গ্রেফতারি ওয়ারেন্ট জারি হলেই সাময়িক বরখাস্ত হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে। এসব কারণে সিএমপিতে বর্তমানে ৩০-৩৫ জন পুলিশ সদস্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত অবস্থায় আছেন বলে জানা গেছে।

এরকম এক ভুক্তভোগীর নাম কনস্টেবল গিয়াস। সাজানো একটি মামলায় ৬ বছর লড়ে অবশেষে তিনি আদালত থেকে বেকসুর খালাস পান। ওই পুলিশ সদস্য বর্তমানে সিএমপি’র ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগে কর্মরত আছেন।

সিএমপির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যারা জনগণের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। তারাই যদি মানসিক চাপে থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি কোথায়। তাই পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা বন্ধে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।’
চট্টগ্রামে আত্মহত্যা করা পুলিশ সদস্যদের সহকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চাকরি পাওয়ার পর খোলা আকাশের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বডিগার্ড, মালি এমনকি বাবুর্চি হয়ে কারও কারও জীবন কাটাতে হচ্ছে। আত্মহত্যা করা বেশিরভাগ কনস্টেবলের এ প্রবণতার অন্যতম কারণ হলো ছুটি না পাওয়া, পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া, পারিবারিক কলহ, সংসার ভেঙে যাওয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে মানসিক চাপ তৈরি হওয়া।

সিএমপির আরেক কর্মকর্তা বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা বছরে দুই মাসের ছুটি পেয়ে থাকেন। অথচ পুলিশে নিয়ম যেন ছুটি না পাওয়ার। দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না থাকলে, জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে গেলে পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়। আবার ছুটি না কাটালে বিপরীতে বাড়তি টাকাও মেলে না। এ কারণে পুলিশের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ছুটি চাইতে গিয়ে একজন থেকে আরেকজনের টেবিলে অনুমতির জন্য ঘুরতে হয়। এক কর্মকর্তা থেকে আরেক কর্মকর্তার কাছে যেতে হয়। পুলিশে তিন বছর পর পর ‘রেস্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন লিভ’ নামে ১৫ দিনের একটি ছুটি কাটানোর বিধান আছে। কিন্তু সেটিও ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এসব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে পুলিশ সদস্যদের মনে।

সিএমপির একজন উপ পুলিশ কমিশনার একুশে পত্রিকাকে বলেন, পুলিশের ছুটির বিষয়টি শুধু অধস্তনেই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছুটি খুব বেশি পান তা কিন্তু নয়। তবে তারা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে বিশ্রাম নিয়ে থাকেন। তাদের জবাবদিহিতা অনেকটা কম। বেতন এবং কাজের তুলনায় ঊর্ধ্বতনরা অনেকটা বেশি সুবিধা পেয়ে থাকেন। তারা পরিবার নিয়ে থাকতে পারেন। যেখানে পুলিশ কনস্টেবলদের বেশিরভাগই পরিবার ছাড়া থাকতে হয়। আবার যেখানে থাকেন, থানা কম্পাউন্ড বা ব্যারাক সেখানকার পরিবেশও তেমন একটা উন্নত না। তবে নতুন নতুন থানা কমপ্লেক্স গড়ে ওঠায় আবাসন ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হচ্ছে।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আত্মহত্যার তিনটি ধারা আছে। প্রথমত হচ্ছে ইগোয়েস্টিক বা নিজের ব্যক্তিস্বার্থের জন্য আত্মহত্যা করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে এলটোরেস্টিক বা দেশের জন্য, যুদ্ধের ময়দানে বা পরার্থে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে না পেরে শত শত জাপানি সৈনিক নিজের পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মহনন করেছিল।

তৃতীয়টি হচ্ছে নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা। যেমন দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সংকট ইত্যাদি কারণে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশের মধ্যে যা ঘটছে এটি এক ধরনের নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা। একজন ট্রাফিক পুলিশের কথা ধরা যাক, তিনি যেখানে কাজ করেন সেখানে সারাদিন রোদ-বৃষ্টির মধ্যে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ছুটি কম, দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে। বিনোদন নেই, যা বেতন পাচ্ছে তা দিয়ে সংসার চলছে না। পদোন্নতি পাচ্ছে না। এসব হতাশা থেকে পুলিশের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। তবে এগুলোর জন্য দায়ী কে? পুলিশও নৈরাজ্যের বাইরে নয়। ফলে সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে। পুলিশের টেনশন, আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে হলে তাদের জন্য ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। ট্রেনিংয়ে পুলিশ সদস্যদের কাউন্সেলিং করতে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিদ, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের থাকতে হবে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্য আরও বলেন, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষোভ আছে। নিম্নপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা ছুটি ভোগ করেন কম। পেশাগত দক্ষতা দেখাতে না পারলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনেক সময় দুর্ব্যবহার করেন, অপমান করেন। এসব কারণেও তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. পঞ্চানন আচার্য্য বলেন,

আত্মহত্যার দুটি দিক আছে। একটি হচ্ছে প্রতিরোধ, আরেকটি চিকিৎসা। আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। নিজের মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। নিজেকে বিশ্রাম দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া যাবে না বা নেওয়া যাবে না। পারিবারিক এবং পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কর্মস্থলের আশপাশে পরিবারকে সাথে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সহকর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য ও তার আচার-আচরণের প্রতি রুমমেটদের খেয়াল রাখতে হবে। কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। কর্মঘণ্টা এবং বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এই উদ্যোগ নিতে হবে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে। অতিরিক্ত কাজের জন্য বাহিনীর লোকবল সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। পুলিশ সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বার্ষিক গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। দায়িত্বের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক দক্ষতার জন্য মনোবিদ, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ করাতে হবে।