চসিকের ‘করোনা প্রতিরোধক বুথ’ কি ‘আইওয়াশ’


আবছার রাফি : নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিনা মূল্যে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করতে পাঁচ মাস আগে শতাধিক ‘করোনা প্রতিরোধক বুথ’ স্থাপন করেছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।

চালুর কয়েকদিন পর থেকে প্রায় সব বুথে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার মিলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে সরেজমিন নগরের বেশ কয়েকটি স্থানে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

এ প্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি বলছেন, শুরুতে উদ্যোগটি মহৎ বলে মনে হলেও এখন দেখা যাচ্ছে, তা ‘আইওয়াশ’ বা লোকদেখানো ছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১৫ মে থেকে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর উদ্যোগে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, শপিংমল ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ের সামনে স্থাপন করা হয় ‘করোনা প্রতিরোধক বুথ’। ‘এটিএম বুথ’র আদলে তৈরি করা প্রতিটি বুথে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও ব্যবহৃত মাস্ক ফেলার জন্য রাখা হয় তিনটি বক্স।

নগরবাসীকে করোনাভাইরাস হতে সুরক্ষিত রাখতে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এই সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়ে সব মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তবে গত ১৫ মে যতটা আড়ম্বরপূর্ণভাবে এই সেবাটি চালু করা হয়েছে ততটা সেবা মিলছে না বলে আক্ষেপ সাধারণ মানুষের।

বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে করোনা প্রতিরোধক বুথের কার্যক্রম। প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে বেশিরভাগ বুথ। নগরজুড়ে নানা স্থানে বসানো এসব বুথে জমেছে ধুলো-ময়লার আস্তরণ। বেশিরভাগ বুথে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই। কোনো কোনোটিতে একটি থাকলে, অপরটি নেই।

মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) সরেজমিন সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখলে চোখে পড়ে ‘করোনা প্রতিরোধক বুথ’র এই কাহিল অবস্থা। জামালখান ওয়ার্ড অফিসের পাশে বসানো মেয়রের করোনা প্রতিরোধক বুথটি দেখতে পাওয়া যায় অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায়। নেই মাস্ক, নেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার। তবে ব্যবহৃত মাস্ক ফেলার বক্সে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা।

নগরের বিবিরহাট এলাকায় কাউন্সিলর অফিসের সামনে বসানো বুথটিতেও নেই মাস্ক, নেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার। বিবিরহাট কাঁচাবাজার এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসিফ বলেন, ‘চালুর পর বুথে কয়েকদিন মাস্ক দেখা গেলেও পরে আর দেখা যায়নি।’

ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ড অফিসের সামনে বসানো বুথে হ্যান্ড-স্যানিটাইজার থাকলেও, নেই মাস্ক। এমনকি খোদ সিটি কর্পোরেশনের আন্দরকিল্লাস্থ পুরনো কার্যালয়ের সামনে বসানো বুথটিতে হ্যান্ড-স্যানিটাইজার থাকলেও নেই মাস্ক।

নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বসানো বেশিরভাগ করোনা প্রতিরোধক বুথের একই অবস্থা দেখা গেছে। অনেকে করোনা প্রতিরোধক বুথে মাস্ক ফেলার বক্সে ফেলছেন অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা।

সরেজমিন বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখার সময় একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার সাথে কথা হয় একুশে পত্রিকার সাথে। তারা জানান, বুথ স্থাপনের ১৫-২০ দিন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও পরে আর সেবা নিতে পারেননি তারা। বুথ ধুলো-ময়লায় একাট্টা হয়ে গেলেও কাউকে দেখেননি পরিষ্কার করতে। ব্যবহৃত মাস্ক ফেলার বক্স থেকে বের হচ্ছে দুর্গন্ধ।’

এর আগে শনিবার (১৫ মে) বিকেল ৩টায় বহদ্দারহাটে নিজ বাসভবনের সামনের সড়কে করোনা প্রতিরোধক বুথ স্থাপনকালে নগরীকে করোনামুক্ত করতে ৪১টি ওয়ার্ডে করোনা প্রতিরোধক বুথ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী।

এরপর বৃহস্পতিবার (২০ মে) টাইগার পাড়স্থ চসিক প্রধান কার্যালয়ের প্রবেশমুখে করোনা প্রতিরোধক বুথ উদ্বোধনকালে মেয়র বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় জনসাধারণকে সচেতন ও সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন, শপিংমল ও ওয়ার্ড কার্যালয়ের সামনে এ করোনা প্রতিরোধক বুথ স্থাপন করে বিনামূল্যে সেবা কার্যক্রম চলমান থাকবে।

বিনামূল্য এ সেবা কার্যক্রম চলমান রাখার ঘোষণা দিলেও চলমান না থাকা এবং অচল করোনা প্রতিরোধক বুথগুলো পুনরায় সচল করা হবে কি না জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী সঙ্গে। প্রসঙ্গ তুলতেই এগুলোর এখন জবাব দেওয়ার সময় নেই জানিয়ে মিটিংয়ে আছেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এ বিষয়ে সনাক-টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বুথ চালুর সময় আমরা সবাই ভালো কাজটিকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আমাদের শুরু থেকে একটু সন্দেহ থাকে, এটি লোকদেখানো কি না। পরে আমরা দেখতে পাই বুথের কার্যক্রম উদ্বোধন পর্যন্ত। যা হয়েছে আইওয়াশ।’

‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের হাজার হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে। কিন্তু কাগজে যা আছে ততটা বাস্তবে নেই। অর্থাৎ মাস্টাররোল করে টাকাটা আত্মসাৎ করা হয়, সেক্ষেত্রে এখানে মেইনটেন্যান্স করলে কী এমন ক্ষতি হতো। সামান্য একটি কাজ এত বড় সিটি কর্পোরেশন যেখানে হাজার হাজার, শত কোটি টাকার বাজেট থাকে।’

অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের অনেক জনপ্রতিনিধি গতানুগতিকভাবে লোকদেখানো কিছু কাজ করে থাকেন। এসব কাজ কয়েকদিন চালু থাকে। আমি মনে করি সিটি মেয়রও এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন, নতুন কিছু করতে পারেননি। এটা দুঃখজনক। নাগরিকদের জন্য বেদনাদায়ক। আমি লজ্জারও মনে করি।’