শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

ফেসবুক-রোষে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৪, ২০২১, ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

আবছার রাফি : ‘বুঝতে পেরেছি, চাকরি নিতে পরিবারের একজনকে নালায় ফেলে দিতে হবে’- চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীর ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টের নিচে এই মন্তব্য করেছেন মুহাম্মদ লোকমান হাকিম নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী।

শুধু লোকমান হাকিমই নন, ওই পোস্টে মন্তব্য করা বেশিরভাগ ব্যক্তির নানা প্রশ্ন ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যে ফেসবুকে অনেকটা তোপের মুখে পড়েছেন সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে নগরীর উন্মুক্ত নালায় ঘটছে একের পর এক লোমহর্ষক-হৃদয়বিদারক ঘটনা। এ নিয়ে নগরের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর মনোভাব-বাকযুদ্ধ দেখেছে নগরবাসী। এসব দায় চাপানো ও কাক্সিক্ষত সেবাবঞ্চিত হয়ে জনসাধারণ এখন নিজেদের ক্ষোভ-রাগ উগরে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত আটটায় ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজ ‘Rezaul karim Chowdhury’ থেকে ছবিসহ একটি পোস্টার পোস্ট দেন সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘নালায় পড়ে নিখোঁজ ছালেহ আহমেদের ছেলেকে চাকরি দিয়েছেন চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। যা পোস্টারেও হুবহু উল্লেখ রয়েছে। সন্ধ্যা আটটা থেকে রাত দুইটা ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত এই পোস্টে মন্তব্য করেছেন ৬৬ জন, লাইক করেছেন দুই হাজার ৪শ’ জন এবং পোস্টটি শেয়ার করেছেন ২৭ জন।’

দেখা যায়, তাতে বেশিরভাগ মন্তব্যই নেতিবাচক, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক। মন্তব্য বিভাগে অপু ওয়াহিদ নামে একজন লিখেছেন ‘মেয়র মহোদয় এই পোস্ট নির্লজ্জ্বের প্রতিচ্ছবি। আপনি এই পোস্টের মাধ্যমে সরকারকে হেয় করেছেন। সরকারের কোটি কোটি টাকার বাজেট ও জনগণ থেকে আদায়কৃত সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স কোথায় যায়? আপনাদের অপরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার কারণে নালায় পড়ে মানুষ নিখোঁজ হয়। আপনাদের আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি করছি।’

মুহাম্মদ আল আমিন নামের একজন লিখেছেন, ‘এভাবে এক একটা ড্রেনে পড়ে মানুষ মরতে থাকুক। আর আপনারাও চাকরি দিতে থাকেন। আহা কত সুন্দর হিসেব। একদম ভেজাল নেই মেয়র সাহেব।’ আবুল মনসুর নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘কেউ মরলে চাকরি আছে। বেঁচে থাকতে পায় না।’ সাইফ ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, ‘ব্যস, এইভাবে চাপা পড়ে গেল আরো একটি নিন্দনীয় ঘটনা! ছি ছি ছি! লজ্জা!’ আবদুল্লাহ আল শুভ নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘এখানে কি মেয়রের দায়িত্ব শেষ।’ মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোছাইন নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘চাকরি দিলে কি আর বাবাকে ফিরে পাবে?’

মীর আলতাফ হোসাইন শিপন লিখেছেন, ‘বেশ কয়েকজন নালায় পড়ে মারা গেলো, চাকরি পেল ১ জন!’ শাইমুল সাইমন নামের আরেকজন মন্তব্য করেন, চাকরি সে যে কোনো জায়গায় পেতো, আর না হয় রিক্সা চালিয়েও দিন পার করতে পারতো… কিন্তু তার বটবৃক্ষ বাবাকে কি ফিরে পাবে? নাকি তার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন কোনটা…? এই রকম কতজনকে আপনারা চাকরি দিতে পারবেন? নালায় পড়ে মৃত্যু হয়েছে এ নিউজটা ভাইরাল হয়েছে তাই উনার ছেলে চাকরি পেয়েছে। অনেকে নালায় পড়ে হাত পা হারাচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে তাদেরকে কি চাকরি দিচ্ছেন নাকি তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন?’

মো. জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘এই ছেলে যতদিন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে চাকরি করবে, ততদিন তার মনে থাকবে তার বাবার মৃত্যুর বিনিময়ে সে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চাকরি পেয়েছে। এর চাইতে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?, শুভ্র বড়ুয়া নামের একজন লিখেছেন, ‘মৃত্যুর বদলে চাকরি’।

সরোয়ার জামাল আহাদ নামের একজন লিখেছেন, ‘স্বজনহারানো কোটায় চাকরি’। তারেক আজিজ মাসউদ লিখেছেন, ‘এটা পোস্টার বানিয়ে প্রচার করা এত জরুরি!’ মো. আলতাফ নামের একজন লিখেছেন, ‘মানি তবুও নালা ঠিক হবে না’। আরিফ মো. ইফতিখার তপু লিখেছেন, ‘এটা নিয়ে শো অফ না করে কিছু কাজ করেন, পাবলিক বেকুব না।’

অবশ্য ৬৬টি জনের করা ৬৬টি মন্তব্যের সবগুলোই এমন তির্যক বা অভিযোগপ্রবণ ছিল তা কিন্তু নয়। এর মধ্যে ২০ জনের মন্তব্য ছিলো মেয়র মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে।

এসব বিষয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হয়। দুপুরের পর একপর্যায়ে ফোন রিসিভ করলেও প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর ফোন করা হলে তিনি আর ফোন ধরেননি।

জানতে চাইলে সনাক-টিআইবি’র চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অবহেলা ও নাগরিকদের প্রতি শ্রদ্ধা-বিশ্বাস না থাকার কারণে আমরা প্রতিনিয়ত বিপদজনক অবস্থায় চলাফেরা করছি। এটার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাকে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। যিনি মারা গেছেন তার ছেলেকে চাকরি দিয়েছেন, এটা ভালো দিক। তার মানে এই না যে, মানুষ মরবে আর এর দফারফা চাকরি দিয়ে হবে।’

‘এভাবে যদি আরও মারা যায়, কয়টাকে চাকরি দেবেন ওনি। এটা কোনো সমাধান নয়। চাকরি কিন্তু বাবার বিকল্প হয় না, কারো অভিভাবক বা মা-বাবা হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থা ও সিটি কর্পোরশনের অবহেলা ছিল তাই মানুষ বিপদে পড়েছে, এটার দায় কেউ এড়াতে পারেন না। এটার একটা উপযুক্ত সমাধান দরকার, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’ বলেন অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট নগরের মুরাদপুরে নালায় পড়ে নিখোঁজ হন নগরের চকবাজারের সবজি বিক্রেতা ছালেহ আহমেদ। এরপর তার আর সন্ধান মিলেনি। পরবর্তীতে নগরের আছাদগঞ্জে নিখোঁজ ছালেহ আহমেদের শ্বশুরবাড়িতে যান সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। সেদিন ছালেহ আহমেদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি তার ছেলেকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মেয়র। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের যান্ত্রিক শাখায় অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। ১২ অক্টোবর নিখোঁজ ছালেহ আহমেদের ছেলে সাদেকুল্লাহ মহিমের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন মেয়র।

এ সময় বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সন্তান সাদেকুল্লাহ মহিম বলেছিলেন, ‘আজ আমার চাকরি মিলেছে ঠিকই, কিন্তু বাবার খোঁজ মিলেনি। বাবাকে হারিয়ে আমার পরিবার নিঃস্ব। ওনার অভাব কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব না।

২৫ আগস্ট নালায় পড়ে সালেহ আহমেদ নিখোঁজ হওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় ফুটপাত ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় নালায় পড়ে নিখোঁজ হন মাহবুবা সাদিয়া নামের একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী। নিখোঁজের পাঁচ ঘণ্টা পর ওই ছাত্রীর মরদেহ পাওয়া যায়। এর আগে গত ৩০ জুন নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেইটের মেয়র গলি এলাকয় নালায় সিএনজি অটোরিকশা পড়ে চালকসহ দুইজনের মৃত্যু হয়েছিল।